বাংলায় বৌদ্ধধর্ম্মের যে রূপান্তর ঘটিয়াছিল, তাঁহার অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত আলোচনা করা হইল,-কারণ যত দূর জানা যায় তাহাতে ইহাই ধৰ্ম্মজগতে বাংলার বিশিষ্ট দান বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। অন্য যে সমুদয় ধর্ম্মমত বাংলায় প্রচলিত ছিল-তাহা মোটামুটিভাবে নিখিল ভারতবর্ষীয় ধর্ম্মেরই অনুরূপ, তাঁহার মধ্যে বাংলার বৈশিষ্ট্য কিছু থাকিলেও তাহা নিরূপণ করিবার কোনো উপায় নাই। কিন্তু অষ্টম হইতে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বৌদ্ধধর্ম্মের যে রূপান্তর ঘটিয়াছিল তাঁহার উপর ব্লাঙ্গালীর প্রভাবই যে বেশী একথা সকলেই স্বীকার করেন। এই রূপান্তরই আবার বাংলার অন্যান্য ধর্ম্মমতের উপর প্রভাব বিস্তার করিয়া বাংলার ধর্ম্ম ও সমাজে যে বিপ্লব ঘটাইয়াছিল, বাংলার মধ্যযুগে, এমনকি বর্ত্তমানকালেও তাঁহার স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। বৌদ্ধধর্ম্ম বাংলা হইতে বিলুপ্ত হইয়াছে-একথা এক হিসাবে সত্য। কিন্তু এত বড় একটা ধর্ম্মমত যে একেবারে নিশ্চিহ্ন হইয়া মুছিয়া গিয়াছে ইহা বিশ্বাস করা কঠিন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মত প্রকাশ করিয়াছিলেন যে ধর্ম্মঠাকুরের পূজাই বৌদ্ধধর্ম্মের শেষ। কিন্তু বাংলার বৌদ্ধধর্ম্ম কেবলমাত্র এই সব লৌকিক অনুষ্ঠানেই পৰ্য্যবসিত হয় নাই। উল্লিখিত আলোচনা হইতে বুঝা যাইবে যে, যে সমুদয় ধর্ম্মমত মধ্যযুগে বাংলায় প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল তাহা অনেকাংশে প্রত্যক্ষ অথবা প্রচ্ছন্নভাবে বৌদ্ধমতের পরিণতি মাত্র।
.
১০. বাংলার ধর্ম্মমত
এ পর্য্যন্ত আমরা বিভিন্ন ধর্ম্মসম্প্রদায় সম্বন্ধে পৃথকভাবে আলোচনা করিয়াছি। উপসংহারে বাংলার ধর্ম্মমত সম্বন্ধে কয়েকটি সাধারণ তথ্যের উল্লেখ আবশ্যক। প্রাচীন বাংলায় বৈদিক, পৌরাণিক, বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্ম্মের আপেক্ষিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি কিরূপ ছিল তাহা জানিতে স্বতই ইচ্ছা হয়। পূৰ্ব্বে হুয়েন সাংয়ের যে উক্তি উদ্ধৃত হইয়াছে, তাহা হইতে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, সপ্তম শতাব্দীতে বৌদ্ধ ও জৈনদিগের তুলনায় ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মাবলম্বীর সংখ্যা খুব বেশী ছিল। ঐ সময়ে জৈনগণের সংখ্যাও অনেক ছিল। পরবর্ত্তীকালে জৈনগণের সংখ্যা খুবই কমিয়া যায়, কিন্তু পৌরাণিক ধৰ্ম্ম পূৰ্ব্ববৎ বৌদ্ধধর্ম্ম অপেক্ষা অধিকতর শক্তিশালী ছিল কি না, ইহা নিশ্চিত বলা যায় না। পালরাজগণের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম্ম যথেষ্ট প্রতিপত্তি লাভ করিলেও ইহার প্রভাব যে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মকে ছাড়াইয়া উঠিয়াছিল, অনেকে এরূপ মনে করেন না। কারণ অষ্টম হইতে দ্বাদশ শতাব্দীর যে সমুদয় মূর্ত্তি বা লিপি এযাবৎ পাওয়া গিয়াছে, তাঁহার অধিকাংশই পৌরাণিক ধর্ম্মের প্রভাব সূচিত করে। তবে ইহা অসম্ভব নহে যে, বৌদ্ধধৰ্ম্ম জনসাধারণের মধ্যে বেশি প্রচলিত ছিল এবং পৌরাণিক ধৰ্ম্ম সাধারণত ধনী, শিক্ষিত ও উচ্চশ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সহজিয়া ধর্ম্মের বিবরণ হইতে এরূপ ধারণা করা অসঙ্গত হইবে না যে, সমাজের নিম্নস্তরের মধ্যেই ইহার বিশেষ প্রসার ছিল। ডোম্বী, নটী, রজকী, চণ্ডালী প্রভৃতি কুলের নামে ইহার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং চর্য্যাপদগুলি পাঠ করিলেও এই ধারণাই বদ্ধমূল হয়। পরবর্ত্তীকালে সহজিয়া বৌদ্ধমত হইতে যে সমুদয় ধর্ম্মসম্প্রদায়ের উদ্ভব হইয়াছিল, তাহাও সমাজের নিম্নশ্রেণীর মধ্যেই বেশী প্রচলিত ছিল। সরহের দোহা হইতে জানা যায় যে, সিদ্ধাচার্যগণ ব্রাহ্মণের প্রভুত্বের বিরুদ্ধে তীব্র মত পোষণ করিতেন, এবং স্বীয় সম্প্রদায়ে জাতিভেদ প্রথা দূর করিয়াছিলেন। অসম্ভব নহে যে, সহজিয়া মতের জনপ্রিয়তার ইহাও একটি কারণ। বাংলা দেশে মোট জনসংখ্যার তুলনায় উচ্চশ্রেণীর হিন্দুগণ সংখ্যায় এত কম কেন, এই সমস্যার কোনো সন্তোষজনক মীমাংসা হয় নাই। বাংলায় হিন্দু যুগের শেষে বৌদ্ধমতের প্রভাব ইহার অন্যতম কারণ বলিয়া অনুমান করা খুব অসঙ্গত নহে।
শৈব ও বৈষ্ণব এই দুই ধৰ্ম্মমতের মধ্যে কোনটি প্রবল ছিল, তাহা বলা শক্ত। তবে হিন্দু যুগের শেষ দুই-তিন শতাব্দীর যে সমুদয় মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে, তাঁহার সংখ্যামূলক তুলনা করিলে বৈষ্ণব ধর্ম্মমতেরই প্রাধান্য সূচিত হয়।
রাজগণের ধর্ম্মমত অনেক সময় অন্তত কতক পরিমাণে জনসাধারণের ধর্ম্মমত প্রতিফলিত করে। সুতরাং বাংলার রাজগণের ধর্ম্মমত কিরূপ ছিল, তাঁহার আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক নহে। পূর্ব্ববর্ত্তী কয়েকটি অধ্যায়ে বিভিন্ন রাজবংশের যে ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে, তাহা হইতে জানা যায় যে, খড়গ, চন্দ্র ও পালবংশ এবং কান্তিদেব, রণবঙ্কমল্ল প্রভৃতি রাজা বৌদ্ধ ছিলেন। বৈন্যগুপ্ত শশাঙ্ক, লোকনাথ, ডোম্মনপাল এবং সেনবংশীয় বিজয়সেন ও বল্লালসেন শৈব ছিলেন। বর্ম্মণ ও দেববংশ এবং বল্লালসেনের পরবর্ত্তী সেনবংশীয় রাজগণ বৈষ্ণব ছিলেন। গুপ্তযুগের পরবর্ত্তী বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজগণ-গোপচন্দ্ৰ ধৰ্ম্মাদিত্য, সমাচারদেব-ব্রাহ্মণ ধর্ম্মাবলম্বী ছিলেন; কিন্তু তাঁহারা শৈব, বৈষ্ণব প্রভৃতি সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন কি না, তাহা নির্ণয় করিবার উপায় নাই।
এই সমুদয় বিভিন্ন সম্প্রদায় বর্ত্তমান থাকিলেও ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ন্যায় বাংলায়ও যে ইহাদের মধ্যে কলহ ও দ্বেষ হিংসা ছিল না, বরং যথেষ্ট সম্ভাব ছিল, তাঁহার বহু প্রমাণ আছে। রাজগণ ধর্ম্ম বিষয়ে উদার মত পোষণ করিতেন। বৌদ্ধ পালরাজগণ যে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্ম বিষয়ে বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তাঁহাদের শাসনলিপি হইতেই তাহা প্রমাণিত হয়। ধর্ম্মপাল ও তৃতীয় বিগ্রহপাল যে বর্ণাশ্রম ধৰ্ম্ম মানিয়া চলিতেন, দুইখানি তাম্রশাসনে তাঁহার স্পষ্ট উল্লেখ আছে। নারায়ণপাল নিজে একটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, এবং তাঁহার ব্রাহ্মণ মন্ত্রীর যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হইয়া অনেকবার শ্রদ্ধা-সলিলাপুত-হৃদয়ে নতশিরে, পবিত্র (শান্তি) বারি গ্রহণ করিয়াছিলেন”। মদনপালের প্রধানা মহিষী চিত্রমতিকা মহাভারত-পাঠ শ্রবণ করিয়া দক্ষিণস্বরূপ ব্রাহ্মণকে ভূমিদান করিয়াছিলেন। বৌদ্ধ দেবখগের মহিষী প্রভাবতী চণ্ডীমূর্ত্তির প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। অপরদিকে শৈব রাজা বৈন্যগুপ্ত বৌদ্ধবিহার নির্মাণ, এবং একজন ব্রাহ্মণ সস্ত্রীক সোমপুরের জৈন বিহারের ব্যয় নিৰ্বাহাৰ্থ ভূমিদান করিয়াছিলেন। রাজা শ্রীধরণরাতের মন্ত্রী জয়নাথ বৌদ্ধবিহার ও ব্রাহ্মণদিগকে ভূমিদান করেন। এই সমুদয় দৃষ্টান্ত হইতে বুঝা যায় যে, সেকালে পরস্পরের ধর্ম্মমতের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা ছিল। কান্তিদেবের তাম্রশাসনে ইহার আরও ব্যাপক পরিচয় পাই। তাঁহার পিতা ধনদও বৌদ্ধ ছিলেন, কিন্তু তাঁহার মাতা ছিলেন শিবের উপাসিকা। ধনদত্ত বৌদ্ধ হইলেও রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণ প্রভৃতিতে অভিজ্ঞ ছিলেন, একথা তাঁহার পুত্রের তাম্রশাসনে স্পষ্ট উল্লিখিত হইয়াছে।
