এতদ্ভিন্ন আরও অনেক বৌদ্ধ দেবী বা শক্তিমূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। অষ্টভুজা একটি সুন্দর দেবীমূৰ্ত্তি কেহ কেহ সিতাপত্রা বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন। আর একটি দেবীমূৰ্ত্তি মহাপ্রতিসরা (চিত্র নং ২১ গ) বলিয়া কেহ কেহ অনুমান করেন। কিন্তু প্রাচীন সাধনমালায় এই সমুদয় দেবীর যে বর্ণনা আছে, তাঁহার সহিত এই দুই মূর্ত্তির সামঞ্জস্য নাই।
১৮. সমাজের কথা
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ – সমাজের কথা
জাতিভেদ
যে যুগে মনুস্মৃতি, মহাভারত প্রভৃতি রচিত হয়, সেই যুগেই যে আৰ্য্য ধর্ম্ম ও সামাজিক রীতিনীতি প্রভৃতি বাংলা দেশে প্রভাব বিস্তার করে, তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। ইহার পূর্ব্বেকার বাঙ্গালীর ধর্ম্ম ও সমাজ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান খুবই অল্প। সামান্য যাহা কিছু জানা গিয়াছে, তাহাও সংক্ষেপে পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে।
জাতিভেদ আৰ্যসমাজের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর্য্যগণ এদেশে বসবাস করিবার ফলে বাংলায়ও ইহার প্রবর্ত্তন হয়। ইহার ফলে বঙ্গ, সুহ্ম, শবর, পুলিন্দ, কিরাত, পুণ্ড প্রভৃতি বাংলার আদিম অধিবাসীগণ প্রাচীন গ্রন্থে ক্ষত্রিয় বলিয়া গণ্য হয়। অল্পসংখ্যক বাঙ্গালী যে ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিগণিত হইত ইহা খুবই সম্ভবপর বলিয়া মনে হয়, কিন্তু কোনো প্রাচীন গ্রন্থে ইহার উল্লেখ পাওয়া যায় নাই। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে দীর্ঘতমা ঋষির যে কাহিনী উল্লিখিত হইয়াছে, তাহা হইতে স্পষ্টই প্রমাণিত হয় যে, আৰ্য ব্রাহ্মণগণ বাঙ্গালী কন্যা বিবাহ করিতেন। এইরূপ বিবাহের ফলেই আৰ্যপ্রভাব এদেশে পরিপুষ্টি লাভ করিয়াছিল।
যে সমুদয় বাঙ্গালী ব্রাহ্মণ অথবা ক্ষত্রিয় হইয়াছিল, তাহারা সম্ভবত সংখ্যায় খুব বেশী ছিল না। বাংলার আদিম অধিবাসীদের অধিকাংশই শূদ্রজাতিভুক্ত হইয়াছিল। মনুসংহিতাতে উক্ত হইয়াছে যে পুণ্ড্রক এবং কিরাত এই দুই ক্ষত্রিয় জাতি ব্রাহ্মণের সহিত সংস্রব না থাকায় ও শাস্ত্রীয় ক্রিয়াকৰ্ম্মাদির অনুষ্ঠান না করায় শূদ্রত্ব লাভ করিয়াছে। কৈবর্ত্তজাতি মনুসংহিতায় সংকর জাতি বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে, কিন্তু বিষ্ণুপুরাণে অব্ৰহ্মণ্য বলিয়া অভিহিত হইয়াছে। সম্ভবত এইরূপে আরও অনেকের জাতি-বিপর্যয় ঘটিয়াছে। সুতরাং ইহা সহজেই অনুমান করা যায় যে বাংলা দেশের জাতি বিভাগ বহু পরিবর্ত্তনের মধ্য দিয়া বর্ত্তমান আকার ধারণ করিয়াছে।
খৃষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে যে এদেশে বহুসংখ্যক ব্রাহ্মণ বাস করিতেন, তাহা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। তাঁহার পরবর্ত্তী সকল যুগেই যে এদেশে বহু ব্রাহ্মণ বাস করিতেন, তাঁহার বহুবিধ প্রমাণ আছে। বাংলার বহু রাজবংশ-পাল, সেন, বৰ্ম প্রভৃতি তাঁহাদের লিপিতে ক্ষত্রিয় বলিয়া অভিহিত হইয়াছেন। এদেশে এরূপ একটি মত প্রচলিত আছে যে, বাংলায় কলিকালে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য ছিল না, কেবল ব্রাহ্মণ ও শূদ্র এই দুই বর্ণ ছিল। ইহার কোনো ভিত্তি নাই। প্রাচীনকালে বাংলায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারি বর্ণই ছিল এবং হিন্দু যুগের শেষভাগে বাংলায় রচিত প্রামাণিক শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদিতে চারি বর্ণেরই উল্লেখ এবং তাহাদের বৃত্তি প্রভৃতি নির্দিষ্ট আছে।
কিন্তু আৰ্যসমাজ আদিতে চারি বর্ণে বিভক্ত হইলেও ক্রমে বহুসংখ্যক বিভিন্ন জাতির সৃষ্টি হয়। যে সময় বাংলায় আৰ্যপ্রভাব বিস্তৃত হয়, সে সময় আৰ্যসমাজে এরূপ বহু জাতির উদ্ভব হইয়াছে। মনুসংহিতা প্রভৃতি প্রাচীন ধর্ম্মশাস্ত্রে উক্ত হইয়াছে যে, বিভিন্ন বর্ণের পুরুষ ও স্ত্রীর সন্তান হইতেই এই সমুদয় মিশ্রবর্ণের সৃষ্টি হইয়াছে এবং কোন কোন বর্ণ অথবা জাতির মিশ্রণের ফলে কোন কোন মিশ্রবর্ণের সৃষ্টি হইল, তাঁহার সুদীর্ঘ তালিকা আছে। এই তালিকাগুলির মধ্যে অনেক বৈষম্য দেখা যায়। তাঁহার কারণ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মিশ্রবর্ণের উদ্ভব হইয়াছিল। প্রতি ধৰ্ম্মশাস্ত্রে সাধারণত তৎকালে স্থানীয় সমাজে প্রচলিত মিশ্রবর্ণেরই উল্লেখ আছে, সুতরাং স্থান ও কাল অনুসারে এই মিশ্রবর্ণের যে পরিবর্ত্তন হইয়াছে। ধর্ম্মশাস্ত্রে তাঁহার পরিচয় পাওয়া যায়। ধর্ম্মশাস্ত্রে মিশ্রবর্ণেরই উৎপত্তির যে ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে, তাহা যে অধিকাংশস্থলেই কাল্পনিক, সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু একথাও অস্বীকার করা কঠিন যে, এইরূপ ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করিয়াই প্রধানত সমাজে এই সমুদয় মিশ্রবর্ণের উচ্চ-নীচ ভেদ নির্দিষ্ট হইয়াছে। বাংলা দেশের সমাজে যখন এই জাতিভেদ প্রথা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ভারতের সর্বত্রই আৰ্যসমাজে আদিম চতুৰ্ব্বর্ণের পরিবর্তে এইরূপ মিশ্র জাতিই সমাজের প্রধান অঙ্গে পরিণত হইয়াছে। সুতরাং বাঙ্গালী সমাজের প্রকৃত পরিচয় জানিতে হইলে, বাংলার এই মিশ্র জাতি সম্বন্ধে সঠিক ধারণা করার প্রয়োজন।
হিন্দু যুগে বাংলা দেশে রচিত কোনো শাস্ত্রগ্রন্থে মিশ্র জাতির তালিকা থাকিলে, বাংলার জাতিভেদ সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ সম্ভবপর হইত, কিন্তু এরূপ কোনো গ্রন্থের অস্তিত্ব এখন পর্য্যন্ত সঠিকভাবে জানা যায় নাই। তবে বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ এই দুইখানি গ্রন্থ, হিন্দু যুগের না হইলেও, ইহার অবসানের অব্যবহিত পরেই রচিত, এবং ইহাতে মিশ্র জাতির যে বর্ণনা আছে, তাহা বাংলা দেশ সম্বন্ধে বিশেষভাবে প্রযোজ্য, এরূপ অনুমান করিবার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। সুতরাং এই দুইখানি গ্রন্থের সাহায্যে বাংলা সমাজের জাতিভেদ-প্রথা সম্বন্ধে আলোচনা করিলে, হিন্দু যুগের অবসানকালে ইহা কিরূপ ছিল, তাঁহার সম্বন্ধে একটা মোটামুটি ধারণা করা যাইবে।
