বৃহদ্ধর্ম্ম ও ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণে যে সমুদয় নীচ জাতির উল্লেখ আছে তাঁহার প্রায় সকলগুলিই বর্ত্তমানকালে সুপরিচিত। বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে ইহাদিগকে বর্ণাশ্রম-বহিষ্কৃত ও অন্ত্যজ বলা হইয়াছে। ভবদেবভট্টের মতে রজক, চর্মকার, নট, বরুড় কৈবর্ত্ত, মদে ও ভিল্ল এই সাতটি অন্ত্যজ জাতি। কিন্তু বৃহদ্ধর্ম্ম অনুসারে রজক ও নট মধ্যম সংকর জাতীয় এবং ব্রহ্মবৈবর্ত্ত মতে ভিল্ল সৎশূদ্র। ইহা হইতে অনুমিত হয় যে স্থান ও কাল অনুসারে সমাজে বিভিন্ন জাতির উন্নতি ও অবনতি হইয়াছে।
প্রাচীন বৌদ্ধ চর্যাপদে ডোম, চণ্ডাল, ও শবরের কিছু কিছু বিবরণ আছে। ডোমেরা শহরের বাহিরে বাস করিত এবং অস্পৃশ্য বলিয়া গণ্য হইত। তাহারা বাঁশের ঝুড়ি বানাইত ও তাঁত বুনিত। ডোম মেয়েদের স্বভাব-চরিত্র ভালো ছিল না; তাহারা নাচিয়া-গাহিয়া বেড়াইত। চণ্ডালেরা মাঝে মাঝে গৃহস্থের বধূ চুরি করিয়া নিত। শবরেরা পাহাড়ে বাস করিত। তাহাদের মেয়েরা কানে দুল এবং ময়ূরপুচ্ছ ও গুঞ্জাফলের মালা পরিত। নৈহাটি তাম্রশাসনে পুলিন্দ নামে আর এক শ্রেণীর আদিম জাতির উল্লেখ আছে। তাহারা বনে বাস করিত, এবং তাহাদের মেয়েরাও গুঞ্জাফলের মালা পরিত। শবর জাতির কথা প্রাচীন বাংলার অন্য গ্রন্থেও আছে। সম্ভবত পাহাড়পুরের মন্দিরগাত্রে যে কয়েকটি আদিম অসভ্য নর-নারীর মূৰ্ত্তি আছে তাহারা শবর অথবা পুলিন্দজাতীয়। ইহাদের মধ্যে নর-নারী উভয়েরই কটিদেশে কয়েকটি বৃক্ষপত্র ব্যতীত আর কোনো আবরণ নাই। মেয়েরা কিন্তু পরিপাটি করিয়া কেশ-বিন্যাস করিত এবং পত্রপুষ্পের অনেক অলঙ্কার পরিত। পুরুষ ও স্ত্রীলোক উভয়েই বেশ সবলকায় ছিল এবং তীর-ধনুক ও খড়গ ব্যবহার করিতে জানিত। একটি উৎকীর্ণ ফলকে দেখা যায় একজন স্ত্রীলোক একটি মৃত জন্তু হাতে ঝুলাইয়া বীরদর্পে চলিয়াছে,-সম্ভবত নিজেই ইহা শিকার করিয়া আনিয়াছে, এবং ইহাই তাহাদের প্রধান খাদ্য ছিল। বাংলা দেশে সৰ্ব্বপ্রাচীনকালে যে সমুদয় জাতি বাস করিত সম্ভবত ইহারা তাহাদেরই বংশধর, এবং সহস্রাধিক বৎসরেও ইহাদের জীবনযাত্রার বিশেষ কোনো পরিবর্ত্তন হয় নাই।
.
৬. পূজা-পার্ব্বণ এবং আমোদ-উৎসব
দেব-দেবীর পূজা ব্যতীত ধর্ম্মের অনেক লৌকিক অনুষ্ঠানও প্রাচীনকালের সামাজিক জীবনে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিত। ধর্ম্মশাস্ত্রে বহুবিধ সংস্কারের উল্লেখ আছে,-জন্মের পূৰ্ব্ব হইতে মৃত্যুর পর পর্য্যন্ত মানুষের বিভিন্ন অবস্থায় এইগুলি পালনীয়। শিশুর জন্মের পূর্ব্বেই তাঁহার মঙ্গলের জন্য গর্ভাধান, পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন ও শোষ্যন্তী-হোম অনুষ্ঠিত হইত। জন্মের পর জাতকৰ্ম্ম, নিষ্ক্রমণ, নামকরণ, পৌষ্টককৰ্ম্ম, অন্নপ্রাশন, চূড়াকরণ ও উপনয়ন। তাঁহার পর ছাত্রজীবনের আরম্ভ। শিক্ষা সমাপ্ত হইলে গৃহে প্রত্যাগত হইয়া সমাবর্ত্তন উৎসব; তৎপর বিবাহ ও নূতন গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে শালাকৰ্ম্ম অনুষ্ঠান করিতে হইত। মৃত্যুর অব্যবহিত পূৰ্ব্বে ও পরে নানাবিধ ঔদ্ধদৈহিক ক্রিয়ার ব্যবস্থা ছিল এবং অশৌচ পালন ও শ্রাদ্ধাদি শাস্ত্রের নিয়ম অনুসারেই আচরিত হইত। বাংলার স্মার্ত পণ্ডিতেরা এই সমুদয়ের যে বিস্তৃত বিবরণ লিখিয়া গিয়াছেন তাহা হইতে মনে হয় যে, ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের শাস্ত্রীয় ব্যবস্থার সহিত বাংলার এই বিষয়ে বিশেষ কোনো অনৈক্য ছিল না, এবং লোকাঁচারের যে প্রভেদ ছিল বর্ত্তমানকালেও তাঁহার প্রায় সবই বর্ত্তমান। এই সমুদয় সংস্কার ছাড়াও বাঙ্গালীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ধর্ম্মশাস্ত্রের প্রবল প্রভাব ছিল। কোন কোন তিথিতে কী কী খাদ্য ও কর্ম্ম নিষিদ্ধ, কোন তিথিতে উপবাস করিতে হইবে, এবং অধ্যয়ন, বিদেশযাত্রা, তীর্থগমন প্রভৃতির জন্য কোন কোন কাল শুভ বা অশুভ ইত্যাদি বিষয়ে শাস্ত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুশাসন দ্বারা প্রত্যেকের জীবন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হইত। কিন্তু তাই বলিয়া সেকালের জীবন একেবারে নিরানন্দ বা বৈচিত্র্যহীন ছিল না। বিবাহাদি উপলক্ষে নৃত্যগীতাদি আমোদ-উৎসব হইত। চর্যাপদে উক্ত হইয়াছে যে, বর বিবাহ করিতে যাইবার সময় পটহ, মাদল, করৎ, কলা, দুন্দুভি প্রভৃতির বাদ্য হইত। ইহা ছাড়া তখনো বাংলায় বারো মাসে তেরো পার্ব্বণ হইত এবং এই সমুদয় পূজা পাৰ্বণ প্রভৃতি উপলক্ষে নানাবিধ আমোদ-উৎসব অনুষ্ঠিত হইত।
এখানকার ন্যায় প্রাচীন হিন্দু যুগেও দুর্গাপূজাই বাংলার প্রধান পৰ্ব ছিল। সন্ধ্যাকরনন্দী রামচরিতে লিখিয়াছেন যে উমা অর্থাৎ দুর্গার অর্চনা উপলক্ষে বরেন্দ্রে বিপুল উৎসব হইত। অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থেও এই উৎসবের বিবরণ আছে। শারদীয় দুর্গাপূজায় বিজয়া দশমীর দিন শাবরোৎসব’ নামে এক প্রকার নৃত্য গীতির অনুষ্ঠান হইত। শবরজাতির ন্যায় কেবলমাত্র বৃক্ষপত্র পরিধান করিয়া এবং সারা গায়ে কাদা মাখিয়া, ঢাকের বাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে লোকেরা অশ্লীল গান গাহিত এবং তদনুরূপ কুৎসিত অঙ্গভঙ্গী করিত। জীমূতবাহন কাল-বিবেক’ গ্রন্থে যে ভাষায় এই নৃত্যগীতের বর্ণনা করিয়াছেন বর্ত্তমানকালের রুচি অনুসারে তাঁহার উল্লেখ বা ইঙ্গিত করাও অসম্ভব। অথচ তিনিই লিখিয়াছেন যে, যে ইহা না করিবে ভগবতী ক্রুদ্ধা হইয়া তাহাকে নিদারুণ শাপ দিবেন। বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে কতিপয় অশ্লীল শব্দ সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে যে ইহা অপরের সম্মুখে উচ্চারণ করা কর্তব্য নহে, কিন্তু আশ্বিন মাসে মহাপূজার দিনে ইহা উচ্চারণ করিবে,-তবে মাতা, ভগিনী এবং শক্তিমন্ত্রে অদীক্ষিতা শিষ্যার সম্মুখে নহে। ইহার সপক্ষে এই পুরাণে যে যুক্তি দেওয়া হইয়াছে, শ্লীলতা বজায় রাখিয়া তাঁহার উল্লেখ করা যায় না। ধর্ম্মের নামে এই সমুদয় বীভৎসতা যে অনেক পরিমাণে তান্ত্রিক অনুষ্ঠানের ফল তাহা অস্বীকার করা কঠিন। উপযুক্ত অধিকারীর পক্ষে এই সমুদয় অনুষ্ঠান প্রয়োজনীয় অথবা ফলপ্রদ হইতে পারে, তর্কের খাতিরে ইহা স্বীকার করিলেও সৰ্ব্বসাধারণের উপর ইহার প্রভাব যে নীতি ও রুচির দিক দিয়া অত্যন্ত অশুভ হইয়াছিল, বাংলার সামাজিক ইতিহাস আলোচনা করিলে যে বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। চৈত্র মাসে কাম মহোৎসবেও বাদ্য-সহকারে এই প্রকার অশ্লীল গীত গান করা হইত, কারণ লোকের বিশ্বাস ছিল যে ইহাতে পরিতুষ্ট হইয়া কামদেব ধন, পুত্র প্রভৃতি দান করিবেন। হোলকা-বৰ্ত্তমান কালের হোলি-একটি প্রধান উৎসব ছিল। স্ত্রী-পুরুষ সকলেই ইহাতে যোগদান করিত, কিন্তু ইহার কোনো বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় না। দূত-প্রতিপদ নামে একটি বিশেষ উৎসব কার্তিক মাসের শুক্ল প্রতিপদে অনুষ্ঠিত হইত। প্রাতে বাজী রাখিয়া পাশা খেলা হইত, এবং লোকের বিশ্বাস ছিল যে ইহার ফলাফল আগামী বৎসরের শুভাশুভ নির্দেশ করে। তাঁহার পর বসন-ভূষণ পরিধান ও গন্ধ দ্রব্যাদি লেপন করিয়া সকলে গীতবাদ্যে যোগদান করিত এবং বন্ধুবান্ধবসহ ভোজন করিত। রাত্রে শয়নকক্ষ ও শয্যা বিশেষভাবে সজ্জিত হইত এবং প্রণয়ীযুগল একত্রে রাত্রি যাপন করিত। কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রেও অক্ষক্রীড়া হইত এবং আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব একত্র হইয়া ভোজন। করিতেন। চিড়া ও নারিকেলের প্রস্তুত নানাবিধ দ্রব্য এই রাত্রে প্রধান খাদ্য ছিল। কার্তিক মাসে সুখরাত্রিব্রত পালিত হইত। সন্ধ্যাকালে গরীব-দুঃখীকে খাওয়ানো হইত এবং পরদিন প্রভাতে যাহার সহিত দেখা হইত, বন্ধু বা আত্মীয় না হইলেও তাহাকে কুশলবচন এবং পুষ্প, গন্ধ, দধি প্রভৃতি দ্বারা অর্চনা করা হইত। ভ্রাতৃ দ্বিতীয়া, পাষাণ-চতুর্দশীব্রত, আকাশ-প্রদীপ, জন্মাষ্টমী, অক্ষয়-তৃতীয়া, দশহরার গঙ্গাস্নান, অষ্টমীতে ব্রহ্মপুত্র স্নান প্রভৃতি বৰ্ত্তমানকালের সুপরিচিত অনুষ্ঠানগুলিও তকালে প্রচলিত ছিল। সেই যুগে শক্রোখান নামে একটি উৎসব ছিল। ভাদ্র মাসের শুক্লাষ্টমীতে ইন্দ্রের কাষ্ঠনির্ম্মিত বিশাল ধ্বজ-দণ্ড উত্তোলন করা হইত। এই উপলক্ষে সুবেশধারী নাগরিকগণ সমবেত হইতেন এবং রাজা স্বয়ং দৈবজ্ঞ, সচিব, কুঞ্চুকী ও ব্রাহ্মণগণ সমভিব্যাহারে উপস্থিত হইয়া উৎসবে যোগদান করিতেন। এই জাতীয় উৎসব এখন একেবারেই লোপ পাইয়াছে। এই সমুদয় পূজা-পাৰ্বণ, উৎসব প্রভৃতি ও তদুপলক্ষে আমোদ-প্রমোদ বাঙ্গালীর সামাজিক জীবনের বৈশিষ্ট্য ছিল।
