পুরাণ অনুসারে রেবন্ত সূর্যের পুত্র। রেবন্তের কয়েকটি মূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। দিনাজপুর জিলার ঘাটনগরে প্রাপ্ত মূর্ত্তিটি বুটজুতা-পরিহিত ও অশ্বারূঢ়; এক হস্তে কশা, অন্য হস্তে অশ্বের বলগা; একটি অনুচর দেবমূৰ্ত্তির মস্তকে ছত্র ধারণ করিয়া আছে; সম্মুখ হইতে একটি ও পশ্চাতে বৃক্ষের উপর হইতে আর একটি দস্যু রেবন্তকে আক্রমণ করিতে উদ্যত। ত্রিপুরা জিলায় বড়কামতা গ্রামে প্রাপ্ত ভগ্ন একটি মূর্ত্তিতে অশ্বারূঢ় রেবন্তের হস্তে একটি পাত্র এবং তাঁহার পশ্চাতে কুকুর, বাদক ও অনুচরের দল। সম্ভবত এটি মৃগয়াযাত্রার দৃশ্য। বৃহৎসংহিতা ও অন্যান্য গ্রন্থে রেবন্তের এইরূপ বর্ণনা আছে। ঘাটনগরের মূর্ত্তিটি মার্কণ্ডেয় পুরাণের বর্ণনার অনুরূপ।
নবগ্রহের সহিতও সূর্যের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ। নবগ্রহের মূৰ্ত্তি সাধারণত একসঙ্গে পৃথক কোনো প্রস্তরখণ্ডে অথবা অন্য কোনো দেবমূর্ত্তির পারিপার্শ্বিকরূপে উত্তীর্ণ দেখা যায়। চব্বিশ পরগণার অন্তর্গত কাকলদীঘি গ্রামে নবগ্রহের একটি সুন্দর মূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। নয়টি গ্রহদেবতা তাঁহাদের বিশিষ্ট লাঞ্ছন হস্তে এক পংক্তিতে দাঁড়াইয়া আছেন এবং তাঁহাদের বাহনগুলি যথাক্রমে পাদপীঠের নিম্নভাগে উত্তীর্ণ হইয়াছে। অগ্রভাগে গণেশের একটি মূর্ত্তি আছে। এই প্রকার নবগ্রহমূর্ত্তির সাহায্যেই সম্ভবত স্বস্ত্যয়ন অথবা গ্রহযোগ সম্পন্ন হইত। নবগ্রহের পৃথক পৃথক মূৰ্ত্তি বড় একটা পাওয়া যায় না। তবে পাহাড়পুরের প্রধান মন্দিরের তলভাগে যে সমুদয় প্রস্তরফলক আছে, তাহাতে চন্দ্র ও বৃহস্পতির দুইটি মূৰ্ত্তি উত্তীর্ণ আছে।
ইন্দ্র, অগ্নি, যম, বরুণ, কুবের প্রভৃতি দিকপালের মূৰ্ত্তিও পাহাড়পুরে ও বাংলার অন্যান্য স্থানে পাওয়া গিয়াছে।
.
৫. জৈনমূৰ্ত্তি
সাধারণত বাংলায় যে সকল দেবমূৰ্ত্তি পাওয়া যায়, তাহা অষ্টম শতাব্দীর পরবর্ত্তী। সম্ভবত ঐ সময় হইতেই বাংলায় জৈনধর্ম্মের প্রভাব ও প্রতিপত্তি খুবই কমিয়া যায় এবং এই কারণেই জৈনমূৰ্ত্তি বাংলায় খুব কমই পাওয়া গিয়াছে।
দিনাজপুর জিলার অন্তর্গত সুরহর গ্রামে তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের একটি অপূৰ্ব্ব মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। মন্দিরাকারে গঠিত শিলাপটের ঠিক মধ্যস্থলে বদ্ধপদ্মাসনে জিন ঋষভনাথ উপবিষ্ট, এবং পাদপীঠের নিম্নে তাঁহার বিশেষ লাঞ্ছন বৃষমূর্ত্তি। এই মূর্ত্তির উর্ধ্বে তিন সারিতে ও দুই পার্শ্বে দুই শ্রেণীতে অনুরূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মন্দিরে উপবিষ্ট অবশিষ্ট তেইশজন তীর্থঙ্করের ক্ষুদ্র মূর্ত্তি। মূল মূর্ত্তির দুই ধারে চৌরী হস্তে দুইজন অনুচর ও মস্তকের দুই পার্শ্বে মাল্যহস্তে দুইজন গন্ধৰ্ব্ব। এই সুন্দর মূর্ত্তিটি সূক্ষ্ম শিল্পজ্ঞানের পরিচায়ক এবং সম্ভবত পালযুগের প্রথমভাগে নির্ম্মিত। মেদিনীপুর জিলার বরভূমে ঋষভনাথের আর একটি মূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। ইহাতে কেন্দ্রস্থলে মূল মূর্ত্তির দুই পার্শ্বে চব্বিশজন তীর্থঙ্করের মূর্ত্তি; সকলেই কায়োৎসর্গ মুদ্রায় দণ্ডায়মান।
বাঁকুড়ার অন্তর্গত দেউলভিরে জিন পার্শ্বনাথের একটি মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। জিন যোগাসনে বসিয়া আছেন এবং তাঁহার মস্তকের উপর একটি সর্প সাতটি ফণা বিস্তার করিয়া আছে। চব্বিশ পরগণার কাঁটাবেনিয়ায় কায়োৎসর্গ মুদ্রায় দণ্ডায়মান একটি পার্শ্বনাথের মূর্ত্তির দুই পার্শ্বে অবশিষ্ট তেইশজন তীর্থঙ্করের মূর্ত্তি উত্তীর্ণ হইয়াছে।
বর্দ্ধমান জিলার উজানী গ্রামে জিন শান্তিনাথের একটি দণ্ডায়মান মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। পাদপীঠে তাঁহার বিশেষ লাঞ্ছন মৃগ এবং পশ্চাতে নবগ্রহের মূর্ত্তি খোদিত।
.
৬. বুদ্ধমূর্ত্তি
বাংলা দেশে যে সমুদয় বুদ্ধমূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে, তাঁহার মধ্যে রাজশাহী জিলার অন্তর্গত বিহারৈল গ্রামে প্রাপ্ত একটি মূর্ত্তি সর্বপ্রাচীন। ইহা গুপ্তযুগে নির্ম্মিত সারনাথের বুদ্ধমূর্ত্তিগুলির অনুরূপ।
খুলনা জিলার অন্তর্গত শিববাটি গ্রামে শিবরূপে পূজিত একটি মূর্ত্তি (চিত্র নং ২৭ খ) পরবর্ত্তীকালের বুদ্ধমূর্ত্তির একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। জটিল ও বিচিত্র কারুকার্যখচিত প্রস্তরখণ্ডের মধ্যস্থলে মন্দিরের মধ্যে বুদ্ধ ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় উপবিষ্ট। বুদ্ধের জীবনের প্রধান প্রধান কতকগুলি ঘটনা–জন্ম, প্রথম উপদেশ, মহাপরিনির্বাণ, নালাগিরি-দমন, ত্রয়স্ত্রিংশ স্বর্গ হইতে অবতরণ প্রভৃতি-মূল মূর্ত্তির প্রভাবলীতে খোদিত। এই ঘটনাগুলি পৃথকভাবেও খোদিত দেখিতে পাওয়া যায়।
মহাযান ও বজ্রযান সম্প্রদায় যে পালযুগে এদেশে বিশেষ প্রসার লাভ করিয়াছিল, এই দুই মতের অনুযায়ী বহুসংখ্যক দেব-দেবীর মূর্ত্তিই তাঁহার সাক্ষ্য প্রদান করে। ইঁহাদের মধ্যে ধ্যানীবুদ্ধ, অবলোকিতেশ্বর (অথবা লোকেশ্বর) (চিত্র নং ২১ খ) ও মঞ্জুশ্রী নামক দুই বোধিসত্ত্ব, এবং তারা কয়েকটি প্রধান এবং জম্ভল, হেরুক ও হেবজ্র এই কয়টি অপ্রধান।
ধ্যানীবুদ্ধের মূৰ্ত্তি খুব বেশী পাওয়া যায় নাই। ঢাকা জিলার সুখবাসপুরে বজ্ৰসত্ত্বের একটি মূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। বীরাসনে উপবিষ্ট এই মূর্ত্তিটির দক্ষিণ হস্তে বজ্র এবং বাম হস্তে ঘণ্টা। পশ্চাদ্ভাগে উত্তীর্ণ লিপি হইতে অনুমিত হয় যে, মূর্ত্তিটি দশম শতাব্দীতে নির্ম্মিত।
