.
৪. বৈষ্ণব ধর্ম্ম
বাঁকুড়া নগরীর ১২ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সুসুনিয়া নামক পৰ্ব্বতের গুহায় উৎকীর্ণ রাজা চন্দ্রবর্ম্মার একখানি লিপিতে বাংলায় সর্বপ্রথমে বিষ্ণুপূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই গুহাগাত্রে একটি চক্র খোদিত আছে। সুতারং অনুমিত হয় যে ইহা একটি বিষ্ণুর মন্দির ছিল। রাজা চন্দ্রবর্ম্মা চতুর্থ শতাব্দীতে উত্তরবঙ্গে, এবং এমনকি সুদূর হিমালয় শিখরে গোবিন্দস্বামী, শ্বেতবরাহস্বামী, কোকামুখস্বামী প্রভৃতির মন্দির প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। সম্ভবত এ সমুদয়ই বিষ্ণুমূর্ত্তি। সপ্তম শতাব্দীতে উৎকীর্ণ লিপিতে বাংলার পূর্ব্বপ্রান্তে হিংস্রপশুসমাকুল গভীর অরণ্য প্রদেশও ভগবান অনন্তনারায়ণের মন্দির ও পূজার উল্লেখ আছে। সুতরাং ইহার বহু পূর্ব্বেই যে বৈষ্ণব ধর্ম্ম বাংলার সর্বত্র বিস্তৃত হইয়াছিল তাহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে।
বাংলার বৈষ্ণব ধৰ্ম্মে কৃষ্ণলীলার বিশেষ প্রাধান্য ছিল। পাহাড়পুর মন্দিরগাত্রে কৃষ্ণের বাল্যলীলার অনেক কাহিনী উত্তীর্ণ আছে। সদ্যপ্রসূত কৃষ্ণকে লইয়া বসুদেবের গোকুলে গমন, গোপগোপীগণের সহিত ক্রীড়া, গোবর্দ্ধনধারণ, যমলাৰ্জ্জুন সংহার, কেশীবধ, চানুর ও মুষ্টিকের সহিত যুদ্ধ প্রভৃতি কাহিনী যে ষষ্ঠ শতাব্দী বা তাঁহার পূর্ব্বেই এদেশে প্রচলিত ছিল পাহাড়পুরের প্রস্তরশিল্প হইতেই তাহা প্রমাণিত হয়। একখানি প্রস্তরে কৃষ্ণ ও একটি স্ত্রীমূর্ত্তি খোদিত আছে। কেহ কেহ অনুমান করেন যে ইহা রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্ত্তি। পরবর্ত্তীকালে রাধা বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে প্রাধান্য লাভ করিলেও হালের সপ্তশতী ব্যতীত প্রাচীন কোনো গ্রন্থে রাধার উল্লেখ নাই। পাহাড়পুরে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূৰ্ত্তি থাকিলে বাংলায় ইহাই রাধার আখ্যানের সর্বপ্রাচীন নিদর্শন। কিন্তু খুব সম্ভবত পাহাড়পুরের উক্ত স্ত্রীমূর্ত্তি রুক্সিণী অথবা সত্যভামা। সুতরাং সপ্তম শতাব্দীতে কৃষ্ণলীলা বাংলায় খুব জনপ্রিয় হইলেও ঐ সময়ে রাধা-কৃষ্ণের কাহিনী প্রচলিত ছিল কি না তাহা নিঃসংশয়ে বলা যায় না।
অষ্টম হইতে দ্বাদশ শতাব্দী পর্য্যন্ত যে বৈষ্ণব ধর্ম্ম বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল ঐযুগের বহুসংখ্যক বিষ্ণুমূৰ্ত্তি হইতেই তাহা প্রমাণিত হয়। রাজা লক্ষ্মণসেন পরম বৈষ্ণব ছিলেন এবং তাঁহার সময় হইতে রাজকীয় শাসনের প্রারম্ভে শিবের পরিবর্তে বিষ্ণুর স্তবের প্রচলন হয়। তাঁহার সভাকবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ যে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে বিশেষ সম্মানীত ও আদৃত তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। গীতগোবিন্দে যে বিষ্ণুর দশ অবতারের বর্ণনা আছে কালে তাহাই সমগ্র ভারতে গৃহীত হইয়াছে। ইহার পূৰ্ব্বে অবতার সম্বন্ধে কোনো নির্দিষ্ট বা সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। ভাগবত পুরাণে অবতারের যে তিনটি তালিকা আছে তাহাতে অবতারের সংখ্যা যথাক্রমে ২২, ২৩ ও ১৬। হরিবংশে দশ অবতারের উল্লেখ থাকিলেও তাঁহার সহিত জয়দেবের কথিত এবং বর্ত্তমানে প্রচলিত দশ অবতারের অনেক প্রভেদ। মহাভারত ও বায়ুপুরাণে এই দশ অবতারের তালিকা আছে-কিন্তু তাঁহার পাশেই বিভিন্ন তালিকাও দেওয়া হইয়াছে। জয়দেব বর্ণিত যে অবতারবাদ ক্রমে ভারতের সর্বত্র প্রামাণিক বলিয়া গৃহীত হইয়াছে তাহা ভারতে বাংলার বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের একটি প্রধান দান বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। জয়দেব বর্ণিত রাধাকৃষ্ণ লীলাও সম্ভবত বাংলায়ই প্রথমে প্রচলিত হয় ও পরে সমগ্র ভারতে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
.
৫. শৈবধর্ম্ম
বৈষ্ণব ধর্ম্মের ন্যায় শৈবধৰ্ম্মও গুপ্তযুগে এদেশে প্রচলিত ছিল। পঞ্চম শতাব্দের লিপিতে হিমালয় গিরিশিখরে পূর্ব্বোক্ত শ্বেতবরাহস্বামী ও কোকামুখ স্বামীর মন্দির পার্শ্বে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠার উল্লেখ পাওয়া যায়। ষষ্ঠ শতাব্দীতে মহারাজ বৈন্যগুপ্ত ও সপ্তম শতাব্দীতে মহারাজাধিরাজ শশাঙ্ক ও ভাস্করবর্ম্মা শৈবধর্ম্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। পাহাড়পুরের মন্দিরগাত্রে শিবের কয়েকটি মূর্ত্তি উত্তীর্ণ দেখিতে পাওয়া যায়।
আর্য্যাবর্তে পাশুপত মতাবলম্বীরাই সর্বপ্রাচীন শৈব-সম্প্রদায়। সম্রাট নারায়ণপালের একখানি তাম্রশাসন হইতে জানা যায় যে, তিনি নিজে একটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়া তথাকার পাশুপতাচাৰ্য্য-পরিষদের ব্যবহারের জন্য একটি গ্রাম দান করিয়াছিলেন। ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে, বাংলায় পাশুপত-সম্প্রদায় খুব প্রবল ছিল। সদাশিব সেনরাজগণের ইষ্টদেবতা ছিলেন এবং রাজকীয় মুদ্রায় তাঁহার মূর্ত্তি উত্তীর্ণ দেখিতে পাওয়া যায়। বিজয়সেন ও বল্লালসেন শৈব ছিলেন। লক্ষ্মণসেন ও তাঁহার বংশধরগণ বৈষ্ণব হইলেও কুলদেবতা সদাশিবকে পরিত্যাগ করেন নাই।
খুব প্রাচীনকাল হইতেই বাংলায় শক্তিপূজার প্রচলন হইয়াছিল। দেবীপুরাণে উক্ত হইয়াছে যে, রাঢ় ও বরেন্দ্রে বামাচারী শাক্ত সম্প্রদায় বিভিন্নরূপে দেবীর উপাসনা করিতেন। দেবীপুরাণ সম্ভবত সপ্তম শতাব্দের শেষে অথবা অষ্টম শতাব্দের প্রারম্ভে রচিত হইয়াছিল। বাংলার বহু তান্ত্রিক গ্রন্থে শাক্ত মত প্রচারিত হইয়াছে। কিন্তু এই শ্রেণীর কোনো গ্রন্থ দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্ব্বে রচিত হইয়াছিল কি না বলা কঠিন। তবে তন্ত্রোক্ত শাক্তমত যে হিন্দু যুগ শেষ হইবার পূর্ব্বেই বাংলায় প্রসার লাভ করিয়াছিল ইহাই সম্ভব বলিয়া মনে হয়। পাহাড়পুরের মন্দিরগাত্রে একটি মনুষ্যমূর্ত্তি বাম হস্তে মস্তকের শিখা ধরিয়া দক্ষিণ হস্তে তরবারির দ্বারা নিজের গ্রীবাদেশ কাটিতে উদ্যত এরূপ একটি দৃশ্য উত্তীর্ণ আছে। কেহ কেহ অনুমান করেন যে, ইহা দেবীর নিকট শাক্তভক্তের শিরশ্চেদের দৃশ্য। সুতরাং ইহা সপ্তম বা অষ্টম শতাব্দীতে শাক্ত-সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের প্রমাণস্বরূপ গ্রহণ করা যাইতে পারে।
