.
৭. বাঙ্গালীর চরিত্র ও জীবনযাত্রা
এই যুগে সাধারণ বাঙ্গালীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কোনো স্পষ্ট বা বিস্তৃত বিবরণ জানিবার উপায় নাই। প্রাচীন বাংলায় লিখিত চর্যাপদগুলিতে এ বিষয়ে কিছু কিছু উল্লেখ আছে। কিন্তু এই পদগুলি দশম শতাব্দী বা তাঁহার পরে রচিত, এবং অন্যান্য যে সমুদয় গ্রন্থে ইহার কোনো বিবরণ আছে তাহা ইহারও পরবর্ত্তীকালের রচনা। প্রাচীন লিপি, শিল্প ও বৈদেশিক ভ্রমণকারীর বিবরণী হইতে এ বিষয়ে যে তথ্য সংগ্রহ করা যায় তাহাও অতিশয় স্বল্প। এই সমুদয়ের উপর নির্ভর করিয়াই বাঙ্গালীর জীবনের বিভিন্ন দিক সম্বন্ধে অতি সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করিতেছি।
সপ্তম শতাব্দীতে চীনদেশীয় পরিব্রাজক হুয়েন সাং বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করিয়া ইহার অধিবাসীদের সম্বন্ধে যে সমুদয় মন্তব্য করিয়াছেন তাহা বাঙ্গালী মাত্রেরই শ্লাঘার বিষয়। ‘সমতটের লোকেরা স্বভাবতই শ্রমসহিষ্ণু, তাম্রলিপ্তির অধিবাসীরা দৃঢ় ও সাহসী কিন্তু চঞ্চল ও ব্যস্তবাগীশ, এবং কর্ণসুবর্ণবাসীরা সাধু ও অমায়িক’-তাঁহার এই কয়েকটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে প্রাচীন বাঙ্গালীর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়া উঠিয়াছে। তাছাড়া তিনি পুণ্ড্রবর্দ্ধন, সমতট ও কর্ণসুবর্ণে সর্ব্বসাধারণের মধ্যে লেখাপড়া শিখিবার অদম্য আগ্রহ ও প্রাণপণ চেষ্টার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করিয়াছেন। সহস্রাধিক বৎসর পরে আজিও ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় বাংলায় স্কুল-কলেজের সংখ্যাধিক্য বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনের এই বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দিতেছে।
বাংলায় সাধারণত বেদ, মীমাংসা, ধর্ম্মশাস্ত্র, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, অর্থশাস্ত্র গণিত, জ্যোতিষ, কাব্য, তর্ক, ব্যাকরণ, অলঙ্কার, ছন্দ, আয়ুর্ব্বেদ, অস্ত্রবেদ, আগম, তন্ত্র প্রভৃতির পঠনপাঠন প্রচলিত ছিল। বৌদ্ধ ও জৈনধর্ম্মের গ্রন্থাদিও পঠিত হইত। ফাহিয়ান ও ইৎসিং উভয়েই বৌদ্ধ গ্রন্থের চর্চ্চার জন্য তাম্রলিপ্তির বৌদ্ধবিহারে কিছুকাল অবস্থান করিয়াছিলেন।
জ্ঞান লাভের জন্য বাঙ্গালী দূরদেশে এমনকি সুদূর কাশীর পর্য্যন্ত যাইত। কিন্তু বাঙ্গালী ছাত্রদের কোনো কোনো বিষয়ে দুর্নাম ছিল। ক্ষেমেন্দ্র দশোপদেশ নামক হাস্যরসাত্মক কাব্যে লিখিয়াছেন যে গৌড়ের ছাত্রগণ যখন প্রথম কাশ্মীরে আসে তখন তাহাদের ক্ষীণ দেহ দেখিয়া মনে হয় যেন ছুঁইলেই ভাঙ্গিয়া পড়িবে; কিন্তু এখানকার জলবায়ুর গুণে তাহারা শীঘ্রই এমন উদ্ধত হইয়া উঠে যে, দোকানদার দাম চাহিলে দাম দেয় না, সামান্য উত্তেজনার বশেই মারিবার জন্য ছুরি উঠায়। বিজ্ঞানেশ্বরও লিখিয়াছেন যে গৌড়ের লোকেরা বিবাদপ্রিয়।
কিন্তু বাংলার মেয়েদের সুখ্যাতি ছিল। বাৎস্যায়ন তাহাদিগকে মৃদ্যুভাষিণী, কোমলাঙ্গী ও অনুরাগবতী বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। পবনদূত বিজয়পুরের বর্ণনা পড়িয়া মনে হয়, সেকালে মেয়েদের মধ্যে অবরোধ-প্রথা ছিল না-তাহারা স্বচ্ছন্দে বাহিরে ভ্রমণ করিত। কিন্তু বাৎস্যায়ন লিখিয়াছেন যে রাজান্তঃপুরের মেয়েরা পর্দার আড়াল হইতে অনাত্মীয় পুরুষের সহিত আলাপ করিত। মেয়েরা লেখাপড়া শিখিত। ভারতবর্ষের অন্য প্রদেশের ন্যায় বাংলায়ও মেয়েদের কোনো প্রকার স্বাতন্ত্র্য বা স্বাধীনতা ছিল না, প্রথমে পিতা পরে স্বামীর পরিবারবর্গের অধীনে থাকিতে হইত। এক বিষয়ে বাংলার বৈশিষ্ট্য ছিল। জীমূতবাহনের মতে অপুত্রক স্বামীর মৃত্যু হইলে বিধবা তাঁহার সমস্ত সম্পত্তির অধিকারিণী হইবে। এ বিষয়ে প্রাচীনকালে অনেক বিরুদ্ধ মত ছিল, যেমন পুত্রের অভাবে ভ্রাতা উত্তরাধিকারী এবং বিধবা কেবল গ্রাসাচ্ছাদনের অধিকারিণী হইবে। জীমূতবাহন এই সমুদয় মত খণ্ডন করিয়া বিধবার দাবী সমর্থন করিয়া গিয়াছেন, সুতরাং বাংলা দেশে এই বিধি প্রচলিত ছিল ইহা অনুমান করা যাইতে পারে। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও সেকালের বিধবার জীবন এখনকার ন্যায়ই ছিল। কারণ জীমূতবাহনের মতে সম্পত্তির অধিকারিণী হইলেও ইহার দান ও বিক্রয় সম্বন্ধে বিধবার কোনো অধিকার থাকিবে না, এবং তাহাকে সতী-সাধ্বী স্ত্রীর ন্যায় কেবলমাত্র স্বামীর স্মৃতি বহন করিয়া জীবন ধারণ করিতে হইবে। স্বামীর পরিবারে সর্ববিষয়ে-এমনকি সম্পত্তির ব্যবস্থা সম্বন্ধেও-তাহাদের আনুগত্য স্বীকার করিয়া থাকিতে হইবে, এবং নিজের প্রাণধারণাৰ্থ যাহা প্রয়োজন, মাত্র তাহা ব্যয় করিয়া অবশিষ্ট স্বামীর পারলৌকিক কল্যাণের সর্ববিধ বিলাস-বর্জন ও কৃচ্ছসাধন করিতে হইত। সধবা অবস্থায় তাঁহার ব্যক্তিগত প্রভাব ও প্রতিপত্তি কিরূপ ছিল ঠিক বলা যায় না। তবে পুরুষের বহু-বিবাহ প্রচলিত ছিল এবং অনেক স্ত্রীকেই সপত্নীর সহিত একত্র জীবন যাপন করিতে হইত। সহমরণ প্রথা সেকালেও প্রচলিত ছিল এবং বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে ইহার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা আছে।
বাংলার অধিবাসীরা তখন বেশির ভাগ গ্রামেই বাস করিত। কিন্তু ধন-সম্পদপূর্ণ শহরেরও অভাব ছিল না। রামচরিতে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা বঙ্গভূমির এবং পাল-রাজধানী রামাবতীর মনোরম বর্ণনা আছে। পবনদূতে সেন রাজধানী বিজয়পুরের বিবরণ পাওয়া যায়। অত্যুক্তিদোষে দূষিত হইলেও এই সমুদয় বর্ণনা হইতে সেকালের গ্রাম্য ও নাগরিক জীবনের কিছু আভাস পাওয়া যায়।
