বাংলায় নটরাজ শিবের যে সমুদয় মূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে, তাঁহার হস্তসংখ্যা দশ অথবা বারো এবং শিব বৃষপৃষ্ঠে নৃত্যপরায়ণ। দক্ষিণ ভারতের নটরাজ বৃষারূঢ় নহেন এবং তাঁহার মাত্র চারি হাত। বাংলার দশভুজ নটরাজ মূর্ত্তির সহিত মৎস্যপুরাণের বর্ণনার ঐক্য আছে। এই বর্ণনা অনুযায়ী শিবের দক্ষিণ চারি হস্তে খড়গ, শক্তি, দণ্ড, ত্রিশূল এবং বাম চারি হস্তে খেটক, কপাল, নাগ ও খট্টাঙ্গ; নবম হস্তে অক্ষমালা, এবং দশম হস্ত বরদামুদ্রাযুক্ত। দ্বাদশভুজ শিবের মূর্ত্তি অন্যরূপ। শিব দুই হস্তে বীণা বাজাইতেছেন, দুই হস্তে তাল দিতেছেন ও আর দুই হস্তে ছত্রের ন্যায় সর্প ধরিয়া আছেন; বাকী হস্তগুলিতে শিবের সুপরিচিত আয়ুধাদি আছে। ঢাকা জিলাস্থিত শঙ্করবাঁধা গ্রামে প্রাপ্ত একটি মূর্ত্তি (চিত্র নং ২২ গ) নটরাজ শিবের সুন্দর দৃষ্টান্ত। ইহার দশ হস্তে মৎস্যপুরাণোক্ত আয়ুধাদি আছে। শিবের বাহন বৃষটিও নৃত্যশীল প্রভুর দিকে মুখ ফিরাইয়া দুই পা ঊর্ধ্বে তুলিয়া নৃত্য করিতেছে। ইহার দুই পার্শ্বে মকরবাহিনী গঙ্গা ও সিংহবাহিনী পার্ব্বতী। মূর্ত্তির উপরে ও উভয় পার্শ্বে প্রধান প্রধান দেব-দেবীর মূর্ত্তি। পাদপীঠে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য নাগ-নাগিনী ও গণের নৃত্যপরায়ণ মূর্ত্তি। শিল্পী পারিপার্শ্বিকের সাহায্যে নটরাজ শিবের সৌন্দর্য্য উজ্জ্বলরূপে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন।
সদাশিব-মূর্ত্তি বাংলায় অনেক পাওয়া গিয়াছে। সেনরাজগণের তাম্রশাসন মুদ্রায় যে এই মূর্ত্তি উল্কীর্ণ তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। মহানিৰ্বাণতন্ত্র, উত্তরকামিকাগম এবং গরুড়পুরাণে সদাশিব মূৰ্ত্তির বর্ণনা আছে। শেষোক্ত দুইখানি গ্রন্থের বর্ণনার সহিত বাংলার সদাশিব-মূৰ্ত্তির অধিকতর সঙ্গতি দেখা যায়। এই বর্ণনা অনুসারে বদ্ধপদ্মাসনস্থিত সদাশিব-মূর্ত্তির পাঁচটি মুখ ও দশটি হস্ত থাকিবে। দক্ষিণ দুই হস্ত অভয় ও বরদ মুদ্রাযুক্ত এবং অবশিষ্ট তিন হস্তে শক্তি, ত্রিশূল ও খট্টাঙ্গ; বাম পাঁচ হস্তে সর্প, অক্ষমালা, ডমরু, নীলোৎপল ও লেবুফল থাকিবে। তাঁহার পার্শ্বে মনোম্মানীর মূর্ত্তি থাকিবে। দিনাজপুর জিলার অন্তর্গত রাজিবপুরে তৃতীয় গোপালের লিপিযুক্ত সদাশিব-মূর্ত্তি বাংলার এই জাতীয় মূর্ত্তির একটি সুন্দর নিদর্শন। ইহাতে মনোম্মানীর মূৰ্ত্তি নাই, কিন্তু পঞ্চরথ পাদপীঠের মধ্যস্থলে শূলধারী দুইটি শিবকিঙ্করের মূর্ত্তি আছে। বাংলার সদাশিব মূর্ত্তিগুলির সহিত দক্ষিণ ভারতে রচিত শাস্ত্রের বর্ণনার সামঞ্জস্য এবং সেনরাজগণের শাসনমুদ্রায় সদাশিব মূর্ত্তি দেখিয়া কেহ কেহ অনুমান করেন যে, সেনরাজগণই দাক্ষিণাত্য হইতে বাংলায় সদাশিব-মূর্ত্তির প্রচলন করেন। কিন্তু যে শৈব আগম হইতে সদাশিব পূজার উৎপত্তি, তাহা উত্তর ভারতেই রচিত হয়। সম্ভবত এই আগমোক্ত সদাশিব পূজা প্রথমে উত্তর ভারত হইতে দাক্ষিণাত্যে প্রচারিত হয়, পরে সেনরাজগণ তথা হইতে ইহা বাংলায় প্রচলন করেন।
শিবের আলিঙ্গন অথবা উমা-মহেশ্বর মূর্ত্তি বাংলায় সুপরিচিত। শিবের বাম জানুর উপর উপবিষ্ট উমা দক্ষিণ হস্তে শিবের গলদেশ বেষ্টন করিয়াছেন এবং বাম হস্তে একখানি দর্পণ ধরিয়া আছেন। শিবের দক্ষিণ হস্তে একটি পদ্ম এবং বাম হস্ত দ্বারা তিনি দেবীকে আলিঙ্গন করিয়া আছেন। সম্ভবত তান্ত্রিক ধৰ্ম্মমতের প্রভাবেই বাংলায় এই মূর্ত্তির বহুল প্রচার হইয়াছিল। কারণ তন্ত্রমতে সাধকগণকে শিবের ক্রোড়ে উপবিষ্টা দেবীমূর্ত্তিকে ধ্যান করিতে হয়, এবং এই প্রকার মূৰ্ত্তি সম্মুখে রাখিলে এই ধ্যানযোগের সুবিধা হয়।
বৈবাহিক অথবা কল্যাণসুন্দর মূর্ত্তিতে শিবের ঠিক সম্মুখেই গৌরী দাঁড়াইয়া আছেন। শেষোক্ত দুই প্রকার মূর্ত্তিতে শিব ও উমার মূর্ত্তি একত্র হইলেও পৃথক। কিন্তু অর্দ্ধনারীশ্বর মূর্ত্তিতে উভয়ে এক দেহে পরিণত হইয়াছেন। এই মূর্ত্তির দক্ষিণ-অর্দ্ধ শিবের ও বাম-অৰ্দ্ধ উমার। অর্দ্ধনারীশ্বর ও কল্যাণসুন্দর মূর্ত্তি বাংলায় খুব বেশী পাওয়া যায় নাই।
এ পর্য্যন্ত শিবের যে সমুদয় মূর্ত্তি আলোচিত হইয়াছে, তাহা সৌমাভাবের দ্যোতক। শিবের রুদ্র মূর্ত্তি ভারতের অন্যান্য প্রদেশে খুব প্রচলিত থাকিলেও বাংলায় মাত্র অল্প কয়েকটি পাওয়া গিয়াছে। এইগুলিতে শিবের দিগম্বর, নরমুণ্ডমালা-বিভূষিত, উলঙ্গ নরদেহের উপর দণ্ডায়মান মূর্ত্তি এবং গুর্ধ-শকুনী পরিবেষ্টিত নরমুণ্ড-রচিত পাদপীঠ প্রভৃতি বীভৎস ভাবের পরিকল্পনা দেখা যায়।
শিবের পুত্র গণেশের বহুসংখ্যক মূর্ত্তি বাংলায় পাওয়া গিয়াছে। উপবিষ্ট, দণ্ডায়মান ও নৃত্যশীল, গণেশের এই তিন প্রকার মূর্ত্তি পরিকল্পিত হইয়াছে। কার্তিকের পৃথক মূৰ্ত্তি খুবই কম। কিন্তু উত্তরবঙ্গে ময়ূরবাহন কার্তিকের একটি সুন্দর মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে (চিত্র নং–২১ ক)।
.
৩. শক্তি-মূর্ত্তি
বাংলায় বহুসংখ্যক ও বিভিন্ন শ্রেণীর দেবীমূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। ইহার কোনো কোনোটিতে বৈষ্ণব প্রভাব দেখিতে পাওয়া যায়, কিন্তু অধিকাংশই শাক্তগণের আরাধ্য দেবী।
ত্রিপুরা জেলার দেউবাড়ী স্থানে প্রাপ্ত অষ্টধাতুনির্ম্মিত দেবীমূর্ত্তির পাদপীঠে খড়গবংশীয়া রাণী প্রভাবতীর লিপি উৎকীর্ণ আছে। সুতরাং ইহা সপ্তম শতাব্দীর এবং এই শ্রেণীর মূর্ত্তির সর্বপ্রাচীন নিদর্শন। দেবী অষ্টভুজা ও সিংহবাহিনী, এবং তাঁহার হস্তে শঙ্খ, তীর, অসি, চক্র, ঢাল, ত্রিশূল, ঘণ্টা ও ধনু। পরবর্ত্তীকালে রচিত শারদাতিলক-তন্ত্রে এই দেবী দ্রদুর্গা, ভদ্রকালী, অম্বিকা, ক্ষেমঙ্করী ও বেদগর্ভা প্রভৃতি নামে অভিহিত হইয়াছেন, কিন্তু উত্তীর্ণ লিপি অনুসারে ইহার নাম সৰ্ব্বাণী।
