রামাবতী বর্ণনা প্রসঙ্গে কবি লিখিয়াছেন যে প্রশস্ত রাজপথের ধারে কনক পরিপূর্ণ ধবল প্রাসাদ-শ্ৰেণী মেরু-শিকরের ন্যায় প্রতীয়মান ইহত এবং ইহার উপর স্বর্ণকলস শোভা পাইত; নানা স্থানে মন্দির, স্তূপ, বিহার, উদ্যান, পুষ্করিণী, ক্রীড়াশৈল, ক্রীড়াবাপী ও নানাবিধ পুষ্প, লতা, তরু, গুল্ম নগরের শোভাবৃদ্ধি করিত। হীরক, বৈদুৰ্য্যমণি, মুক্তা, মরকত, মানিক্য ও নীলমণিখচিত আভরণ, বহুবিধ স্বর্ণখচিত তৈজসপত্র ও অন্যান্য গৃহোপকরণ, মহামূল্য বিচিত্র, সূক্ষ্ম বসন, কস্তুরী, কালাগুরু, চন্দন, কুঙ্কুম ও কপূরাদি গন্ধদ্রব্য, এবং নানা যন্ত্রোখিত মন্দ্রমধুর ধ্বনির সহিত তানলয়-বিশুদ্ধ সঙ্গীত সেকালের নাগরিকদের ঐশ্বর্য, সম্পদ, রুচি ও বিলাসিতার পরিচয় প্রদান করিত। সন্ধ্যাকরনন্দী স্পষ্টই লিখিয়াছেন যে, সেকালে সমাজে ব্যভিচারী ও সাত্ত্বিক উভয় শ্রেণীর লোক ছিল। নগরে বিলাসিতা ও উজ্জ্বলতা অবশ্য গ্রামের তুলনায় বেশী মাত্রায়ই ছিল।
বাংলার প্রাচীন ধর্ম্মশাস্ত্রে নৈতিক জীবনের খুব উচ্চ আদর্শের পরিচয় পাওয়া যায়। একদিকে সত্য, শৌচ, দয়া, দান প্রভৃতি সর্ব্ববিধগুণের মহিমা কীর্তন এবং অপরদিকে ব্রহ্মহত্যা, সুরাপান, চৌর্য্য ও পরদারগমন প্রভৃতি মহাপাতক বলিয়া গণ্য করিয়া তাঁহার জন্য কঠোর শাস্তি ও গুরুতর প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। ব্যক্তিগত জীবনে এই আদর্শ কী পরিমাণে অনুসৃত হইত তাঁহার সম্বন্ধে সঠিক ধারণা করা যায় না। সামাজিক জীবনের কিছু কিছু দুর্নীতি ও অশ্লীলতার কথা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। ইন্দ্রিয় সংযম বা দৈহিক পবিত্রতার আদর্শ যে হিন্দু যুগের অবসানকালে অনেক পরিমাণে খৰ্ব্ব হইয়াছিল এরূপ সিদ্ধান্ত করিবার যথেষ্ট কারণ আছে। এই যুগের কাব্যে ইন্দ্রিয়ের উচ্ছলতা যেভাবে প্রতিধ্বনিত হইয়াছে তাহা কেবলমাত্র কবির কল্পনা বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া যায় না। যে যুগের স্মার্ত পণ্ডিতগণ প্রামাণিক গ্রন্থে অকুণ্ঠিত চিত্তে লিখিয়াছেন যে শূদ্রাকে বিবাহ করা অসঙ্গত কিন্তু তাঁহার সহিত অবৈধ সহবাস করা তাদৃশ নিন্দনীয় নয়; যে যুগের কবি রাজপ্রশস্তিতে রাজার কৃতিত্বের নিদর্শনস্বরূপ গৰ্ব্বভরে বলিয়াছেন যে রাজপ্রাসাদে (অথবা রাজধানীতে) প্রতি সন্ধ্যায় ‘বেশবিলাসিনীজনের মঞ্জীর মঙুস্বনে’ আকাশ প্রতিধ্বনিত হয়; যে যুগের কবি মন্দিরের একশত দেবদাসীর রূপ-যৌবন বর্ণনায় উচ্ছ্বসিত হইয়া লিখিয়াছেন যে, ইহারা ‘কামিজনের কারাগার ও সঙ্গীত-কেলি-শ্রীর সঙ্গমগৃহ’ এবং ইহাদের দৃষ্টিমাত্রে ভস্মীভূত কাম পুনরুজ্জীবিত হয়; যে যুগের কবি বিষ্ণুমন্দিরে লীলাকমলহস্তে দেবদাসীগণকে লক্ষ্মীর সহিত তুলনা করিতে দ্বিধা বোধ করেন নাই; সে যুগের নর-নারীর যৌন সম্বন্ধের ধারণা ও আদর্শ বর্ত্তমানকালের মাপকাঠিতে বিচার করিলে খুব উচ্চ ও মহৎ ছিল এরূপ বিশ্বাস করা কঠিন। এ বিষয়ে পূৰ্ব্বেও বাঙ্গালীর যে খুব সুনাম ছিল না, তাঁহারও কিছু কিছু প্রমাণ আছে। বাৎস্যায়ন গৌড় ও বঙ্গের রাজান্ত :পুরবাসিনীদের ব্যভিচারের উল্লেখ করিয়াছেন। বৃহস্পতি ভারতের বিভিন্ন জনপদের আচার-ব্যবহার বর্ণনা প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন যে, পূৰ্ব্বদেশের দ্বিজাতিগণ মৎস্যাহারী এবং তাহাদের স্ত্রীগণ দুর্নীতিপরায়ণ।
ভাত, মাছ, মাংস, শাকসজী, ফলমূল, দুগ্ধ এবং দুগ্ধজাত নানাপ্রকারের দ্রব্য (ক্ষীর, দধি, ঘৃত ইত্যাদি) বাঙ্গালীর প্রধান খাদ্য ছিল। বাংলার বাহিরে ব্রাহ্মণেরা সাধারণত মাছ-মাংস খাইতেন না এবং ইহা নিন্দনীয় মনে করিতেন। কিন্তু বাংলায় ব্রাহ্মণেরা আমিষ ভোজন করিতেন, এবং ভবদেবভট্ট নানাবিধ যুক্তি প্রয়োগে ইহার সমর্থন করিয়াছেন। বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে রোহিত, সকুল, শফর এবং অন্যান্য শ্বেত ও শল্কমুক্ত মৎস্যভক্ষণের ব্যবস্থা আছে। সেকালে ইলিশ মৎস্য এবং পূৰ্ব্ববঙ্গে শুটকী মৎস্যের খুব আদর ছিল। নানারূপ মাদক পানীয় ব্যবহৃত হইত। ভবদেবভট্টের মতে সুরাপান সকলের পক্ষেই নিষিদ্ধ, কিন্তু এই ব্যবস্থা কত দূর কাৰ্য্যকরী ছিল বলা কঠিন। চর্য্যাপদে শৌণ্ডিকালয়ের উল্লেখ আছে।
পাহাড়পুরের মূর্ত্তিগুলি দেখিলে মনে হয় যে, সেকালের বাঙ্গালী নর-নারী সাধারণত এখনকার মতোই একখানা ধুতি ও শাড়ী পরিত। পুরুষেরা মালকোছা দিয়া খাটো ধুতি পরিত এবং অধিকাংশ সময়ই ইহা হাঁটুর নিচে নামিত না। কিন্তু মেয়েদের শাড়ী পায়ের গোড়ালি পর্য্যন্ত পৌঁছাত। ধুতি ও শাড়ি কেবল দেহের নিম্নাদ্ধা আবৃত করিত। নাভির উপরের অংশ কখনো খোলা থাকিত, কখনো পুরুষেরা উত্তরীয় এবং মেয়েরা ওড়না ব্যবহার করিত। মেয়েরা কদাচিৎ চৌলি বা স্তনপট্ট এবং বডিসের ন্যায় জামাও ব্যবহার করিত। উৎসবে বা বিশেষ উপলক্ষে সম্ভবত বিশেষ পরিচ্ছদের ব্যবস্থা ছিল।
পুরুষ ও মেয়েরা উভয়েই অঙ্গুরী, কানে কুণ্ডল, গলায় হার, হাতে কেয়ুর ও বলয়, কটিদেশে মেখলা ও পায়ে মল পরিত। শঙ্খ-বলয় কেবল মেয়েরাই ব্যবহার করিত। পুরুষ ও মেয়ে উভয়েই একাধিক হার গলায় দিত এবং মেয়েরা অনেক সময় এখনকার পশ্চিমদেশীয় স্ত্রীলোকের ন্যায় হাতে অনেকগুলি চুড়িবালা পরিত। ধনীরা সোনা, রূপা, মণি, মুক্তার অনেক আভরণ ব্যবহার করিত।
