.
৫. বাংলা লিপি
অনেকের বিশ্বাস যে প্রাচীনকালেও সংস্কৃত ভাষা নাগরী অক্ষরেই লিখিত হইত, এবং বাংলা ভাষার ন্যায় বাংলায় প্রচলিত অক্ষরগুলিও অপেক্ষাকৃত আধুনিক। কিন্তু এই দুইটি মতই ভ্রান্ত। সর্বত্রই সংস্কৃত, প্রাকৃত ও দেশীয় ভাষা সবই একরকম অক্ষরে লিখিত হইত, এবং দেশ ও কাল অনুসারে তাঁহার ভিন্ন ভিন্ন রূপ ছিল। কেবলমাত্র সংস্কৃত লেখার জন্য কোনো পৃথক অক্ষর ব্যবহৃত হইত না।
মৌৰ্য্যসম্রাট অশোক খৃষ্টপূর্ব্ব তৃতীয় শতাব্দীতে যে ব্রাহ্মী লিপিতে তাঁহার অধিকাংশ শাসনমালা উত্তীর্ণ করান তাহা হইতেই ক্রমে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন বর্ণমালার উদ্ভব হইয়াছে। সম্রাট অশোকের সময়ে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ব্যতীত আর সৰ্ব্বত্রই এই এক প্রকার লিপিরই প্রচলন ছিল। কালক্রমে ও স্থানীয় লোকের বিভিন্ন রুচি অনুযায়ী বিভিন্ন প্রদেশে ইহার কিছু কিছু পরিবর্ত্তন আরম্ভ হয়। এই সমুদয় পরিবর্ত্তন সত্ত্বেও গুপ্তযুগের পূর্ব্ব পর্য্যন্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যে সমুদয় বিভিন্ন বর্ণমালা প্রচলিত ছিল তাহাদের মধ্যে প্রভেদ খুব বেশী ছিল না। এক দেশের লোক অন্য দেশের বর্ণমালা পড়িতে পারিত।
গুপ্তযুগেই প্রথম প্রাদেশিক বর্ণমালার মধ্যে স্বাতন্ত্র ও প্রভেদ বাড়িয়া উঠে। ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে পূর্ব্ব ভারতের ও পশ্চিম ভারতের বর্ণমালা দুইটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি অবলম্বন করে। পশ্চিম ভারতের সিদ্ধমাতৃকা-বর্ণমালা ক্রমশ রূপান্তর হইতে হইতে নাগরীতে পরিণত হয়। আর পূর্ব্ব ভারতের বর্ণমালা হইতেই অবশেষে বাংলা বর্ণমালার উৎপত্তি হয়।
সমাচার দেবের কোটালিপাড়া তাম্রশাসনে পূর্ব্ব ভারতে প্রচলিত এই বিশিষ্ট পদ্ধতির বর্ণমালার নিদর্শন পাওয়া যায়। সপ্তম হইতে নবম শতাব্দী পর্য্যন্ত ইহার ক্রমশ অনেক পরিবর্ত্তন হয়। দশম শতাব্দীতে পশ্চিম ভারতের বর্ণমালা ইহার উপর কিছু প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু ঐ শতাব্দের শেষভাগে প্রথম মহীপালের রাজত্বে এই প্রভাব দূর হয়, এবং পূৰ্ব্ব ভারতীয় বর্ণমালায় বাংলা বর্ণমালার পূৰ্ব্বাভাস পাওয়া যায়। প্রথম মহীপালের বাণগড়-লিপিতে ব্যবহৃত অ, উ, ক, খ, গ, ধ, ন, ম, ল এবং ক্ষ অনেকটা বাংলা অক্ষরের আকার ধারণ করিয়াছে। জ একেবারে সম্পূর্ণ বাংলা জ’য়ের অনুরূপ। দ্বাদশ শতাব্দীতে উত্তীর্ণ বিজয়সেনের দেওপাড়া-প্রশস্তিতে যে বর্ণমালা ব্যবহৃত হইয়াছে, তাঁহার মধ্যে ২২টি পুরাপুরি অথবা প্রায় বাংলা অক্ষরের মতন। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষে এবং এয়োদশ শতাব্দের প্রথমে তাম্রশাসনের অক্ষর প্রায় সম্পূর্ণ আধুনিক বাংলা অক্ষরে পরিণত হইয়াছে। ইহার পর তিন-চারিশত বত্সর পর্য্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মে এই অক্ষরের কিছু কিছু পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছে। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে পরিবর্ত্তন বিশেষ কিছু হয় নাই। ঊনবিংশ শতাব্দী হইতে মুদ্রাযন্ত্রের প্রচলনের ফলে বাংলা অক্ষরগুলি একটি নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করিয়াছে। ভবিষ্যতে ইহার আর কোনোরূপ পরিবর্ত্তন হইবে বলিয়া মনে হয় না। এইরূপে দেখা যায় যে গুপ্তযুগের পরবর্ত্তীকালে বাংলায় যখন একটি স্বাধীন পরাক্রান্ত রাজ্য স্থাপিত হয়, সেই সময় হইতেই পূৰ্ব্ব ভারতে একটি বিশিষ্ট বর্ণমালার প্রচলন হয়। ক্রমে এই বর্ণমালা পরিবর্তিত হইয়া বাংলার নিজস্ব একটি বর্ণমালায় পরিণত হয়। বলা বাহুল্য যে চিরকালই বাংলার প্রচলিত অক্ষরেই বাংলায় সংস্কৃত, প্রাকৃত ও দেশীয় ভাষা প্রভৃতি লিখিত হয়। সংস্কৃত ভাষা লিখিবার জন্য নাগরী অক্ষরের ব্যবহার অতি আধুনিক কালেই হইয়াছে। প্রাচীন বাংলার সংস্কৃত ভাষায় লিখিত সমুদয় তাম্রশাসন ও পুঁথিই তকালে প্রচলিত বাংলা অক্ষরেই লেখা হইয়াছে। আর নাগরী অক্ষর বাংলা অপেক্ষা প্রাচীন নহে; অর্থাৎ দশম শতাব্দীতে বাংলা দেশে ব্যবহৃত অক্ষরের সহিত বর্ত্তমান বাংলা অক্ষরের যে সম্বন্ধ, ঐ সময়ে পশ্চিম ভারতে ব্যবহৃত অক্ষরের সহিত বর্ত্তমান নাগরী অক্ষরের সম্বন্ধ তদপেক্ষা অধিকতর ঘনিষ্ঠ নহে।
১৭. ধৰ্ম্মমত ও দেব-দেবীর মূর্ত্তি পরিচয়
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
প্রথম খণ্ড-ধৰ্ম্মমত
১. আৰ্য্যধর্ম্মের প্রতিষ্ঠা
আৰ্যগণের সংস্পর্শে ও প্রভাবে তাঁহাদের ধর্ম্মগত ও সামাজিক রীতিনীতি ক্রমে ক্রমে বাংলায় প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল। খৃষ্টপূৰ্ব চতুর্থ শতাব্দের শেষ ভাগে যখন আলেকজাণ্ডার ভারত আক্রমণ করিয়াছিলেন তখন গঙ্গাসাগরসঙ্গম হইতে পঞ্চনদের পূৰ্ব্বসীমা পর্য্যন্ত ভূভাগ এক অখণ্ড বিরাট রাজ্যের অধীন ছিল। সুতরাং এই সময়ে যে বাংলায় আৰ্যপ্রভাব বিস্তৃত হইয়াছিল তাহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে। বৌধায়ন-ধৰ্ম্মসূত্র প্রভৃতি গ্রন্থ হইতে প্রমাণিত হয় যে তখনো বাংলা দেশে আৰ্য সভ্যতা বিস্তৃত হয় নাই। সুতরাং খৃষ্টপূর্ব্ব ষষ্ঠ ও চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে আৰ্য সভ্যতা বাংলায় প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।
ইহার পূর্ব্বে যাঁহারা বাংলায় বাস করিতেন, তাঁহাদের ধর্ম্মমত কিরূপ ছিল তাহা জানিবার উপায় নাই। কারণ ঐতিহাসিক যুগে তাহারা সকলেই বৌদ্ধ, জৈন ও ব্রাহ্মণ্য প্রভৃতি আৰ্য্যগণের ধর্ম্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তবে ইহা খুবই সম্ভব যে তাঁহাদের প্রাচীন ধর্ম্মমত, সংস্কার, পূজাপদ্ধতি প্রভৃতি রূপান্তরিত হইয়া আৰ্য্য ধৰ্ম্মের সহিত মিশিয়া গিয়াছে। ভারতবর্ষে ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মের যে গুরুতর প্রভেদ দেখা যায়, সম্ভবত প্রাচীন অধিবাসীগণের ধর্ম্ম ও সংস্কারের প্রভাব তাঁহার অন্যতম কারণ। বর্ত্তমানকালে বাংলায় ও ভারতের অন্যান্য দেশে প্রচলিত ধর্ম্ম অনুষ্ঠানের মধ্যে অনেক প্রভেদ দেখা যায়। অসম্ভব নহে যে ইহা অন্তত কতকাংশে বাংলার প্রাচীন অধিবাসীদিগের আচার-অনুষ্ঠানের প্রভাবের ফল। কিন্তু ইহা সত্য বলিয়া গ্রহণ করিলেও প্রাচীন বাঙ্গালীর ধর্ম্মমত সম্বন্ধে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা করা যায় না। সুতরাং বাংলায় আৰ্য্য ধর্ম্মের প্রতিষ্ঠার পূর্ব্বে যে ধর্ম্ম প্রচলিত ছিল তাঁহার কোনো বিবরণ দেওয়া সম্ভবপর নহে। আর্য্য সভ্যতার প্রভাবে খুব প্রাচীনকালেই বাংলায় বৌদ্ধ, জৈন ও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল। কিন্তু গুপ্তযুগের অর্থাৎ খৃষ্টীয় চতুর্থ কি পঞ্চম শতাব্দীর পূর্ব্বে বাংলার এই সমুদয় ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে বিস্তৃত কোনো বিবরণ জানিবার উপায় নাই।
