অবলোকিতেশ্বরের বহুসংখ্যক এবং খসর্পণ, সুগতি-সন্দর্শন, ষড়ক্ষরী প্রভৃতি বহুশ্রেণীর মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। ঢাকা জিলার মহাকালীতে একাদশ শতাব্দীতে নিৰ্মিত খসর্পণের একটি অতিশয় সুন্দর মূর্ত্তি পাওয়া গিয়ছে। সপ্তরথ পাদপীঠের উপর সনাল-পদ্ম-হস্তে ললিতাসনে উপবিষ্ট অবলোকিতেশ্বর যেন পরমকরুণাভরে পৃথিবী অবলোকন করিতেছেন। তাঁহার দক্ষিণ পার্শ্বে তারা ও সুধনকুমার এবং বাম পার্শ্বে ভূকুটী ও হয়গ্রীব পৃথক পৃথক পদ্মের উপরে আসীন। ঊর্ধ্বে প্রভাবলীতে পাঁচটি মন্দিরাভ্যন্তরে পঞ্চতথাগতের ধ্যানমূৰ্ত্তি এবং নিম্নে পাদপীঠে সূচীমুখমূর্ত্তি এবং নানা রত্ন ও উপচার খোদিত। রাজসাহী চিত্রশালায় ষড়ভুজ লোকেশ্বরের যে মূৰ্ত্তি আছে তাহা সম্ভবত সুগতি-সন্দর্শন লোকেশ্বর। ইঁহার এক হস্তে বরদমুদ্রা এবং এবং অন্য পাঁচ হস্তে পুঁথি, পাশ, ত্রিদণ্ডী (অথবা ত্রিশূল), অক্ষমালা এবং কমণ্ডলু। মালদহ জিলায় বাণীপুরে প্রাপ্ত ষড়ক্ষরী লোকেশ্বরের মূর্ত্তি বজ্ৰপৰ্য্যঙ্ক আসনে উপবিষ্ট ও চতুর্ভুজ; দুই হস্ত অঞ্জলিবদ্ধ ও অপর দুই হস্তে অক্ষমালা ও পদ্ম। মূর্ত্তির মস্তকে বজ্রমুকুট এবং দুই পার্শ্বে মণিধর ও ষড়ক্ষরী মহাবিদ্যার ক্ষুদ্র মূর্ত্তি।
মহাস্থানের নিকটে বলাইধাপে একটি সুন্দর মঞ্জুশ্রীর মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। মূর্ত্তিটি অষ্টধাতুনির্ম্মিত কিন্তু স্বর্ণপটে আচ্ছাদিত, এবং ইহার মস্তকের জটামধ্যে ধ্যানীবুদ্ধ অক্ষোভ্যের মূর্ত্তি। দ্বিভঙ্গ ভঙ্গীতে দণ্ডায়মান মঞ্জুশ্রীর বাম হস্তে ব্যাখ্যান বা বিতর্ক-মুদ্রা-কারণ ইনি হিন্দু দেবতা ব্রহ্মার ন্যায় জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের আকর। পরিহিত ধুতি মেখলা দ্বারা আবদ্ধ এবং চাদরখানি উপবীতের ন্যায় বাম স্কন্ধের উপর দিয়ে দেহের ঊর্ধ্বভাগ বেষ্টন করিয়া আছে। ঢাকা জিলার জালকুণ্ডী গ্রামে মঞ্জুশ্রীর অরপচন রূপের একখানি মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। তরবারিধৃত দক্ষিণ হস্ত খানির অগ্রভাগ ভাঙ্গিয়া গিয়াছে; বাম হস্তে বুকের নিকট একখানা পুঁথি ধরিয়া আছেন। চারপাশে জালিনী, উপকেশিনী, সূৰ্য্যপ্রভা ও চন্দ্রপ্রভা নামে তাঁহার চারিটি ক্ষুদ্র প্রতিমূর্ত্তি এবং প্রভাবলীর উপরিভাগে বৈরোচন, অক্ষোভ্য, অমিতাভ ও রত্নসম্ভব এই চারিটি ধ্যানীবুদ্ধের মূর্ত্তি।
বৌদ্ধ দেবতা জম্ভল পৌরাণিক দেবতা কুবেরের ন্যায় যক্ষগণের অধিপতি ও ধনসম্পদের অধিষ্ঠাত্ দেবতা। বাংলায় বহু জলমূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। স্থূলোদর এই মূৰ্ত্তির দক্ষিণ হস্তে অক্ষমা; বাম হস্তে একটি নকুলের গলা টিপিয়া ইহার মুখ হইতে ধন-রত্ন বাহির করিতেছেন। মূর্ত্তির নিম্নে একটি ধনপূর্ণ ঘট উপুড় হইয়া আছে।
হেরুকের মূৰ্ত্তি খুব কমই পাওয়া যায়। ত্রিপুরা জিলার শুভপুর গ্রামে হেরুকের একটি মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। নৃত্যপরায়ণ, দংষ্ট্ৰাকরালবদন এই মূর্ত্তির বাম হস্তে কপাল ও দক্ষিণ হস্তে বজ্ৰ; মস্তকে ধ্যানীবুদ্ধ অক্ষোভ্যের মূর্ত্তি, গলদেশে নরমুণ্ডমালা এবং বাম স্কন্ধে খট্বাঙ্গ।
হেবজ্রের একটি মূর্ত্তি মুর্শিদাবাদে পাওয়া গিয়াছে। শক্তির সহিত নিবিড় আলিঙ্গনাবদ্ধ দণ্ডায়মান মূর্ত্তির আট মস্তক ও ষোলো হাত; প্রতি হাতে একটি নরকপাল ও পদতলে কতকগুলি নর-শব।
মহাযান ও বজ্রযানে উপাস্যা দেবীর সংখ্যা অনেক। তন্মধ্যে প্রজ্ঞাপারমিতা, মারীচী, পর্ণশবরী, চুণ্ডা ও হারীতী এবং বিভিন্ন ধ্যানীবুদ্ধ হইতে প্রসূত বিভিন্ন তারা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রজ্ঞাপারমিতা দিব্যজ্ঞানের প্রতীক। তাঁহার মূর্ত্তি কমই পাওয়া গিয়াছে, কিন্তু অনেক প্রজ্ঞাপারমিতা-পুঁথির আচ্ছাদনের উপর তাঁহার ছবি উজ্জ্বল ও নানা রঙ্গে চিত্রিত আছে। পদ্মাসনে আসীনা দেবীর মুখমণ্ডলে জ্ঞানের দীপ্তি, এবং বক্ষোদেশ-সন্নদ্ধ এক হস্তে ব্যাখ্যান-মুদ্রা, অপর হস্তে জ্ঞানমুদ্রা ও প্রজ্ঞাপারমিতা-পুঁথি দেখিতে পাওয়া যায়।
মারীচীর তিন মুখ (একটি শূকরীর মুখ); আট হাতে বজ্র, অঙ্কুশ, শর, অশোকপত্র, সূচী, ধনু, পাশ ও তর্জনীমুদ্রা; মস্তকে ধ্যানীবুদ্ধ বিরোচনের মূর্ত্তি। সূৰ্য্যের ন্যায় তিনি প্রত্যূষের দেবী। সারথি রাহুচালিত সপ্তশূকরবাহিত রথে প্রত্যালীঢ় ভঙ্গীতে দণ্ডায়মান মারীচী মূর্ত্তিই সাধারণত এদেশে পাওয়া যায়।
রাজসাহী যাদুঘরে অষ্টাদশভুজা একটি চুণ্ডা মূর্ত্তি আছে। বিক্রমপুরের পর্ণশবরীর দুইটি মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। ইহার তিনটি মাথা ও ছয়খানি হাত; হাতে বজ্র, পরশু, শর, ধনু, পর্ণপিচ্ছিক প্রভৃতি। কয়েকটি বৃক্ষপত্র ব্যতীত অন্য কোনো পরিধান নাই। সম্ভবত পার্ব্বত্য শবরজাতির উপাস্যা দেবী বৌদ্ধ দেবীতে পরিণত হইয়াছেন।
অমোঘসিদ্ধি, রত্নসম্ভব এবং অমিতাভ এই তিন ধ্যানীবুদ্ধ হইতে প্রসূত তারা যথাক্রমে শ্যামতারা, বজ্রতারা ও ভূকুটীতারা নামে পরিচিত। শ্যামতারার মূৰ্ত্তি খুব বেশী পাওয়া যায়। তাঁহার হাতে একটি নীলপদ্ম এবং পার্শ্বে অশোককান্তা ও একজটার মূর্ত্তি। ফরিদপুর জিলায় মাজবাড়ী গ্রামে অষ্টধাতুনির্ম্মিত একটি বজ্রতারার মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। ইহা একটি পদ্মের আকার। পদ্মের কেন্দ্রস্থলে দেবীমূৰ্ত্তি এবং আটটি দলের মধ্যে তাঁহার আটটি অনুচরীর মূর্ত্তি। এই আটটি দল ইচ্ছা করিলে বন্ধ করিয়া রাখা যায়-তখন বাহির হইতে ইহা কেবলমাত্র একটি অষ্টদল পদ্ম বলিয়া মনে হয়। ঢাকা জিলার অন্তর্গত ভবানীপুর গ্রামে বীরাসনে উপবিষ্টা একটি দেবীমূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। ইহার তিন মাথা ও আট হাত। মূর্ত্তির মস্তকে অমিতাভ ও পাদপীঠে গণেশের মূৰ্ত্তি। কেহ কেহ মনে করেন যে, ইহা ভূকুটীতারার মূর্ত্তি।
