যে ধর্ম্মে কেবলমাত্র গুরুর বচনই প্রামাণিক, তাঁহার সাধন-প্রণালী অনেক পরিমাণেই গুহ্য ও রহস্যে আবৃত। সুতরাং সহজিয়া ধর্ম্মের সাধারণ বিবরণ ব্যতীত বিস্তৃত বিশ্লেষণ সম্ভবপর নহে। এই ধর্ম্মে গুরু প্রথমত সাধকের আধ্যাত্মিক শক্তির উৎকর্ষ অপকর্ষ বিবেচনা করিয়া তাঁহার জন্য তদনুযায়ী সাধন মার্গ নির্দিষ্ট করিয়া দিতেন। এই শক্তির পরিমাণ অনুসারে পাঁচটি কুল (শ্রেণী) কল্পিত হইয়াছিল-ইহাদের নাম ডোম্বী, নটী, রজকী, চণ্ডালী ও ব্রাহ্মণী। যে পঞ্চ মহাভূত দেহের প্রধান উপকরণ (স্কন্ধ) তাঁহার উপরই এই কুল-বিভাগ প্রতিষ্ঠিত। উপাসকের মধ্যে কোন স্কন্ধটি কিরূপ প্রবল তাহা স্থির করিয়া গুরু তাঁহার প্রজ্ঞা বা শক্তির স্বরূপ নির্ণয় করেন। পরে যে সাধন-প্রণালী অনুসরণ করিলে ঐ বিশেষ শক্তির বৃদ্ধি হইতে পারে প্রতি সাধকের জন্য তিনি তাঁহার ব্যবস্থা করেন।
এই সাধন-প্রণালী এক প্রকার যোগবিশেষ। শরীরের মধ্যে যে ৩২টি নাড়ী আছে তাঁহার মধ্য দিয়ে শক্তিকে মস্তকের সর্বোচ্চ প্রদেশে (মহাসূক্ষ্ম স্থানে) প্রবাহিত করা এই যোগের লক্ষ্য। এই স্থানটি চতুঃষষ্ঠি অথবা সহস্রদল পদ্মরূপে কল্পিত হইয়াছে। রেলওয়ে লাইনে যেমন স্টেশন ও জংশন আছে, দেহাভ্যন্তরের নাড়ীগুলিরও সেই বিরাম ও সংযোগস্থল আছে; ইহাগিদকে পদ্ম ও চক্রের সহিত তুলনা করা হইয়াছে এবং ঊর্ধ্বগমনকালে শক্তিকে এই সমুদয় অতিক্রম করিতে হয়। শক্তি যখন মহাসূক্ষ্মস্থানে পৌঁছে তখন সাধনার শেষ ও সাধকের পরম ও চরম আনন্দ অর্থাৎ মহাসুখ লাভ হয়। সাধকের নিকট তখন বহির্জগৎ লুপ্ত হয়, ইন্দ্রিয়াদি কিছুরই জ্ঞান থাকে না। সাধক, জগৎ, বুদ্ধ সব একাকার হইয়া যায়,-অদ্বৈত জ্ঞান ব্যতীত আর সকলই শূন্যতাপ্রাপ্ত হয়।
সহজিয়া ধর্ম্মের ইহাই মূল তত্ত্ব। তবে বজ্রযান, সহজযান, কালচক্রযান প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধন-প্রণালীর মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। বজ্রযানে সাধক সাঙ্কেতিক মন্ত্রোচ্চারণের সাহায্যে দেব-দেবীকে পূজা করেন। ইহার ফলে দেব-দেবীগণ মণ্ডলাকারে সাধকের চতুর্দিকে উপবিষ্ট হন। তখন আর তাঁহার মন্ত্র উচ্চারণ করিবার শক্তি থাকে না, কেবলমাত্র মুদ্রা অর্থাৎ হস্তের ও অঙ্গুলির নানারূপ বিন্যাস দ্বারাই পূজা করিতে হয়। সহজযানে এইসব পূজার বিধি নাই। কালচক্রযানেও উল্লিখিত যোগ সাধনাই প্রধান, এবং এই সাধনার উপযুক্ত কাল, অর্থাৎ মুহূর্ত, তিথি, নক্ষত্রের উপরেই বেশী জোর দেওয়া হইয়াছে।
চরম গুরুবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত ও গোপন রহস্যে আবৃত থাকায় সহজিয়া ধৰ্ম্ম ক্ৰমেই আধ্যাত্মিক অধঃপতনের পথে অগ্রসর হইতে লাগিল। বৌদ্ধধর্ম্মের বিধিবিধান যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তাহা নিশ্চিহ্ন হইয়া লোপ পাইল। অনুরূপ কারণে হিন্দুর তন্ত্রোক্ত সাধনাও এই অবস্থায় পরিণত হইয়াছিল। ক্রমে সহজিয়া ধর্ম্ম ও তান্ত্রিক সাধনা একাকার হইয়া বাংলার ধৰ্ম্ম-জগতে যে বীভৎসতার সৃজন করিল তাঁহার বিস্তৃত পরিচয় অনাবশ্যক।
বাংলার শাক্ত ধৰ্ম্মও এই সহজিয়া মতের সহিত মিলিত হইয়া গেল। ফলে একদিকে নূতন নূতন শাক্ত সম্প্রদায় ও অপরদিকে নাথপন্থী, সহজিয়া, অবধূত, বাউল প্রভৃতির সৃষ্টি হইল।
সম্প্রতি নেপালে এই প্রকার এক নূতন শাক্ত সাম্প্রদায়ের কতকগুলি শাস্ত্রগ্রন্থ আবিষ্কৃত হইয়াছে। এই সম্প্রদায় কৌল নামে অভিহিত এবং ইহার গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথ। কৌল নামটি কুল শব্দ হইতে উৎপন্ন, এবং এই কুল বা শ্রেণীবিভাগ যে সহজিয়া ধর্ম্মের একটি প্রধান অঙ্গ, তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। এই কৌল সম্প্রদায়ের লোকেরা কৌল, কুলপুত্র অথবা কুলীন নামে অভিহিত হইয়াছে এবং ইহাদের শাস্ত্রের নাম কুলাগম অথবা কুলশাস্ত্র। কুলই শক্তি: শিব অকুল; এবং দেহাভ্যন্তরে প্রচ্ছন্ন দেবী শক্তির নাম কুলকুণ্ডলিনী। এই ধর্ম্মের আলোচনা করিলে সন্দেহমাত্র থাকে না যে, ইহার প্রধান তত্ত্বগুলি সহজিয়া মতবাদ হইতে গৃহীত। কিন্তু একটি বিষয়ে ইহার প্রভেদ ছিল। ইহা জাতিভেদ মানিয়া চলিত। এই জন্যই ইহা ব্রাহ্মণ্য শাক্ত সম্প্রদায়ের সহিত মিশিতে পারিয়াছিল এবং হিন্দুসমাজে ইহার প্রাধান্য সহজে নষ্ট হয় নাই। যাহারা বর্ণাশ্রম মানিত না, তাহারাই ক্রমে নাথপন্থী, সহজিয়া, অবধূত, বাউল প্রভৃতি বৰ্ত্তমানকালে সুপরিচিত সম্প্রদায়গুলি সৃষ্টি করিয়াছে। এই সকল সম্প্রদায়ের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানা যায় না। তবে ইহারা সকলেই কালক্রমে-হিন্দু যুগের অবসানের পরে-বাংলার ধৰ্ম্মজগতে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিয়াছিল। নাথপন্থীদের গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথ ও তাঁহার শিষ্য গোরক্ষনাথের কথা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। ময়নামতীর গান হইতে বুঝা যায় যে এককালে বাংলা দেশে ইহাদের প্রভাব খুব বেশি ছিল। সহজিয়া সম্প্রদায় ও মহাপ্রভু চৈতন্যের পূর্ব্বেই প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল। বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাস একজন সহজিয়া ছিলেন। পরবর্ত্তীকালে সহজিয়া সম্প্রদায় বৈষ্ণব ভাবাপন্ন হইয়া, পরম সত্যকে কৃষ্ণ ও তাঁহার শক্তিকে রাধারূপে কল্পনা করে; কিন্তু নাড়ী, চক্র প্রভৃতি প্রাচীন বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্ম্মের যোগসাধন-প্রণালী একেবারে পরিত্যাগ করে নাই। চণ্ডীদাসের রজকিনী প্রেম প্রাচীন সহজিয়া ধর্ম্মের পঞ্চকুলের অন্যতম রজকীর কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। বাউল সম্প্রদায় বৈষ্ণব প্রভাব হইতে মুক্ত থাকিয়া প্রাচীন বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্ম্মের সহিত ঘনিষ্ঠ রক্ষা যোগসূত্র রক্ষা করিতে পারিয়াছে।
