“পুণ্ড্রবর্দ্ধনে (উত্তরবঙ্গ) ২০টি বিহারে তিন শতেরও অধিক হীনযান ও মহাযান সম্প্রদায়ের বৌদ্ধ ভিক্ষু বাস করেন। অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রায় একশত দেবমন্দির আছে। উলঙ্গ নিগ্রন্থপন্থীদের (জৈন) সংখ্যা খুব বেশী। রাজধানীর তিন-চারি মাইল পশ্চিমে পো-চি-পো সংঘারাম। ইহার অঙ্গনগুলি যেমন প্রশস্ত, কক্ষ ও শিখরগুলিও তেমনি উচ্চ। ইহার ভিক্ষুসংখ্যা ৭০০। সকলেই মহাযান মতাবলম্বী। পূর্ব্ব ভারতের বহু প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ আচার্য্য এখানে বাস করেন। সমতট (পূর্ব্ববঙ্গ) প্রদেশের রাজধানীতে প্রায় ৩০টি বৌদ্ধবিহারে ২০০০ ভিক্ষু থাকেন। অন্যান্য ধর্ম্ম-সম্প্রদায়ের মন্দিরের সংখ্যা একশত। জৈনগণ সংখ্যায় খুব বেশী। তাম্রলিপ্তে দশটি বিহারে সহস্র বৌদ্ধ ভিক্ষু বাস করেন। অন্যান্য সম্প্রদায়ের মন্দিরসংখ্যা পঞ্চাশ। কর্ণসুবর্ণে দশটি বৌদ্ধবিহারে হীনযান মতাবলম্বী দুই সহস্র ভিক্ষু বাস করেন। অন্যান্য ধর্ম্মাবলম্বীর সংখ্যা খুব বেশী-তাহাদের দেবমন্দিরের সংখ্যা পঞ্চাশ। রাজধানীর নিকটে লো-টো-বি-চি বিহার। ইহার কক্ষগুলি প্রশস্ত ও উচ্চ। বহুতালায় নির্ম্মিত বিহারটিও খুব উচ্চ। রাজ্যের সমুদয় সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তিগণ এখানে সমবেত হন।”
এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনা হইতে বেশ বুঝা যায় যে, তখন বাংলায় বৈষ্ণব, শৈব, বৌদ্ধ ও জৈন প্রভৃতি বিবিধ ধৰ্ম্ম-সম্প্রদায়ের বহুসংখ্যক মন্দির ও বিহার বর্ত্তমান ছিল। জৈন ভিক্ষুগণ সংখ্যায় বৌদ্ধ ভিক্ষু অপেক্ষা বেশী ছিলেন বলিয়াই মনে হয়। বৌদ্ধগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ না হইলেও বাংলায় বৌদ্ধধর্ম্মের বেশ প্রভাব ছিল। ইৎসিং তাম্রলিপ্তির বৌদ্ধবিহারের যে বিস্তৃত বিবরণ দিয়াছেন, তাহাতে জানা যায় যে, তথাকার ভিক্ষুগণের জীবন বৌদ্ধধর্ম্মের উচ্চ আদর্শ ও বিধিবিধানের সম্পূর্ণ অনুবর্ত্তী ছিল। শেংচি নামে ইৎসিংয়ের সমসাময়িক আর একজন চীনদেশীয় বৌদ্ধ পরিব্রাজক লিখিয়াছেন যে, সমতটের রাজধানীতে চারি সহস্রের বেশী বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী ছিলেন এবং ঐ দেশের রাজা রাজভট প্রতিদিন বুদ্ধের লক্ষ মৃন্ময়মূৰ্ত্তি নিৰ্মাণ করিতেন এবং মহাপ্রজ্ঞাপারমিতার লক্ষ শ্লোক পাঠ করিতেন। রাজভট সম্ভবত খড়গবংশীয় রাজা ছিলেন। এই সমুদয় বর্ণনা হইতে বেশ বোঝা যায় যে, সপ্তম শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্ম্ম বাংলায় খুব শক্তিশালী ছিল এবং বাংলার বৌদ্ধগণ জ্ঞান, ধর্ম্মনিষ্ঠা ও আচার-ব্যবহারে সমগ্র বৌদ্ধজগতের শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র হইয়াছিলেন।
সপ্তম শতাব্দীতে একজন বাঙ্গালী বৌদ্ধজগতে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। ইহার নাম শীলভদ্র-সমতটের রাজবংশে হঁহার জন্ম হয়। ইনি জগদ্বিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আচার্য্য ও সর্বাধ্যক্ষের পদ অলঙ্কত করিয়া বাঙ্গালীর মুখ উজ্জ্বল করিয়া গিয়াছেন। ইহার জীবনী একবিংশ পরিচ্ছেদে আলোচিত হইবে।
অষ্টম শতাব্দীতে বৌদ্ধ পালরাজগণের অভ্যুদয়ে বাংলায় বৌদ্ধধর্ম্মের প্রভাব খুব বৃদ্ধি পাইয়াছিল। এই সময় হইতে ভারতের অন্যান্য প্রদেশে বৌদ্ধধর্ম্ম ক্রমশ ক্ষীণবল হইয়া আসিতেছিল এবং দুই-এক শত বৎসরের মধ্যেই তাঁহার প্রভাব প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হইয়াছিল। কিন্তু পালরাজগণের সুদীর্ঘ চারিশত বৎসর রাজত্বকালে বাংলা ও বিহারে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রবল ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ তুর্কী আক্রমণের ফলে যখন প্রথমে মগধের ও পরে উত্তর বাংলার বৌদ্ধবিহার ও মন্দিরগুলি ধ্বংস হয়, তখনই বৌদ্ধ সংঘ ভারতের পূর্ব্ব-প্রান্তস্থিত এই সর্ব্বশেষ আশ্রয়স্থান হইতে বিতাড়িত হইয়া আত্মরক্ষার জন্য নেপাল ও তিব্বতে গমন করে। বৌদ্ধ সংঘই ছিল বৌদ্ধধর্ম্মের প্রধান কেন্দ্র। কাজেই বৌদ্ধ সংঘের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধধর্ম্মও ভারতবর্ষ হইতে বিলুপ্ত হয়।
অষ্টম হইতে দ্বাদশ শতাব্দের মধ্যে বাংলায় ও বিহারে বৌদ্ধধর্ম্মের অনেক গুরুতর পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছিল। এই চারিশত বৎসরে ইহা উত্তরে তিব্বত ও দক্ষিণে যবদ্বীপ, সুমাত্রা, মালয় প্রভৃতি অঞ্চলে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল! বাংলার পালরাজগণ ভারতে বৌদ্ধধর্ম্মের শেষ রক্ষক হিসেবে সমগ্র বৌদ্ধজগতে শ্রেষ্ঠ সম্মানের আসন পাইয়াছিলেন। ইহার ফলে বাংলায় ও বিহারে বৌদ্ধধর্ম্মের যে পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছিল, তাহা এই সমুদয় দেশেও ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। বাংলা ও বিহারের প্রসিদ্ধ আচাৰ্য্যগণ এই সমুদয় দেশে গিয়া এই নতুন ধর্ম্মের ভিত্তি দৃঢ় করিয়াছিলেন।
পাল সম্রাটগণ বহু বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। ইহার মধ্যে ধর্ম্মপাল প্রতিষ্ঠিত বিক্রমশীল মহাবিহারই সমধিক প্রসিদ্ধ। ভাগীরথী তীরে এক গিরিশীর্ষে এই মহাবিহারটি অবস্থিত ছিল। বর্ত্তমান পাথরঘাটায় (ভাগলপুর জিলা) কেহ কেহ ইহার অবস্থিতি নির্দেশ করিয়াছেন, কিন্তু এ সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। ধর্ম্মপাল প্রতিষ্ঠিত এই মহাবিহার এবং সোমপুর ও ওদন্তপুরী বিহারের কথা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে, সুতরাং এ স্থলে ইহাদের বর্ণনা অনাবশ্যক।
সোমপুর ব্যতীত বাংলায় আরও কয়েকটি প্রসিদ্ধ বিহার ছিল। যে ত্রৈকূটক বিহারে আচাৰ্য্য হরিদ্র অভিসময়ালঙ্কার গ্রন্থের প্রসিদ্ধ টীকা প্রণয়ন করেন, তাহা সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত ছিল। বরেন্দ্রের দেবীকোট ও জগদ্দল, চট্টগ্রামের পণ্ডিতবিহার, এবং বিক্রমপুর ও পট্টিকেরা (কুমিল্লার নিকটবর্ত্তী) প্রভৃতি বৌদ্ধবিহারে যে সমুদয় বৌদ্ধ আচার্য্য ছিলেন, তাঁহাদের অনেকে তিব্বতীয় বৌদ্ধ সাহিত্যে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন।
