বাংলায় এক শ্রেণীর চতুর্ভুজা দেবীমূৰ্ত্তি সচরাচর দেখা যায়। কেহ কেহ ইহাকে চণ্ডী এবং কেহ কেহ গৌরী-পাৰ্বতী নামে অভিহিত করিয়াছেন। এই দণ্ডায়মানা দেবীমূৰ্ত্তির হস্তে অক্ষসহ শিবলিঙ্গ, ত্রিদী অথবা ত্রিশূল, দাড়িম্ব ও কমণ্ডলু এবং পাদপীঠে একটি গোধিকার মূর্ত্তি। কোনো কোনো মূৰ্ত্তিতে দেবীর দুই পার্শ্বে কার্তিক-গণেশ অথবা লক্ষ্মী-সরস্বতী, সিংহ, মৃগ, ও কদলী বৃক্ষ, ঊর্ধ্বে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব এবং নবগ্রহ প্রভৃতির মূর্ত্তি দেখিতে পাওয়া যায়।
উপবিষ্টা দুর্গামূৰ্ত্তিও অনেক দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার কোনোটি চতুর্ভুজা, কোনোটি ষড়ভুজা। বিংশভুজা একটি মূর্ত্তিও পাওয়া গিয়াছে–ইনি সম্ভবত মহালক্ষ্মী। বিক্রমপুরের কাগজিপাড়ায় পাষাণ লিঙ্গের উদ্ধৃভাগ হইতে আবির্ভূত একটি দেবীমূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে; ইহার চারি হস্ত। দুইটি হস্ত ধ্যানমুদ্রাযুক্ত ও বক্ষোদেশের নিম্নভাগে সংন্যস্ত। তৃতীয় হস্তে অক্ষমালা ও চতুর্থ হস্তে পুঁথি। ইনি সম্ভবত মহামায়া অথবা ত্রিপুরভৈরবী।
দেবীর রুদ্রভাবদ্যোতক অনেক মূৰ্ত্তি পাওয়া যায়। ইহার মধ্যে মহিষমর্দিনীই সমধিক প্রসিদ্ধ। বর্ত্তমানে শরৎকালে বাংলায় যে দুর্গার পূজা হয়, তাহা এই মহিষ মর্দিনীর মূৰ্ত্তি হইতেই উদ্ভূত। এই মূর্ত্তি কেবল ভারতের সৰ্ব্বত্র নহে, সুদূর যবদ্বীপেও সুপরিচিত ছিল। মার্কণ্ডেয় পুরাণের চণ্ডী অধ্যায়ে এই দেবীর সবিশেষ বিবরণ আছে। অষ্ট অথবা দশভুজা সিংহবাহিনী দেবী সদ্য নিহত মহিষের দেহ হইতে নিষ্ক্রান্ত অসুরের সহিত যুদ্ধে নিরত, তাঁহার হস্তে ত্রিশূল, খেটক, শর, খড়গ, ধনু, পরশু, অঙ্কুশ, নাগপাশ প্রভৃতি আয়ুধ। দিনাজপুর জিলার পোর্শা গ্রামে নবদুর্গার মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। ইহার মধ্যস্থলে একটি বড় এবং চতুস্পার্শ্বে ক্ষুদ্র আটটি মহিষ-মর্দিনীর মূৰ্ত্তি। বড় মূর্ত্তিটির অষ্টাদশ এবং ক্ষুদ্র মূর্ত্তিগুলির ষোড়শ ভুজ। ভবিষ্যৎ পুরাণে এই দেবীর বর্ণনা আছে। দিনাজপুরের বেত্রা গ্রামে ৩২টি হস্তবিশিষ্টা অসুরের সহিত যুদ্ধরতা একটি দেবীর মূর্ত্তিও পাওয়া গিয়াছে। কোনো গ্রন্থেই ইহার বর্ণনা নাই এবং এরূপ অন্য কোনো মূৰ্ত্তিও এ পর্য্যন্ত পাওয়া যায় নাই। বাখরগঞ্জের অন্তর্গত শিকারপুর গ্রামে পূজিতা উগ্রতারা দেবীমূৰ্ত্তির চারি হস্তে খড়গ, তরবারি, নীলোৎপল ও নরমুণ্ড। শবের উপর দণ্ডায়মান দেবীমূর্ত্তির উপরিভাগে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, কার্তিক ও গণেশের মূর্ত্তি উৎকীর্ণ।
বাংলায় পাশাপাশি উত্তীর্ণ সপ্তমাতৃকার মুক্তিযুক্ত প্রস্তরখণ্ড অনেক পাওয়া গিয়াছে। এই মাতৃকাগণ দেবগণের শক্তিরূপে কল্পিত। ইঁহাদের নাম ব্রহ্মাণী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, ইন্দ্রাণী, বৈষ্ণবী, বারাহী ও চামুণ্ডা। চামুণ্ডার পৃথক ও বিভিন্ন রূপের মূর্ত্তি অনেক পাওয়া যায়। ইহার কোনো কোনোটি ষড়ভুজা, নানা আয়ুধধারিণী ও নৃত্যপরায়ণা। বর্দ্ধমান জিলার অট্টহাস গ্রামে চামুণ্ডা দেবীর দম্ভরারূপের এক অদ্ভুত মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। ইহার অতি ক্ষীণ শীর্ণ দেহ, গোলাকৃতি চক্ষু, বিকশিত দন্ত, পৈশাচিক হাস্য, কোটরগত জঠর ও ঊৰ্দ্ধজানু হইয়া বসিবার ভঙ্গী-সকলই একটা অদ্ভুত ভৌতিক রহস্যের দ্যোতক।
চামুণ্ডা ব্যতীত ব্রহ্মাণী, বারাহী ও ইন্দ্রাণী (চিত্র নং ২২ খ) এই তিন মাতৃকারও পৃথক মূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। তবে তাহা সংখ্যায় অল্প।
প্রধান প্রধান ধর্ম্মমত ব্যতীত এদেশে অনেক লৌকিক ধৰ্ম্মানুষ্ঠান ও দেব দেবীর পূজা জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত ছিল। পরবর্ত্তীকালে এই সমুদয় দেব দেবী শিব অথবা বিষ্ণুর পরিবারভুক্ত বলিয়া গণ্য হইলেও আদিতে হঁহারা লৌকিক দেবতা মাত্র ছিলেন, এরূপ অনুমানই সঙ্গত বলিয়া মনে হয়। এইরূপ যে সমুদয় দেবীর মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে তাহাদের মধ্যে মনসা, হারীতী, ষষ্ঠী, শীতলা প্রভৃতির উল্লেখ করা যাইতে পারে। গঙ্গা ও যমুনার মূর্ত্তি সাধারণত মন্দিরের দরজার দুই পার্শ্বে খোদিত থাকে, কিন্তু তাঁহাদের পৃথক মূর্ত্তিও পাওয়া গিয়াছে (চিত্র নং ৯)।
বাংলা দেশে ও পূর্ব্ব ভারতের অন্যান্য প্রদেশে এক শ্রেণীর দেবীমূর্ত্তি বহুসংখ্যায় দেখিতে পাওয়া যায়। দেবী একটি শিশুপুত্র পার্শ্বে লইয়া শুইয়া আছেন এবং একটি কিঙ্করী তাঁহার পদসেবা করিতেছে। উৰ্দ্ধদেশে শিবলিঙ্গ এবং কার্তিক, গণেশ ও নবগ্রহের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মূর্ত্তি। কেহ কেহ ইহাকে কৃষ্ণ-যশোদার মূর্ত্তি বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন, আবার কেহ কেহ মনে করেন যে, শিশুটি সদ্যোজাত শিবের মূর্ত্তি।
.
৪. অন্যান্য পৌরাণিক দেবমূর্ত্তি
রাজসাহী জিলার অন্তর্গত কুমারপুর ও নিয়ামপুরে যে দুইটি সূৰ্য্যমূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে, তাহা গুপ্তযুগে নির্ম্মিত বলিয়া অনুমিত হয়। এই প্রাচীন মূর্ত্তিতে সূর্যের দুই হস্ত সনাল পদ্ম, দুই পার্শ্বে অনুচর ও পাদপীঠে সপ্তাশ্ব উত্তীর্ণ দেখিতে পাওয়া যায়। বগুড়া জিলার দেওড়া গ্রামে প্রাপ্ত রথারূঢ় সূৰ্য্যমূর্ত্তিতে সারথি অরুণের দুই পার্শ্বে দণ্ডী ও পিঙ্গল নামক দুই অনুচর ব্যতীত শরনিক্ষেপকারিণী ঊষা ও প্রত্যুষা নামে দুই দেবী আছেন। পরবর্ত্তীকালের সূৰ্য্যমূৰ্ত্তিতে সংজ্ঞা ও ছায়া নামে সূর্যের দুই রাণী ও মহাশ্বেতা নামে আর এক পার্শ্বচারিণীর মূর্ত্তি এবং মূল মূর্ত্তির বক্ষোদেশ উপবীত ও পদদ্বয়ে জুতা দেখা যায় (চিত্র নং ১৫-১৭)। সূৰ্য্যমূৰ্ত্তি সাধারণত দ্বিভুজ কিন্তু দিনাজপুরের অন্তর্গত মহেন্দ্র নামক স্থানে একটি ষড়ভুজ সূৰ্য্যমূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। দক্ষিণ ভারতের সূৰ্য্যমূর্ত্তির ন্যায় বাংলার কৃচিৎ দুই-একটি মূর্ত্তিতে জুতা দেখিতে পাওয়া যায় না। রাজসাহী জিলার অন্তর্গত মান্দায় প্রাপ্ত একটি সূৰ্য্যমূর্ত্তির তিনটি মুখ ও দশটি বাহু। পার্শ্বের দুইটি মুখের ভাব অতিশয় উগ্র ও দশ বাহুতে শক্তি, খট্টাঙ্গ, ডমরু প্রভৃতি দেখিয়া অনুমিত হয় যে ইহা মার্তণ্ড-ভৈরবের মূর্ত্তি। কিন্তু শারদাতিলক তন্ত্র অনুসারে মার্তণ্ড-ভৈরবের চারিটি মুখ।
