.
২. বৈদিক ধর্ম্ম
গুপ্তযুগের তাম্রশাসনগুলি হইতে স্পষ্টই প্রমাণিত হয় যে বৈদিক যাগযজ্ঞাদি ক্রিয়া বাংলায় বহুল পরিমাণে অনুষ্ঠিত হইত। এই সমুদয় তাম্রশাসনে অগ্নিহোত্র ও পঞ্চ মহাযজ্ঞ প্রভৃতি অনুষ্ঠান এবং মন্দির নির্মাণ ও দেব-দেবীর পূজার ব্যয় নির্বাহের জন্য ব্রাহ্মণদিগকে ভূমিদানের উল্লেখ আছে। এই সমুদয় ব্রাহ্মণদিগের পরিচয় প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে যে তাঁহারা ঋক, যজু অথবা সামবেদ অধ্যয়ন করিতেন। ভূমিদান করিয়া ব্রাহ্মণ প্রতিষ্ঠা করা বিশেষ পুণ্যের কাৰ্য্য বলিয়া বিবেচিত হইত এবং একখানি তাম্রশাসনে বাংলার পূর্ব্ব সীমান্তে ব্যাঘ্রাদি হিংস্র জন্তুসমাকুল নিবিড় অরণ্য প্রদেশেও মন্দির নির্মাণ এবং বহুসংখ্যক বেদজ্ঞ প্রতিষ্ঠার উল্লেখ আছে। উত্তরে হিমালয় শিখরেও মন্দির নির্ম্মিত হইত। সুতরাং সমস্ত বাংলা দেশেই যে গুপ্তযুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মের, বিশেষত বৈদিক অনুষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল যে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। কামরূপরাজ ভাস্করবর্ম্মার নিধানপুরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে শ্রীহট্ট অঞ্চলে খৃষ্টীয় ষষ্ট শতাব্দীতে ভূমিদানপূর্ব্বক ২০০৫ জন ব্রাহ্মণের প্রতিষ্ঠার কথা লিখিত আছে। এই ব্রাহ্মণগণের বিভিন্ন বৈদিক শাখা ও গোত্রের নামও উল্লিখিত হইয়াছে। রাতবংশীয় রাজগণের সময়েও কুমিল্লা অঞ্চলে বহু ব্রাহ্মণকে ভূমিদান করা হইয়াছিল।
পালরাজগণের তাম্রশাসনেও বেদ, বেদাঙ্গ, মীমাংসা প্রভৃতিতে ব্যুৎপন্ন এবং বৈদিক যজ্ঞাদি অনুষ্ঠানে অভিজ্ঞ ব্রাহ্মণ বংশের বহু উল্লেখ পাওয়া যায়। বৰ্ম ও সেনরাজগণের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈদিক ধর্ম্ম বাংলায় আরও প্রসার লাভ করে। ভট্টভবদেবের প্রশস্তিতে বেদবিদ, সাবর্ণ গোত্র ব্রাহ্মণ-অধ্যুষিত শত গ্রামের উল্লেখ আছে। বৰ্ম্মরাজগণ বৈদিক ধর্ম্মের রক্ষক বলিয়া তাম্রশাসনে অভিহিত হইয়াছেন। ব্রহ্মবাদী সামন্তসেন শেষ বয়সে যজ্ঞধূমে পরিপূর্ণ গঙ্গাতীরস্থিত পবিত্র ঋষির আশ্রমে বাস করিতেন। সমসাময়িক লিপির এই সমুদয় উক্তি হইতে প্রমাণিত হয় যে গুপ্তযুগ হইতে হিন্দু যুগের শেষ পর্য্যন্ত বাংলায় বৈদিক যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান হইত। সেনযুগে রচিত কয়েকখানি গ্রন্থও এই অনুমানের সমর্থন করে।
তাম্রশাসন হইতে জানা যায় যে, মধ্যদেশ হইতে আসিয়া কোনো কোনো বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ বাংলা দেশে বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন। ইহা হইতে এরূপ মনে করিবার কারণ নাই যে বাংলা দেশে বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের অভাব ছিল। কারণ বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ ভারতবর্ষের এক প্রদেশ হইতে অন্য প্রদেশে যাইয়া বাস স্থাপন করিয়াছেন, এরূপ বহু দৃষ্টান্ত তাম্রশাসন হইতে জানা যায়। বাংলা দেশ হইতে বহু বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের দেশান্তরে গমনের কথা তাম্রশাসনে পাওয়া যায়। এদেশে একটি জনশ্রুতি বিশেষভাবে প্রচলিত আছে যে বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের অভাব হওয়ায় রাজা আদিশূর কান্যকুব্জ হইতে যে পাঁচজন ব্রাহ্মণ আনয়ন করেন, বাংলার রাঢ়ীয় ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণগণ, অর্থাৎ বৈদিক প্রভৃতি কয়েকটি ক্ষুদ্র সম্প্রদায় ব্যতীত প্রায় সকল ব্রাহ্মণই, তাঁহাদের বংশসম্ভূত। পূৰ্ব্বে যাহা বলা হইয়াছে তাহা এই মতের সম্পূর্ণ বিরোধী, এবং বাংলায় যে গুপ্তযুগের পরবর্ত্তী কোনোকালে বৈদিক অনুষ্ঠানে অভিজ্ঞ ব্রাহ্মণের একেবারে অভাব ছিল, এরূপ মনে করিবার কারণ নাই। তবে হয়তো ভারতবর্ষের অন্য কোনো কোনো প্রদেশের তুলনায় বাংলায় বৈদিক চর্চ্চা খুবই কম হইত। পালযুগে বহুশতাব্দী পর্য্যন্ত বৌদ্ধধর্ম্মের প্রভাবের কথা স্মরণ করিলে ইহাই খুব সম্ভব বলিয়া মনে হয়।
কুলশাস্ত্রমতে যে রাঢ়ীয় ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণগণ বৈদিক অনুষ্ঠানের জন্য এদেশে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন, পণ্ডিতপ্রবর হলায়ূধ স্পষ্টত তাঁহাদেরই বৈদিক জ্ঞানের অভাবের উল্লেখ করিয়াছেন। হলায়ুধের উক্তি হইতে প্রমাণিত হয় যে (সম্ভবত অন্য প্রদেশের তুলনায়) তাঁহার কালে বাংলায় বৈদিক জ্ঞানের খুব প্রসার ছিল না, এবং কোনো কোনো শ্রেণীর ব্রাহ্মণের এ বিষয়ে যথেষ্ট শৈথিল্য ছিল। কিন্তু তাঁহার সময়েও যে বাংলায় বেদের পঠনপাঠন ও বৈদিক অনুষ্ঠান বিশেষভাবেই প্রচলিত ছিল তাঁহার নিজের জীবনী এবং অন্যান্য গ্রন্থ হইতে তাহা স্পষ্ট প্রমাণিত হয়।
.
৩. পৌরাণিক ধৰ্ম্ম
ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ন্যায় গুপ্তযুগে বাংলায় পৌরাণিক ধৰ্ম্মের যথেষ্ট প্রসার ছিল। বাংলায় যে সমুদয় তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে তাহাতে অনেক পৌরাণিক দেব-দেবী ও তাঁহাদের বহু আখ্যান পাওয়া যায়। দেবরাজ ইন্দ্র অথবা পুরন্দর, এবং দৈত্যরাজ বলির হস্তে তাঁহার পরাজয়; বিষ্ণু (হরি, মুরারি), লক্ষ্মী এবং তাঁহাদের বাহন গরুড়; বিষ্ণুর নাভিকমল হইতে ব্রহ্মার উৎপত্তি, সত্যযুগে বলি এবং দ্বাপরে কর্ণের দানশীলতা; অগস্ত্য কর্ত্তৃক সমুদ্রপান; পরশুরাম কর্ত্তৃক ক্ষত্রিয়কুল সংহার; রামচন্দ্রের বীরত্ব; পৃথু, সগর, নল, ধনঞ্জয়, যযাতি ও অম্বরীষ প্রভৃতির কাহিনী,-এই সমুদয় তাম্রশাসনে পুনঃপুন উল্লিখিত হইয়াছে।
বাংলায় যে বৈষ্ণব ও শৈবধর্ম্মের বিশেষ প্রসার ছিল তাহাও এই সমুদয় তাম্রশাসন হইতে জানা যায়। ভাগবত সম্প্রদায়ের উপাস্য দেবতা বিষ্ণু কৃষ্ণে রূপান্তরিত হইয়াছেন। কৃষ্ণের জন্ম ও বাল্যলীলা, বিশেষত গোপীদিগের সহিত ক্রীড়া প্রভৃতির অনেক প্রসঙ্গ আছে-এবং তিনি যে বিষ্ণুর অবতার তাঁহারও উল্লেখ আছে। বিষ্ণুর অন্যান্য অবতারগণেরও নাম ও কীর্তি বর্ণিত হইয়াছে। শিবের ভিন্ন ভিন্ন নাম (যথা সদাশিব, অর্দ্ধনারীশ্বর, ধুর্জটি ও মহেশ্বর); তাঁহার শক্তি সর্বাণী, উমা অথবা সতী; দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগ; কার্ত্তিক গণেশ নামে তাঁহার দুই পুত্র প্রভৃতিরও উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। এই সমুদয় দেব-দেবীর মূর্ত্তির সংখ্যা ও গঠনপ্রণালীর বিভিন্নতা হইতে সহজেই অনুমান করা যায় যে, বাংলায় ইহাদের পূজা বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল এবং উপাসকগণ বহুসংখ্যক বিশিষ্ট সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিলেন।
