.
৩. করণ-কায়স্থ
প্রাচীন বঙ্গসমাজে ব্রাহ্মণের পরেই সম্ভবত করণ জাতির প্রাধান্য ছিল। বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে সংকর জাতির মধ্যে প্রথমেই করণের উল্লেখ আছে। করণগণ যে খুব উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তাঁহারও প্রমাণ আছে। সামন্ত রাজা লোকনাথ করণ ছিলেন এবং বৈন্যগুপ্তের তাম্রশাসনে একজন করণ কায়স্থ সান্ধিবিগ্রহিক বলিয়া উক্ত হইয়াছেন। শব্দ-প্রদীপ নামক একখানি বৈদ্যক গ্রন্থের প্রণেতা নিজেকে করণায় বলিয়াছেন। তিনি নিজে রাজবৈদ্য ছিলেন এবং তাঁহার পিতা ও পিতামহ রামপাল ও গোবিন্দচন্দ্রের রাজবৈদ্য ছিলেন। রামচরিত-প্রণেতা সন্ধ্যাকর নন্দীর পিতা সান্ধিবিগ্রহিক ও করণাগুণের শ্রেষ্ঠ বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন।
প্রাচীন ধর্ম্মশাস্ত্রে করণ শব্দে একটি জাতি ও এক শ্রেণীর কর্ম্মচারী (লেখক, হিসাবরক্ষক প্রভৃতি) বুঝায়। কায়স্থ শব্দও প্রথমে এই শ্রেণীর রাজকর্ম্মচারী বুঝাইত, পরে জাতিবাচক সংজ্ঞায় পরিণত হয়। কোষকার বৈজয়ন্তী কায়স্থ ও করণ প্রতিশব্দরূপে ব্যবহার করিয়াছেন। প্রাচীন লিপিতেও করণ ও কায়স্থ একই অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। করণজাতি হিন্দু যুগের পরে ক্রমে বঙ্গদেশে লোপ পাইয়াছে, আবার কায়স্থ জাতি হিন্দু যুগের পূর্ব্বে এদেশে সুপরিচিত ছিল না, পরে প্রাধান্য লাভ করিয়াছে। সুতরাং এরূপ অনুমান করা অসঙ্গত হইবে না যে, ভারতবর্ষের অন্য কোনো কোনো প্রদেশের ন্যায় বাংলা দেশেও করণ কায়স্থে পরিণত হইয়াছে অর্থাৎ উভয়ে মিলিয়া এক জাতিতে পরিণত হইয়াছে।
খৃষ্টীয় পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম শতাব্দীর তাম্রশাসনে ‘প্রথম-কায়স্থ’ ও ‘জ্যেষ্ঠকায়স্থ প্রভৃতির উল্লেখ দেখিয়া মনে হয় যে তখনো বাংলায় কায়স্থ শব্দে এক শ্রেণীর রাজকর্ম্মচারী মাত্র বুঝাইত। খৃষ্টীয় দশম শতাব্দীর একখানি শিলালিপিতে গৌড় কায়স্থ বংশের উল্লেখ আছে। সুতরাং এই সময়ে বাংলায় কায়স্থ জাতির উৎপত্তি হইয়াছে এরূপ মনে করা যাইতে পারে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে বৃহদ্ধর্ম্ম ও ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে কায়স্থের কোনো উল্লেখ নাই। কুলজী গ্রন্থের মতে আদিশূর কর্ত্তৃক আনীত পঞ্চ ব্রাহ্মণের সঙ্গে যে পঞ্চ ভৃত্য আসিয়াছিল তাহারাই ঘোষ, বসু, গুহ, মিত্র, দত্ত প্রভৃতি কুলীন কায়স্থের আদিপুরুষ।
.
৪. অনুষ্ঠ-বৈদ্য
বৈদ্য শব্দে প্রথমে চিকিৎসক মাত্র বুঝাইত-পরে ইহা একটি জাতিবাচক সংজ্ঞায় পরিণত হইয়াছে। ঠিক কোন সময়ে বাংলা দেশে এই জাতির প্রতিষ্ঠা হয় তাহা বলা কঠিন। সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীর চারিখানি লিপিতে দক্ষিণ ভারতবর্ষে বৈদ্যজাতির উল্লেখ আছে। ইঁহারা রাজ্যে ও সমাজে উচ্চমৰ্য্যাদার অধিকারী ছিলেন এবং হঁহাদের কেহ কেহ ব্রাহ্মণ বলিয়া বিবেচিত হইতেন। কিন্তু দ্বাদশ শতাব্দের পূৰ্ব্বে বাংলায় বৈদ্যজাতির অস্তিত্বের কোনো বিশ্বস্ত প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। শ্রীহট্টের রাজা ঈশানদেবের তাম্রশাসনে তাঁহার মন্ত্রী (পউনিক) বনমালীকর বৈদ্যবংশপ্রদীপ’ বলিয়া উল্লেখিত হইয়াছেন। পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে যে একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে বাংলার তিনজন রাজার রাজবৈদ্য করণবংশীয় ছিলেন। সুতরাং হিন্দু যুগে বাংলার চিকিৎসা-ব্যবসায়ীরা যে বৈদ্য নামক বিশিষ্ট কোনো জাতি বলিয়া পরিগণিত হইতেন ইহা সম্ভব বলিয়া মনে হয় না।
প্রাচীন ধর্ম্মশাস্ত্রে অন্বষ্ঠ জাতির উল্লেখ আছে। মনুসংহিতা অনুসারে চিকিৎসা ইহাদের বৃত্তি। মধ্যযুগে বাংলা দেশে অন্বষ্ঠ বৈদ্যজাতির অপর নাম বলিয়া গৃহীত হইত। বর্ত্তমানকালে অনেক বৈদ্য ইহা স্বীকার করেন না, কিন্তু সুপ্রসিদ্ধ। ভরতমল্লিক অনুষ্ঠ ও বৈদ্য বলিয়া নিজের পরিচয় দিয়াছেন। বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে অনুষ্ঠ ও বৈদ্য একই জাতির নাম, কিন্তু ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ অনুসারে এ দুইটি ভিন্ন জাতি। সম্ভবত বাংলায় বৈদ্য ও অনুষ্ঠ, কায়স্থ ও করণের ন্যায় একসঙ্গে মিশিয়া গিয়াছে। কিন্তু এ সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। বিহার ও যুক্তপ্রদেশে অনেক কায়স্থ অন্বষ্ঠ বলিয়া পরিচয় দেন। সূতসংহিতায় অন্বষ্ঠকে মাহিষ্য বলা হইয়াছে, কিন্তু ভরতমল্লিক বৈদ্য ও অন্যষ্ঠের অভিন্নত্ব-সূচক ব্যাস, অগ্নিবেশ ও শঙ্খস্মৃতি হইতে তিনটি শ্লোক উদ্ধৃত করিয়াছেন। ইহার কোনো স্মৃতিই খুব প্রাচীন নহে, এবং শ্লোকগুলিও অকৃত্রিম কি না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
.
৫. অন্যান্য জাতি
বাংলার অন্যান্য জাতি সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। যুগী, সুবর্ণবণিক ও কৈবর্ত্ত জাতি সম্বন্ধে বল্লালচরিতে অনেক কথা আছে, কিন্তু এই সমুদয় কাহিনী বিশ্বাসযোগ্য নহে। রামপালের প্রসঙ্গে দিব্য নামক কৈবৰ্ত্তনায়কের বিদ্রোহের উল্লেখ করা হইয়াছে। দিব্য, রুদোক ও ভীম এই তিনজন কৈবর্ত্ত রাজা বরেন্দ্রে রাজত্ব করেন, সুতরাং রাজ্যে ও সমাজে কৈবর্ত্ত জাতির যে বিশেষ প্রতিপত্তি ছিল ইহা অনুমান করা যাইতে পারে। কিন্তু সমসাময়িক স্মাৰ্ত্ত পণ্ডিত ভবদেবভট্ট কৈবৰ্ত্তকে অন্ত্যজ জাতি বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কৈবর্ত্ত ও মাহিষ্য সম্ভবত একই জাতি, কারণ উভয়েই স্মৃতি ও পুরাণে ক্ষত্রিয় পিতা ও বৈশ্যা মাতার সন্তান বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। বর্ত্তমানকালে পূর্ব্ববঙ্গের মাহিষ্য এবং পশ্চিমবঙ্গের চাষী কৈবৰ্ত্ত এক জাতি বলিয়া পরিগণিত। ইঁহাদের মধ্যে অনেক জমিদার ও তালুকদার আছেন এবং মেদিনীপুর জিলায় হঁহারাই খুব সম্ভ্রান্ত শ্ৰেণী। কিন্তু আর এক শ্রেণীর কৈবর্ত্ত ধীবর বলিয়া পরিচিত এবং মৎস্য বিক্রয়ই ইহাদের ব্যবসায়। ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে উক্ত হইয়াছে যে তীবর-সংসর্গহেতু কলিযুগে কৈবৰ্তগণ পতিত হইয়া ধীবরে পরিণত হইয়াছে। সম্ভবত বর্ত্তমানকালের ন্যায় প্রাচীনকালেও কৈবর্ত্ত জাতি হালিক ও জালিক এই দুই বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। বিষ্ণুপুরাণে যে কৈর্বত্ত জাতিকে অব্ৰহ্মণ্য বলা হইয়াছে, এবং বল্লালসেন যে কৈবৰ্ত্ত জাতিকে জলাচরণীয় করিয়াছিলেন বলিয়া বল্লালচরিতে উক্ত হইয়াছে, তাহা সম্ভবত কেবলমাত্র শেষোক্ত শ্ৰেণী সম্বন্ধেই প্রযোজ্য। বাংলার আরও অনেক জাতির মধ্যে এইরূপ উচ্চ ও নীচ শ্ৰেণী দেখিতে পাওয়া যায়। বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে উত্তম সংকর শ্ৰেণীর মধ্যে গোপের উল্লেখ আছে, ইহারা লেখক; কিন্তু মধ্যম সংকরের মধ্যে আভীর জাতির উল্লেখ আছে, ইহারা সম্ভবত দুগ্ধ-ব্যবসায়ী। বর্ত্তমানকালেও সপোপ ও গয়লা দুইটি বিভিন্ন জাতি।
