.
৬. অন্যান্য পৌরাণিক ধৰ্ম্ম-সম্প্রদায়
বিষ্ণু, শিব ও শক্তি ব্যতীত অন্যান্য পৌরাণিক দেব-দেবীর পূজাও বাংলায় প্রচলিত ছিল। কিন্তু এইসব সম্প্রদায় সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানা যায় না। রাজতরঙ্গিণীতে উক্ত হইয়াছে যে, পুণ্ড্রবর্দ্ধনে কার্তিকের এক মন্দির ছিল। কেশবসেন ও বিশ্বরূপসেন তাঁহাদের তাম্রশাসনে পরমসৌর বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন। সুতরাং সূৰ্য্য-দেবতার উপাসক সৌর সম্প্রদায় বাংলায় প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিল এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। এই সূৰ্য্য বৈদিক সূৰ্য্য দেবতা নহেন। সম্ভবত মগ ব্রাহ্মণগণ কুশাণযুগে শকদ্বীপ হইতে এই সূৰ্য্যপূজার প্রচলন করেন।
কিন্তু সমসাময়িক লিপি বা সাহিত্যে অন্য সম্প্রদায়ের উল্লেখ না থাকিলেও বাংলায় কার্তিক ও সূৰ্য্য ব্যতীত অন্যান্য দেব-দেবীর বহুসংখ্যক মূৰ্ত্তি আবিষ্কৃত হইয়াছে। সুতরাং ইহাদের পূজাও যে এদেশে প্রচলিত ছিল, তাহা সহজেই বুঝা যায়।
.
৭. জৈনধর্ম্ম
প্রাচীন জৈনধর্ম্মগ্রন্থে লিখিত আছে যে, বর্দ্ধমান মহাবীর রাঢ় প্রদেশে আসিয়াছিলেন, কিন্তু সেখানকার লোকেরা তাঁহার সহিত অত্যন্ত অসদ্ব্যবহার করিয়াছিল। কোন সময়ে জৈনধৰ্ম্ম বাংলায় প্রথম প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তাহা সঠিক বলা যায় না। দিব্যাবদানে আশোকের সম্বন্ধে একটি গল্প আছে। পুণ্ড্রবর্দ্ধন নগরীর জৈনগণ মহাবীরের চরণতলে পতিত বুদ্ধদেবের চিত্র অঙ্কিত করিয়াছে শুনিয়া তিনি নাকি পাটলিপুত্রের সমস্ত জৈনগণকে হত্যা করিয়াছিলেন। এই গল্পটির মূলে কতটা সত্য আছে বলা কঠিন-সুতরাং আশোকের সময়ে উত্তরবঙ্গে জৈন-সম্প্রদায় বর্ত্তমান ছিল এরূপ সিদ্ধান্ত করা সঙ্গত নহে।
কিন্তু অশোকের সময় না থাকিলেও খৃষ্টপূৰ্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে যে বঙ্গে জৈনধৰ্ম্ম দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, তাঁহার প্রমাণ আছে। প্রাচীন জৈনগ্রন্থ কল্পসূত্র মতে মৌৰ্য্যম্রাট চন্দ্রগুপ্তের সমসাময়িক জৈন আচাৰ্য্য দ্রবাহুল্য শিষ্য গোদাস যে গোদাসগণ প্রতিষ্ঠিত করেন, কালক্রমে তাহা চারি শাখায় বিভক্ত হয়। ইহার তিনটির নাম তাম্রলিপ্তিক, কোটীবর্ষীয় এবং পুণ্ড্রবর্দ্ধনীয়। এই তিনটি যে বাংলার তিনটি সুপরিচিত নগরীর নাম হইতে উদ্ভূত তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। কল্পসূত্রোক্ত এই শাখাগুলি কাল্পনিক নহে, সত্য-সত্যই ছিল, কারণ খৃষ্টপূর্ব্ব প্রথম শতাব্দীতে উত্তীর্ণ শিলালিপিতে তাহাদের উল্লেখ আছে। সুতরাং উত্তরবঙ্গ (পুণ্ড্রবর্দ্ধন, কোটীবর্ষ) ও দক্ষিণবঙ্গে (তাম্রলিপ্তি) যে খুব প্রাচীনকাল হইতেই জৈন সম্প্রদায় প্রসার লাভ করিয়াছিল তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।
পাহাড়পুরে প্রাপ্ত একখানি তাম্রশাসন হইতে জানা যায় যে, খৃষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে বা তাঁহার পূর্ব্বে ঐ স্থানে একটি জৈনবিহার ছিল। চীনদেশীয় পরিব্রাজক হুয়েন সাং লিখিয়াছেন যে, তাঁহার সময়ে বাংলায় দিগম্বর জৈনের সংখ্যা খুব বেশি ছিল। কিন্তু তাঁহার পরই বাংলায় জৈনধৰ্ম্মের প্রভাব হ্রাস হয়। পাল ও সেনরাজগণের তাম্রশাসনে এই সম্প্রদায়ের কোনো উল্লেখ নাই। তবে ইহা যে একেবারে লুপ্ত হয় নাই, প্রাচীন জৈনমূৰ্ত্তি হইতেই তাহা প্রমাণিত হয়।
.
৮. বৌদ্ধধর্ম্ম
সম্রাট অশোকের সময় বৌদ্ধধর্ম্ম বাংলায় প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল। ইহার পূর্ব্বেও সম্ভবত এদেশে বৌদ্ধধর্ম্মের প্রচার হইয়াছিল, তবে এ সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু জানা যায় না। খৃষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে উত্তীর্ণ একখানি শিলালিপি হইতে জানা যায় যে, বঙ্গদেশে বৌদ্ধধর্ম্মের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল।
পঞ্চম শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্ম্ম বাংলায় বিশেষ প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। ফাহিয়ান লিখিয়াছেন যে, তখন তাম্রলিপ্তি নগরীতে ২২টি বৌদ্ধবিহার ছিল। তিনি তথায় দুই বৎসর থাকিয়া বৌদ্ধ গ্রন্থ লিখিয়াছিলেন এবং বুদ্ধমূর্ত্তির ছবি আঁকিয়াছিলেন। তাঁহার বিস্তৃত বর্ণনায় তাম্রলিপ্তির বিশাল বৌদ্ধ সংঘের একটি উজ্জ্বল চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছিল।
৫০৬-৭ অব্দে উত্তীর্ণ একখানি শিলালিপি হইতে জানা যায় যে, কুমিল্লা অঞ্চলে তখন বহু বৌদ্ধবিহার ছিল। তাঁহার মধ্যে একটির নাম রাজবিহার; সম্ভবত কোনো রাজা কর্ত্তৃক ইহা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। সুতরাং পঞ্চম শতাব্দীতে বাংলার সর্বত্রই যে বৌদ্ধধর্ম্মের খুব প্রতিপত্তি ছিল, এরূপ সিদ্ধান্ত করা যাইতে পারে।
সপ্তম শতাব্দীতে বাংলায় যে বৌদ্ধধর্ম্ম বেশ প্রভাবশালী ছিল, বহু চীনদেশীয় পরিব্রাজকের উক্তি হইতে তাহা জানা যায়। ইঁহাদের মধ্যে হুয়েন সাংয়ের বিবরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করিয়া স্বচক্ষে দেখিয়া যাহা লিখিয়াছেন, তাঁহার সারমর্ম নিম্নে দিতেছি।
“কজঙ্গল (রাজমহলের নিকটবর্ত্তী) প্রদেশে ছয়-সাতটি বিহারে তিন শতেরও অধিক ভিক্ষু বাস করেন। অন্যান্য ধর্ম্ম-সম্প্রদায়ের দশটি মন্দির আছে। এই প্রদেশের উত্তর ভাগে গঙ্গাতীরের নিকট বিশাল উচ্চ দেবালয় আছে। ইহা প্রস্তর ও ইষ্টকে নির্ম্মিত এবং ইহার ভিত্তি-গাত্রে ক্ষোদিত ভাস্কৰ্য্য উচ্চ শিল্পকলার নিদর্শন। চতুর্দিকের দেয়ালে বিভিন্ন প্রকোষ্ঠে বুদ্ধ, অন্যান্য দেবতা ও সাধু পুরুষদের মূর্ত্তি উৎকীর্ণ।”
