বিষ্ণুর দশ অবতারের মূর্ত্তি-সম্বলিত প্রস্তরখণ্ড অনেক পাওয়া গিয়াছে। পৃথকভাবে বরাহ, নরসিংহ ও বামন অবতারের মূর্ত্তিই সাধারণত দেখা যায়। মৎস্য, বলরাম ও পরশুরাম এই তিন অবতারেরও মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। মৎস্য মূর্ত্তি চতুর্ভুজ; ঊর্ধ্বদেশ মানুষের ও অধোদেশ মৎস্যের আকৃতি (চিত্র নং ২০)। বরাহমূৰ্ত্তিরও কেবল মুখটি বরাহের, অন্যান্য অংশ মানুষের মতন।
রাজসাহী চিত্রশালায় একটি দণ্ডায়মান মূৰ্ত্তির বিশ হস্তে গদা, অঙ্কুশ, খড়গ, মুদ্র, শূল, শর, চক্র, খেটক, ধনু, পাশ, শঙ্খ প্রভৃতি আয়ুধ। দুই পার্শ্বে স্থুলোদর দুইটি মূর্ত্তি। মূল মূৰ্ত্তি বনমালা ও অন্যান্য ভূষণে ভূষিত। ইহা সম্ভবত বিষ্ণুর বিশ্বরূপ মূর্ত্তি।
ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর একাত্মক একটি মূৰ্ত্তি উত্তরবঙ্গে পাওয়া গিয়াছে। চতুর্মুখ ব্রহ্মার তিনটি মুখই কেবল দেখা যায়; তাঁহার চারি হস্তে সুক, সুব, অক্ষমালা ও কমণ্ডলু। মূৰ্ত্তির দুই পার্শ্বে লক্ষ্মী, সরস্বতী, শঙ্খপুরুষ ও চক্ৰপুরুষ এবং গলে বনমালা বিষ্ণুর নিদর্শন। পাদপীঠের এক পার্শ্বে ব্রহ্মার বাহন হংস ও অপর পার্শ্বে বিষ্ণুর বাহন গরুড়ের মূর্ত্তি।
ব্রহ্মার যে সমুদয় পৃথক মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে, তাহাও চতুর্মুখ (একটি অদৃশ্যমান) ও স্থূলোদর এবং তাঁহার বাহন ও চারি হস্তে ধৃত দ্রব্যাদি উক্ত মূর্ত্তির অনুরূপ।
সাধারণত বিষ্ণুমূর্ত্তির বাহন ও পার্শ্বচরীরূপে পরিকল্পিত হইলেও গরুড়, (চিত্র নং ২৭ গ) লক্ষ্মী ও সরস্বতীর পৃথক মূৰ্ত্তিও পাওয়া গিয়াছে। রাজসাহী চিত্রশালায় এইরূপ একটি গরুড়মূৰ্ত্তি রক্ষিত আছে। ইহার অঞ্জলিবদ্ধ হস্তে ও মুখশ্রীতে সেবকের ভক্তি ও শ্রদ্ধার ভাব চমৎকার ফুটিয়া উঠিয়াছে।
বগুড়ায় একটি চমৎকার অষ্টধাতুনির্ম্মিত লক্ষ্মীমূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। ত্রিভঙ্গ ভঙ্গীতে দণ্ডায়মান দেবীর তিন হস্তে ফল, অঙ্কুশ ও ঝাঁপি (আর এক হস্ত ভগ্ন); দুই পার্শ্বে চামরহস্তে পার্শ্বচরী; মস্তকোপরি প্রস্ফুটিত পদ্মদলের দুই দিক হইতে দুইটি হস্তী শুণ্ডধৃত কলসীর জল দিয়া দেবীকে স্নান করাইতেছে। লক্ষ্মীর এই প্রকার গজমূৰ্ত্তিই সাধারণত দেখা যায়। কিন্তু দুই হস্তবিশিষ্ট সাধারণ লক্ষ্মীমূৰ্ত্তিও পাওয়া গিয়াছে।
সরস্বতীর মূর্ত্তি সাধারণত চারি হস্ত-বিশিষ্ট। দেবী দুই হস্তে বীণা বাজাইতেছেন, অপর দুই হস্তে অক্ষমালা ও পুস্তক। দেবীর দুই পার্শ্বে চামরধারিণী, পাদপীঠে কোনো কোনো স্থলে তাঁহার সুপরিচিত বাহন হংস, কিন্তু কোনো স্থলে আবার একটি মেষের মূর্ত্তি দেখিতে পাওয়া যায়। ছাতিনা গ্রামে প্রাপ্ত সরস্বতীর মূর্ত্তি (চিত্র নং ২৩) ইহার চমৎকার দৃষ্টান্ত।
.
২. শৈবমূর্ত্তি
শিব সাধারণত লিঙ্গরূপেই পূজিত হইতেন। লিঙ্গ প্রধানত দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। সাধারণ শিবলিঙ্গ বাংলায় সুপরিচিত এবং চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্ত্তির ন্যায় ইহাও এদেশে বহু সংখ্যায় পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু আর এক প্রকার লিঙ্গ আছে। ইহাতে লিঙ্গের উপর শিবের মুখ খোদিত থাকে, ইহার নাম মুখলিঙ্গ। মুখের সংখ্যা অনুসারে মুখলিঙ্গ একমুখ বা চতুর্মুখ। একমুখ লিঙ্গই বেশী পাওয়া যায়। ত্রিপুরা জিলায় উনকোটি গ্রামে প্রস্তরনির্ম্মিত এবং মুর্শিদাবাদে অষ্টধাতুর চতুর্মুখ লিঙ্গ পাওয়া গিয়াছে।
শিবের মূর্ত্তি নানারূপে কল্পিত হইয়াছে। ইহার মধ্যে চন্দ্রশেখর, নটরাজ বা নৃত্যমূৰ্ত্তি, সদাশিব, উমা-মহেশ্বর, অর্দ্ধনারীশ্বর ও কল্যাণ-সুন্দর, শিবের সৌম্য ভাব দ্যোতক, এবং অঘোর-রুদ্র তাঁহার উগ্রভাবের পরিকল্পনা। পাহাড়পুরে শিবের তিনটি চন্দ্রশেখর-মূৰ্ত্তি খোদিত আছে। ইহাদের তিন নেত্র, উলিঙ্গ ও জটামুকুট এবং দুই হস্তে ত্রিশূল, অক্ষমালা ও কমণ্ডলু প্রভৃতি লক্ষিত হয়। একটি মূর্ত্তিতে সর্প শিবের গলদেশে জড়াইয়া আছে। বিবসন হইলেও শিবের গলায় হার, কর্ণে, কুণ্ডল এবং বাহুতে কেয়ুর প্রভৃতি ভূষণ ও গলায় যজ্ঞোপবীত আছে।
পরবর্ত্তীকালে শিবের মূর্ত্তিতে আরও অনেক বৈচিত্র্য ও উপাদান-বাহুল্য দেখা যায়। রাজসাহী জিলার গণেশপুরে প্রাপ্ত মূৰ্ত্তি (চিত্র নং ২২ ক) ইহার এক উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। চতুর্ভুজ মূর্ত্তির এক হস্তে দীর্ঘ দলবিশিষ্ট পদ্ম, আর এক হস্তে শূল অথবা খট্টাঙ্গ (অপর দুই হস্ত ভগ্ন)। বিচিত্র কারুকাৰ্য্যশোভিত সপ্তরথ পাদপীঠের কেন্দ্রস্থলে বিশ্বপদ্মের উপর নানা বিভূষণে সজ্জিত শিব ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমায় দণ্ডায়মান। মস্তকের চতুর্দিকে বিচিত্র প্রভাবলী,ইহার দুই পার্শ্বে মালা হস্তে উড্ডীয়মান গন্ধৰ্ব্ব। মূর্ত্তির পশ্চাতে কারুকার্যখচিত সিংহাসন ও নিম্নে দুই পার্শ্বে দুইজন কিঙ্কর ও কিঙ্করী। কিঙ্করগণের হস্তে শূল ও কপাল এবং কিঙ্করীগণের হস্তে চামর। ইহা শিবের ঈশানমূৰ্ত্তি। বরিশাল জিলার অন্তর্গত কাশীপুর গ্রামে বিরূপাক্ষরূপে পূজিত চতুর্ভুজ শিব সম্ভবত নীলকণ্ঠ। সারদাতিলক তন্ত্র অনুসারে নীলকণ্ঠের পাঁচটি মুখ। এই মূর্ত্তির মুখ মাত্র একটি, কিন্তু উক্ত তন্ত্রের বর্ণনা অনুযায়ী ইহার হস্তে অক্ষমালা, ত্রিশূল, খট্টাঙ্গ ও কপাল আছে। বর্ণনার অতিরিক্ত এই মূর্ত্তিতে কীর্তিমুখের পরিবর্তে ছত্র, প্রভাবলীর দুই পার্শ্বে কার্তিক-গণেশের মূৰ্ত্তি ও নিয়ে দুই পার্শ্বে মকরবাহিনী গঙ্গা ও সিংহবাহিনী পার্ব্বতীর মূর্ত্তি প্রভৃতি বিশেষ লক্ষ্য করিবার বিষয়। মূৰ্ত্তির অধোভাগে শিবের বাহন নন্দীর মূর্ত্তি। বরিশাল জিলায় প্রাপ্ত একটি ব্রঞ্জের শিবমূৰ্ত্তির (চিত্র নং ২৮ খ) শীর্ষদেশে ধ্যানীবুদ্ধের মূর্ত্তির ন্যায় একটি মূর্ত্তি বিশেষভাবে লক্ষ্য করিবার বিষয়। এরূপ দ্বিতীয় মূৰ্ত্তি এখনো পাওয়া যায় নাই।
