তৎকালে শৈব, বৈষ্ণব, সৌর প্রভৃতি পৌরাণিক বিভিন্ন ধর্ম্মসম্প্রদায়ের মধ্যে কেবলমাত্র যে সদ্ভাব ছিল তাহা নহে, ইহাদের ব্যবধানরেখাও সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হইয়া ওঠে নাই। বৈদ্যদেবের তাম্রশাসনে তাঁহাকে পরম-মাহেশ্বর ডোম্মনপালের তাম্রশাসনে ভগবান নারায়ণের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হইয়াছে। বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেনের সদাশিব মুদ্রা-সংযুক্ত তাম্রশাসনে প্রথমে নারায়ণ ও পরে সূর্য্যের স্তব আছে, কিন্তু উক্ত রাজগণ পরমসৌর বলিয়া অভিহিত হইয়াছেন। এই তাম্রশাসনগুলি শৈব, বৈষ্ণব ও সৌর সম্প্রদায়ের অপূৰ্ব্ব সমন্বয়ের দৃষ্টান্ত।
.
দ্বিতীয় খণ্ড –দেব-দেবীর মূর্ত্তি পরিচয়
বাংলা দেশের প্রায় সৰ্ব্বত্রই বহু দেব-দেবীর মূর্ত্তি, আবিষ্কৃত হইয়াছে। ইহাদের উল্লেখ বা বিস্তৃত বর্ণনা করা বর্ত্তমান গ্রন্থে সম্ভবপর নহে। সুতরাং সংক্ষেপেই এ বিষয়টি আলোচনা করিব।
১. বিষ্ণমূৰ্ত্তি
বিষ্ণুমূৰ্ত্তির চারিহস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম থাকে। কোনো কোনো স্থলে চক্র ও গদার প্রতিকৃতির পরিবর্তে একটি পুরুষ ও নারীমূর্ত্তি দেখা যায়। ইহাদের নাম চক্ৰপুরুষ ও গদাদেবী। বিষ্ণুর ভিন্ন ভিন্ন হস্তে এই চারিটি ভূষণ পরিবর্ত্তন করিয়া ২৪টি বিভিন্ন প্রকারের বিষ্ণুমূর্ত্তি পরিকল্পিত হইয়াছে। বাংলায় সচরাচর ত্রিবিক্রম রূপের বিষ্ণুই দেখা যায়। ইহার নিম্ন ও উৰ্দ্ধবাম এবং উৰ্দ্ধ ও নিম্নদক্ষিণ হস্তে যথাক্রমে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম, এবং দুই পার্শ্বে শ্রী ও পুষ্টি অর্থাৎ লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মূর্ত্তি। মালদহ জিলার হাঁকরাইল গ্রামে প্রাপ্ত মূর্ত্তিই সম্ভবত বাঙ্গালার সৰ্ব্বপ্রাচীন বিষ্ণুমূৰ্ত্তি। ইহার পদদ্বয় ও দুই হস্ত ভগ্ন এবং নিম্নদক্ষিণ হস্তে পদ্ম ও উপরের বাম হস্তে শঙ্খ। মূর্ত্তিটির মস্তকে কিরীট, কর্ণে কুণ্ডল, গলায় হার, বাহুতে অঙ্গদ ও বক্ষোদেশে যজ্ঞোপবীত।
বরিশাল জিলার অন্তর্গত লক্ষ্মণকাটি গ্রামে একটি প্রকাণ্ড বিষ্ণুমূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। ইহার উচ্চতা ৬’-৪”। ঊর্ধ্বে উড্ডীয়মান ত্রিনেত্র গরুড়ের পক্ষোপরি বিষ্ণু ললিতাসনে উপবিষ্ট। তাঁহার উৰ্দ্ধদক্ষিণ ও বাম হস্তে ধৃত পদ্মনালের উপর যথাক্রমে লক্ষ্মী (গজ লক্ষ্মী) ও বীণাবাদিনী বাণীমূর্ত্তি। অন্য দুই হস্তে চক্ৰপুরুষসহ চক্র ও গদাদেবী। মস্তকের ষট্কোণ কিরীটের মধ্যস্থলে ধ্যানস্থ চতুর্ভুজ দেবমূর্ত্তি। হস্তোপরি লক্ষ্মী ও সরস্বতী (শ্ৰী ও পুষ্টি) এবং কিরীটস্থ ধ্যানী দেবমূৰ্ত্তি,-এই দুইটিই আলোচ্য মূর্ত্তির বিশেষত্ব, এবং ইহা সম্ভবত বৌদ্ধ মহাযান মতের প্রভাব সূচিত করে। কেহ কেহ এই মূর্ত্তিটি গুপ্তযুগের বলিয়া মনে করেন, কিন্তু ইহা সম্ভবত আরও অনেক পরবর্ত্তী কালের।
চৈতন্যপুরের (বর্দ্ধমান) একটি বিষ্ণুমূৰ্ত্তির পরিকল্পনায়ও বিশেষত্ব আছে। গদা ও চক্রের নীচে গদাদেবী ও চক্ৰপুরুষ। দণ্ডায়মান বিষ্ণুর দুই হস্ত ঘঁহাদের মাথায় আর দুই হস্তে শঙ্খ ও পদ্ম। মূর্ত্তিটির মুখাকৃতি ও পরিহিত বসন সবই একটু অদ্ভুত রকমের। ইহা সম্ভবত বৈখানসাগমে বর্ণিত অভিচারক-স্থানক মূর্ত্তি।
সাগরদীঘিতে প্রাপ্ত অষ্টধাতুনির্ম্মিত বিষ্ণুমূর্ত্তির বিশেষত্ব এই যে তাঁহার তিনটি ভূষণ-শঙ্খ, চক্র ও গদা-একটি পূর্ণ-প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর রক্ষিত এবং প্রতি পদ্মের নালটি বিষ্ণু হস্তে ধরিয়া আছেন।
দিনাজপুর জিলার সুরাহর গ্রামে প্রাপ্ত বিষ্ণুমূৰ্ত্তি সাতটি নাগফণার নীচে দণ্ডায়মান। শ্রী ও পুষ্টির পরিবর্তে দুইপার্শ্বে দুইটি পুরুষমূর্ত্তি (সম্ভবত শঙ্খপুরুষ ও চক্ৰপুরুষ)। মধ্যস্থিত নাগফণার উপরিভাগে ক্ষুদ্র দ্বিভুজ ধ্যানী মূর্ত্তি এবং পাদপীঠের মধ্যভাগে ষড়ভুজ নৃত্যপরায়ণ শিব। অনেকে অনুমান করেন যে, উপরিস্থিত ধ্যানীমূৰ্ত্তি ব্রহ্মা এবং সমগ্র মূর্ত্তিটি ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব এই ত্রিমূর্ত্তির পরিকল্পনা। কিন্তু ব্রহ্মার দুই ভুজ ও এক মুখ বড় দেখা যায় না। সুতরাং এ মূর্ত্তিটিও সম্ভবত মহাযান মতের প্রভাবের ফল।
এইরূপ বিশেষত্ব খুব কম মূর্ত্তিতেই দেখা যায়। সচরাচর যে সমুদয় বিষ্ণুমূর্ত্তি দেখিতে পাওয়া যায়, বাঘাউরা গ্রামে প্রাপ্ত সম্রাট মহীপালের তৃতীয় রাজ্য সম্বৎসরে উৎকীর্ণ লিপি-সংযুক্ত মূর্ত্তিটি তাঁহার একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন (চিত্র নং ১৮)। শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী দণ্ডায়মান বিষ্ণুমূৰ্ত্তি উত্তম বসন-ভূষণে সজ্জিত; কিরীট, কুণ্ডল, অঙ্গদ, বনমালা, মেখলা, বসন প্রভৃতি বিচিত্র কারুকাৰ্য্য-খচিত; ঊর্ধে মস্তকোপরি প্রভাবলী, তাঁহার দুই পার্শ্বে পুস্পমাল্য-হস্তে উডড্ডীয়মান বিদ্যাধরযুগলের মূর্ত্তি, মূর্ত্তির পশ্চাতে সিংহাসন ও অধোদেশে দুই পার্শ্বে লক্ষ্মী ও সরস্বতী; পাদপীঠের মধ্যস্থলে প্রস্ফুটিত পদ্মদলের উপর বিষ্ণুর চরণযুগল; ইহার দক্ষিণভাগে দুইটি ও বামভাগে একটি মনুষ্যমূর্ত্তি, সম্ভবত ইহারা মূর্ত্তি-প্রতিষ্ঠাকারী ও তাঁহার পরিবারবর্গ।
বিষ্ণুমূৰ্ত্তি সাধারণত দণ্ডায়মান (চিত্র নং ১৯), কিন্তু কোনো কোনো স্থলে অর্দ্ধশয়ান, অথবা যোগাসনে উপবিষ্ট। কোনো কোনো মূর্ত্তিতে বিষ্ণু ও লক্ষ্মী একত্র উপবিষ্ট দেখা যায়। ঢাকা জিলাস্থিত বাস্তা গ্রামের লক্ষ্মী-নারায়ণ মূৰ্ত্তি ইহার একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। বিষ্ণু ও তাঁহার বাম উরুর উপর লক্ষ্মী, এই যুগলমূৰ্ত্তি গরুড়ের পৃষ্ঠদেশে বসিয়া আছেন। উভয়েরই একটি চরণ গরুড়ের প্রসারিত এক এক হস্তে র উপর স্থাপিত। গরুড়ের অন্য দুইটি হস্ত সম্মুখে অঞ্জলিবদ্ধ।
