পূৰ্ব্বে যে ৮৪ জন সিদ্ধাচার্যের কথা উল্লিখিত হইয়াছে তাহারাই পূর্ব্বোক্ত দোহা ও চর্য্যাপদগুলির রচয়িতা। এগুলি তিব্বতীয় ভাষায় অনূদিত হইয়াছিল। তেঙ্গুর নামক বিখ্যাত তিব্বতীয় গ্রন্থে ৫০টি চর্যাপদের অনুবাদ পাওয়া গিয়াছে। সুতরাং পূর্ব্বোক্ত ৪৭টি ব্যতীত আরও তিনটি প্রাচীন বাংলা চর্য্যাপদ ছিল,-শাস্ত্রী মহাশয়ের আবিষ্কৃত পুঁথি খণ্ডিত হওয়ায় এই তিনটির মূল পাওয়া যায় নাই।
বাংলায় প্রচলিত ময়নামতীর গানে চর্য্যাপদ রচয়িতা এই সিদ্ধাচার্যগণের কিছু কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। ময়নামতী রাজা গোপীচাঁদের মাতা ও গোরক্ষনাথের শিষ্যা ছিলেন। তিনি যোগবলে জানিতে পারিলেন যে তাঁহার পুত্র সন্ন্যাস গ্রহণ না করিলে অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হইবেন। গোপীচাঁদ তাঁহার দুই রাণী অদুনা ও পদুনার বহু বাধা সত্ত্বেও মাতার আজ্ঞায় সন্ন্যাসী হইলেন এবং গোরক্ষনাথের শিষ্য জালন্ধরিপাদ অথবা হাড়িপার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিলেন।
সিদ্ধ ও যোগীপুরুষ হিসাবে গোরক্ষনাথের খ্যাতি ভারতের সর্বত্র বিস্তৃত, এবং তপ্রবর্তিত কানফাটা যোগী সম্প্রদায় সমগ্র হিন্দুস্থানে, বিশেষত পাঞ্জাবে ও রাজপুতনায়, এখন পর্য্যন্ত বিশেষ প্রভাবশালী। তাঁহার পুত্র মীননাথ অথবা মৎস্যেন্দ্রনাথ। স্বয়ং শিব তাঁহাকে গুহ্য মন্ত্র প্রদান করেন এবং তিনি আদি সিদ্ধ নামে কথিত হইয়া থাকেন। ময়নামতীর গানে এই সম্প্রদায়ের নিম্নলিখিত রূপ গুরুপরম্পরা পাওয়া যায়।
মৎস্যোন্দ্রনাথ (মনীনাথ)
।
গোরক্ষনাথ (গোরখনাথ)
।
জালন্ধরিপাদ (হাড়িপা)
।
কৃষ্ণপাদ (কানুপা, কাহ্নপা)
যে ৪৭টি চর্য্যাপদ পাওয়া গিয়াছে তাঁহার মধ্যে ১২টির রচয়িতা কৃষ্ণপাদ বা কাহ্নপা। তিনি একটি পদে যেভাবে জালন্ধরিপাদের উল্লেখ করিয়াছেন তাহাতে মনে হয় যে ইনি তাঁহার গুরু। সুতরাং পদরচয়িতা কৃষ্ণপাদ ও গোরক্ষনাথের প্রশিষ্য কৃষ্ণপাদ একই ব্যক্তি এইরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। লুইপা দুইটি চৰ্য্যাপদের রচয়িতা। তিব্বতীয় আখ্যানের উপর নির্ভর করিয়া কেহ ঘঁহাকে আদি সিদ্ধ মৎস্যেন্দ্রনাথের সহিত অভিন্ন মনে করেন, ইহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। এই সমুদয় পদরচয়িতা সিদ্ধ গুরুদিগের কাল-নির্ণয় সম্বন্ধে পণ্ডিতেরা একমত নহেন। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় অনুমান করেন যে গোরক্ষনাথ দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে বর্ত্তমান ছিলেন। কিন্তু ড. শহীদুল্লাহ নেপালের প্রচলিত কিংবদন্তীর উপর নির্ভর করিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে মৎস্যেন্দ্রনাথ সপ্তম শতাব্দের লোক। কিন্তু অনেকেই এই মত গ্রহণ করেন না। চর্যাপদের ভাষা দশম শতাব্দীর পূৰ্ব্বকার নহে, ইহাই প্রচলিত মত।
চর্য্যাপদগুলিকে বাংলা সাহিত্যের আদিম উৎস বলা যাইতে পারে এবং ইহার প্রভাবেই পরবর্ত্তী যুগের বাংলার সহজিয়া গান, বৈষ্ণব পদাবলী, শাক্ত ও বাউল গান প্রভৃতির সৃষ্টি হইয়াছে। সুতরাং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসের দিক দিয়া ইহার মূল্য খুব বেশী। নিছক সাহিত্য হিসাবে সৌন্দৰ্য্য বিকাশিত হইবার সুযোগ পায় নাই-কিন্তু মাঝে মাঝে ইহাতে প্রকৃত কবিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। নিম্নে নমুনাস্বরূপ একটি প্রাচীন চর্য্যাপদ ও বর্ত্তমান বাংলা ভাষায় তাঁহার যথাসম্ভব রূপান্তর দেখানো হইতেছে। ইহা হইতে প্রাচীন চর্যাপদের ভাষা ও ভাব সম্বন্ধে ধারণা অনেকটা স্পষ্ট হইবে।
চর্য্যাপদ ১৪
১। গঙ্গা জউনা মাঝেঁ রে বইই নাঈ।
তহিঁ চড়িলী মাতঙ্গি পোইআ লীলে পার করেই।
২। বাহ তু ডোম্বী বাহ লো ডোম্বী বাটত ভইল উছারা।
সদ্গুরু পাআ-পসাএঁ জাইব পুণু জিমউরা৷
৩। পাঞ্চ কেড়ুআল পড়ন্তেঁ মাঙ্গে পীঠত কাছী বান্ধী।
গঅন উখোলেঁ সিঞ্চহু পাণী ন পইসই সান্ধি৷
৪। চান্দ সুজ দুই চাকা সিঠি সংহার পুলিন্দা।
বাম দাহিণ দুই মাগ ন চেবই বাহ তু ছন্দা।।
৫। কবড়ী ন লেই বোড়ী ন লেই সুচ্ছলে পার করেই।
জো রথে চড়িলা বাহবা ‘। জানি কুলেঁ কুল বুলই।।
বর্ত্তমান বাংলায় রূপান্তর
১। গঙ্গা যমুনা মধ্যে যে বহে নৌকা।
তাহাতে চড়িয়া চণ্ডালী ডোবা লোককে অবলীলাক্রমে পার করে।
২। বাহ্ ডোমনী! বাহ্ লো ডোমনী! পথে হইল বেলা গত।
সদ্গুরু-পাদ-প্রসাদে যাইব পুনঃ জিনপুর (জিন= বুদ্ধ) ॥
৩। পাঁচ দাঁড় পড়িতে নৌকার গলুইয়ে, পিঠে কাছি বান্ধিয়া।
গগন-উখলিতে (দ্বারা) ছেঁচ পানি, না পসিবে সন্ধিতে। (ছিদ্রে জল প্রবেশ করিবে না)।।
৪। চাঁদ-সূৰ্য্য দুই চাকা, সৃষ্টি-সংহার (দুই) মাস্তুল।
বাম ডাহিনে দুই মার্গ না বোধ হয়, বাহ্ স্বচ্ছন্দে।।
৫। কড়ি না লয়, বুড়ি (পয়সা) না লয়, অমনি পার করে।
যে রথে চড়িল, (নৌকা) বাহিতে না জানিয়া কূলে কূলে বেড়ায়।।
চর্য্যাপদ ব্যতীত যে ঐযুগে প্রাচীন বাংলায় রচিত অন্যান্য শ্রেণীর সাহিত্য ছিল তাহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে। এ বিষয়ে কিছু কিছু প্রমাণও আছে। চালুক্যরাজ তৃতীয় সোমেশ্বরের রাজ্যকাল (১১২৭-১১৩৮ অব্দ) রচিত মানসোল্লাস’ গ্রন্থের ‘গীত-বিনোদ’ অধ্যায়ে বিভিন্ন দেশীয় ভাষায় রচিত গীতের দৃষ্টান্ত আছে। ইহার মধ্যে বিষ্ণুর অবতার ও গোপীগণের সহিত কৃষ্ণের লীলাবিষয়ক কয়েকটি বাংলা গীতের অংশ আছে। গীতগোবিন্দের রচনাভঙ্গী যে প্রাচীন বাংলা ও অপভ্রংশে রচিত গীতিকবিতার অনুরূপ, তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি জনপ্রিয় সংস্কৃত মহাকাব্য অবলম্বনে যে বাংলা ভাষায় একটি লৌকিক সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছিল ইহাও খুবই সম্ভব। কিন্তু এরূপ রচনার কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় নাই। মোটের উপর একথা বলা যাইতে পারে যে, বৌদ্ধ সহজিয়া মতের চর্য্যাপদগুলি ছাড়া প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত এমন আর কিছুই পাওয়া যায় নাই, যাহা দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্ব্বেকার বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। মধ্যযুগে বৈষ্ণব ধর্ম্মের প্রভাবে যে বাংলা সাহিত্যের অপূৰ্ব্ব পরিপুষ্টি ও শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছিল, সম্ভবত পুরাতন বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্ম্মের প্রভাবেই সেই সাহিত্যের প্রথম সৃষ্টি হয়। পণ্ডিত ও প্রচলিত ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মের পৃষ্ঠপোষকগণ সংস্কৃতকেই একমাত্র সাধুভাষা ও সাহিত্যের বাহন মনে করিতেন, কিন্তু নূতন ও অর্ব্বাচীন ধর্ম্মমত জনসাধারণে প্রচলিত করার জন্য ইহার আচাৰ্য্যগণ জনসাধারণের ভাষায়ই ইহাকে প্রচার করিতে যত্নবান ছিলেন। ইহাই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সৃষ্টি ও পরিপুষ্টির প্রধান কারণ বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে।
