পালযুগে বাংলায় অন্যান্য বৌদ্ধরাজবংশেরও পরিচয় পাওয়া যায়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বিক্রমপুরের চন্দ্ররাজবংশ এবং হরিকেলরাজ কান্তিদেবের উল্লেখ করা যাইতে পারে। সেনরাজগণের অভ্যুদয়ের ফলে বাংলায় শৈব ও বৈষ্ণব ধর্ম্ম এবং প্রাচীন বৈদিক ও পৌরাণিক ধৰ্ম্মানুষ্ঠান ও আচার-ব্যবহার পুনরুজ্জীবিত করিবার এক প্রবল চেষ্টা হয়। ইহাও বাংলায় বৌদ্ধধর্ম্মের পতনের একটি কারণ। কিন্তু তুর্কী আক্রমণের ফলে বৌদ্ধবিহারগুলি ধ্বংস না হইলে সম্ভবত বৌদ্ধধর্ম্ম বাংলা হইতে একেবারে বিলুপ্ত হইত না। বর্ত্তমানে এক চট্টগ্রাম জেলায় কয়েক সহস্র বৌদ্ধ ব্যতীত বাংলা ও বিহারে বৌদ্ধধর্ম্মের চিহ্ন বিলুপ্ত হইয়াছে।
.
৯. সহজিয়া ধৰ্ম্ম
প্রাচীনকাল হইতেই বৌদ্ধধর্ম্মমতের অনেক পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছে। ভারতে বৌদ্ধধর্ম্মের এই বিবর্ত্তনের ইতিহাস এক্ষেত্রে আলোচনা করা সম্ভব নহে। সংক্ষেপে বলা যাইতে পারে যে, হুয়েন সাং সপ্তম শতাব্দীতে ভারতে যে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচলিত দেখিয়াছিলেন, তাহা গৌতম বুদ্ধ, অশোক, এমনকি কনিষ্কের সময়কার বৌদ্ধধর্ম্ম অপেক্ষা অনেক পৃথক। কিন্তু পালযুগে বাংলায় বৌদ্ধধর্ম্ম যে রূপ ধারণ করিয়াছিল, তাঁহার প্রকৃতি ইহা হইতেও সম্পূর্ণ বিভিন্ন। প্রাচীন সর্ব্বাস্তিবাদ, সম্মিতীয় প্রভৃতি বৌদ্ধ মত তখন বিলুপ্ত হইয়াছে। এমনকি, অপেক্ষাকৃত আধুনিক মহাযান মতবাদও বজ্রযান ও তন্ত্রযান প্রভৃতিতে পরিণত হইয়া সম্পূর্ণ নূতন আকার ধারণ করিয়াছে।
ছোটখাটো প্রভেদ থাকিলেও এই নূতন ধর্ম্মমতগুলির মধ্যে যথেষ্ট ঐক্য ছিল এবং মোটের উপর ইহাদিগকে সহজযান বা সহজিয়া ধৰ্ম্ম বলা যাইতে পারে। এই ধৰ্ম্মের আচাৰ্য্যগণ সিদ্ধাচাৰ্য নামে খ্যাত। মোট ৮৪ জন সিদ্ধাচাৰ্য্য ছিলেন বলিয়া প্রসিদ্ধি আছে। দশম হইতে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যেই সম্ভবত এই সমুদয় সিদ্ধাচার্যগণ জন্মগ্রহণ করেন। ইহারা অপভ্রংশ ও দেশীয় ভাষায় গ্রন্থ লিখিতেন। তিব্বতীয় বৌদ্ধ আচাৰ্য্যগণ বাংলা ও বিহারের বৌদ্ধ পণ্ডিতগণের সহায়তায় এই সমুদয় গ্রন্থ তিব্বতীয় ভাষায় তর্জমা করেন এবং সে তর্জমা তিব্বতীয় তেজুর নামক গ্রন্থে আছে। মূল গ্রন্থগুলি কিন্তু প্রায় সবই বিলুপ্ত হইয়াছে। প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত যে চর্য্যাপদগুলির কথা পূর্ব্ববর্ত্তী অধ্যায়ে উল্লিখিত হইয়াছে, তাহা এই সিদ্ধাচার্যগণেরই রচিত। এই চর্যাপদ ও সিদ্ধাচাৰ্য্য সরহ ও কৃষ্ণের দোহাকোষ প্রভৃতি যে কয়েকখানি মূল সহজিয়া গ্রন্থ পাওয়া গিয়াছে, তাহা হইতে এই নূতন ধর্ম্মমত সম্বন্ধে কতকটা ধারণা করা যাইতে পারে।
এই ধর্ম্মে গুরুর স্থান খুব উচ্চ। “ধৰ্ম্মের সূক্ষ্ম উপদেশ গুরুর মুখ হইতে শুনিতে হইবে, পুস্তক পড়িয়া কিছু হইবে না; গুরু বুদ্ধ অপেক্ষাও বড়; গুরু যাহা বলিবেন বিচার না করিয়া তাহা তৎক্ষণাৎ করিতে হইবে”–ইহাই এই ধৰ্ম্ম সম্প্রদায়ের মূলনীতি।
বৈদিক ধর্ম্ম, পৌরাণিক পূজা-পদ্ধতি, জৈন এবং এমনকি বৌদ্ধধর্ম্ম সম্প্রদায়ের প্রতি যেরূপ তীব্র শ্লেষ, কটাক্ষ ও ব্যাঙ্গোক্তি এই সমুদয় গ্রন্থে স্থান পাইয়াছে, তাহা পড়িলে ঊনবিংশ শতাব্দীতে খৃষ্টীয় মিশনারী কর্ত্তৃক হিন্দুধর্ম্মের সমালোচনার কথা স্মরণ হয়। সরহের দোহাকোষ হইতে দুই একটি দৃষ্টান্ত দিতেছি। “হোম করিলে মুক্তি যত হোক না হোক, ধোঁয়ায় চক্ষের পীড়া হয় এই মাত্র।” “ঈশ্বরপরায়ণেরা গায়ে ছাই মাখে, মাথায় জটা ধরে, প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘরে বসিয়া থাকে, ঘরের ঈশান কোণে বসিয়া ঘণ্টা চালে, আসন করিয়া বসে, চক্ষু মিটমিট করে, কানে খুসখুস করে ও লোককে ধাঁধা দেয়।” “ক্ষপণকেরা কপট মায়াজাল বিস্তার করিয়া লোক ঠকাইতেছে; তাহারা তত্ত্ব জানে না, মলিন বেশ ধারণ করিয়া থাকে। এবং আপনার শরীরকে কষ্ট দেয়; নগ্ন হইয়া থাকে এবং আপনার কেশোৎপাটন করে। যদি নগ্ন হইলে মুক্তি হয়, তাহা হইলে শৃগাল কুকুরের মুক্তি আগে হইবে।”
বৌদ্ধ শ্রমণদের সম্বন্ধে উক্তি এইরূপ :
“বড় বড় স্থবির আছেন, কাহারও দশ শিষ্য, কাহারও কোটি শিষ্য, সকলেই গেরুয়া কাপড় পরে, সন্ন্যাসী হয় ও লোক ঠকাইয়া খায়। যাহারা হীনযান (তাহারা যদি শীল রক্ষা করে) তাহাদের না হয় স্বর্গই হউক, মোক্ষ হইতে পারে না। যাহারা মহাযান আশ্রয় করে, তাহাদেরও মোক্ষ হয় না, কারণ তাহারা কেহ কেহ সূত্র ব্যাখ্যা করে, কিন্তু তাহাদের ব্যাখ্যা অদ্ভুত, সে সকল নূতন ব্যাখ্যায় কেবল নরকই হয়।” উপসংহারে বলা হইয়াছে “সহজ পন্থা ভিন্ন পন্থাই নাই। সহজ পন্থা গুরুর মুখে শুনিতে হয়।”
জাতিভেদ সম্বন্ধে সরহ বলেন : “ব্রাহ্মণ ব্রহ্মার মুখ হইতে হইয়াছিল; যখন হইয়াছিল তখন হইয়াছিল, এখন ত অন্যেও যেরূপে হয়, ব্রাহ্মণও সেইরূপে হয়, তবে আর ব্রাহ্মণত্ব রহিল কী করিয়া? যদি বল সংস্কারে ব্রাহ্মণ হয়, চণ্ডালকে সংস্কার দেও, সে ব্রাহ্মণ হোক; যদি বল বেদ পড়িলে ব্রাহ্মণ হয়, তারাও পড়ক। আর তারা পড়েও ত, ব্যাকরণের মধ্যে ত বেদের শব্দ আছে।”
এইরূপে সিদ্ধাচার্যগণ সমুদয় প্রাচীন সংস্কার ও ধর্ম্মমতের তীব্র সমালোচনা করিয়া যে স্বাধীন চিন্তা ও বিচারবুদ্ধির পরিচয় দিয়াছেন, তাহা পড়িলে মনে হয় যে, মধ্যযুগে ও বর্ত্তমানকালে যে সমুদয় প্রাচীন-পন্থা-বিরোধী উদার ধর্ম্মমতবাদ এদেশে প্রচারিত হইয়াছে, তাহা কেবল ইসলাম বা খৃষ্টীয় ধর্ম্ম এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার ফল বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। যে সংস্কার-বিমুক্ত স্বাধীন চিত্ত ও চিন্তাশক্তির উপর এইগুলি প্রতিষ্ঠিত, তাঁহার মূল সহজিয়া-মতবাদে স্পষ্ট দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই সহজিয়ামতই আবার চরম গুরুবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। একদিকে সূক্ষ্ম স্বাধীন চিন্তা, অপরদিকে নির্বিচারে গুরুর প্রতি আস্থা-এই পরস্পরবিরুদ্ধ মনুষ্য-প্রবৃদ্ধির উপর কিরূপে সহজিয়া ধর্ম্মের ভিত্তি স্থাপিত হইয়াছিল, তাহা ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়। কিন্তু পরবর্ত্তীকালের বাংলার ধর্ম্ম ও সমাজের ইতিহাসে এরূপ বিরুদ্ধ মনোবৃত্তির একত্র সমাবেশ বিরল নহে।
