দাক্ষিণাত্য বৈদিকগণের মতে তাঁহাদের পূর্ব্বপুরুষেরা উৎকল, দ্রাবিড় প্রভৃতি দেশ হইতে আসিয়া বাংলায় বসবাস করেন। ইঁহারা বলেন যে আর্য্যাবর্তে মুসলমানদিগের রাজ্য প্রতিষ্ঠা হইলে সেখানে বেদাদি শাস্ত্রচর্চ্চার ক্রমশ হ্রাস হইল। কিন্তু দ্রাবিড়াদি দাক্ষিণাত্য প্রদেশে বেদের বিলক্ষণ চর্চ্চা থাকায় বঙ্গদেশীয় ব্রাহ্মণগণ তাহাদিগকে সাদরে স্বদেশে বাস করাইলেন।
পাশ্চাত্য বৈদিকগণের কুলগ্রন্থে তাঁহাদের যে বিবরণ পাওয়া যায় তাহা সংক্ষিপ্ত এই :
“গৌড়দেশের রাজা শ্যামলবর্ম্মা বিক্রমপুরে রাজধানী স্থাপন করেন। একদিন তাঁহার রাজপ্রাসাদে একটি শকুনি পতিত হওয়ায় শান্তি যজ্ঞের অনুষ্ঠান আবশ্যক হইল। গৌড়ের ব্রাহ্মণগণ নিরগ্নিক ও যজ্ঞে অনভিজ্ঞ, সুতরাং রাজা শ্যামলবর্ম্মা তাঁহার শ্বশুর কান্যকুজের (মতান্তরে কাশীর) রাজা নীলকণ্ঠের নিকট গমন করিয়া তথা হইতে যশোধর মিশ্র ও অন্য চারিজন সাগ্নিক ব্রাহ্মণকে সঙ্গে লইয়া ১০০১ শাকে (১০৭৯ অব্দে) স্বীয় রাজ্যে প্রত্যাবর্ত্তন করেন। যজ্ঞ সমাপনান্তে শ্যামলবর্ম্মা গ্রামাদি দান করিয়া তাহাদিগকে এই দেশে প্রতিষ্ঠিত করিলেন। তাঁহাদের সন্তানেরাই পাশ্চাত্য বৈদিক নামে খ্যাত হইয়াছেন।”
পূর্ব্বোক্ত রাঢ়ীয় ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদের কুলগ্রন্থের ন্যায় উল্লিখিত বিবরণের প্রায় প্রত্যেক বিষয়েই বৈদিক কুলজী গ্রন্থে পরস্পরবিরোধী মত পাওয় যায়। এমনকি কোনো কোনো কুলগ্রন্থে রাজার নাম শ্যামলবর্ম্মার পরিবর্তে হরিবর্ম্মা বলিয়া লিখিত হইয়াছে। অবশ্য এই দুইজনই বৰ্ম্মবংশীয় প্রসিদ্ধ রাজা। কোনো কোনো কুলগ্রন্থে বর্ণিত হইয়াছে যে শ্যামলবর্ম্মা কর্ত্তৃক আনীত পঞ্চ গোত্রীয় বৈদিক ব্রাহ্মণেরা কালক্রমে ‘বেদজ্ঞান-বিমূঢ় হওয়াতে ১১০২ শকাব্দে অন্য গোত্রীয় ব্রাহ্মণেরা আসিয়া বৈদিক কুলে মিলিত হন। সুতরাং এই সমুদয় মতামতের সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।
বাংলায় গ্রহ-বিপ্র নামে এক শ্রেণীর ব্রাহ্মণ আছেন। ইঁহারা শাকদ্বীপী ব্রাহ্মণ বলিয়াও পরিচিত। ইঁহাদের কুলপঞ্জিকায় উক্ত হইয়াছে যে গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক রোগাক্রান্ত হইয়া বৈদ্যগণের চিকিৎসায় সুফল না পাওয়ায় সরযূ নদীর তীরবাসী জপ-যজ্ঞপরায়ণ দ্বাদশ জন ব্রাহ্মণকে আনাইয়া গ্ৰহযজ্ঞ অনুষ্ঠান করেন ও রোগমুক্ত হন। রাজার আদেশে ইঁহারা সপরিবারে গৌড়দেশে বাস করেন। ইঁহারা শাকদ্বীপবাসী মার্তণ্ডাদি আটজন মুনির বংশধর। গরুড় শাকদ্বীপ হইতে ইহাদের পূৰ্বপুরুষগণকে মধ্যদেশে আনয়ন করিয়াছিলেন।
এতদ্ব্যতীত অন্য কোনো কোনো শ্রেণীর ব্রাহ্মণও সম্ভবত হিন্দু যুগে বাংলায় ছিলেন। কিন্তু তাঁহাদের সম্বন্ধে বিশ্বাসযোগ্য কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। বল্লালসেন তাঁহার গুরু অনিরুদ্ধভট্ট সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন তাহাতে অনুমিত হয় যে তিনি সারস্বত শ্রেণীর ব্রাহ্মণ ছিলেন। কুলজী অনুসারে অন্ধরাজ শূদ্রক সরস্বতী নদীর তীর হইতে তাঁহাদিগকে আনয়ন করেন। কুলজী গ্রন্থে ব্যাস, পরাশর, কৌণ্ডিণ্য, সপ্তশতী প্রভৃতি অন্য যে সমুদয়, ব্রাহ্মণশ্রেণীর উল্লেখ আছে তাঁহার কোনোটিই যে প্রাচীন হিন্দু যুগে বাংলায় বিদ্যমান ছিল, ইহার বিশ্বস্ত প্রমাণ এখন পৰ্য্যন্তও পাওয়া যায় নাই।
ব্রাহ্মণগণ যে সমাজে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মৰ্যাদা লাভ করিতেন এবং তাঁহাদের মধ্যে অনেকে প্রকৃত ব্রাহ্মণের উচ্চ আদর্শ অনুযায়ী জীবন যাপন করিতেন সে বিষয়ে সন্দেহ করিবার কারণ নাই। তাহাদের পাণ্ডিত্য, চরিত্র, ও অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা সমাজের আদর্শ ছিল। কিন্তু সকল ব্রাহ্মণই যে এইরূপ আদর্শ অনুসারে চলিতেন এরূপ মনে করা ভুল। এমনকি শাস্ত্রে ব্রাহ্মণের যে সমুদয় নির্দিষ্ট কৰ্ম্ম আছে, অনেক বিশিষ্ট ব্রাহ্মণও তাহা মানিয়া চলেন নাই। ভবদেবভট্ট ও দর্ভপানি বংশানুক্রমিক রাজমন্ত্রী ছিলেন। সমতটে দুইটি ব্রাহ্মণ বংশ সপ্তম শতাব্দীতে রাজত্ব করিতেন। ব্রাহ্মণেরা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। ব্রাহ্মণেরা যে অন্য নানাবিধ বৃত্তি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন শাস্ত্রে তাঁহার প্রমাণ পাওয়া যায়। ইহার কোনো কোনোটি-যেমন কৃষিকার্য্যে-অনুমোদিত ছিল। কিন্তু অনেকগুলিই নিন্দনীয় ছিল এবং তাঁহার জন্য ব্রাহ্মণগণকে প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইত। ভবদেবভট্ট এইরূপ কার্য্যের এক সুদীর্ঘ তালিকা দিয়াছেন। শূদ্রের অধ্যাপনা ও যাজন ইহার অন্যতম। তৎকালে জাতিভেদের কুফল ও সমাজের অধঃপতন কত দূর পৌঁছিয়াছিল ইহা হইতে তাহা জানা যায়। ভবদেবভট্ট রাজার মন্ত্রীত্ব ও যুদ্ধ করিয়াও ব্রাহ্মণের সর্বোচ্চ পদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণের আদর্শ বৃত্তি অধ্যাপন ও যাজন অবলম্বন করিয়া কোনো ব্রাহ্মণ যদি শূদ্রের জ্ঞান লাভে ও ধৰ্ম্মকাৰ্য্যে সহায়তা করিত তবে তাহাকে প্রায়শ্চিত্ত করিয়া শুদ্ধ হইতে হইত। অর্থাৎ ধৰ্ম্ম ও জ্ঞান লাভের জন্য ব্রাহ্মণের উপদেশ যাহাদের সর্বাপেক্ষা বেশী প্রয়োজন, তাহাদিগকে সাহায্য করা ব্রাহ্মণের পক্ষে নিন্দনীয় ছিল। চিত্রাদি শিল্প, বৈদ্যক ও জ্যোতিষশাস্ত্র প্রভৃতির চর্চ্চাও ব্রাহ্মণগণের পক্ষে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু রাজ্যশাসন, যুদ্ধ করা প্রভৃতি ব্রাহ্মণের আদর্শের সম্পূর্ণ বিরোধী কাজ করিয়াও ভবদেবের ন্যায় ব্রাহ্মণগণ আত্মশ্লাঘা করিতেন। ব্রাহ্মণগণের এই মনোবৃত্তিই যে সামাজিক অবনতি ও জ্ঞান বিজ্ঞানের অনুন্নতির একটি প্রধান কারণ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই।
