উমাপতিধর সম্বন্ধে জয়দেব লিখিয়াছেন ‘বাচ: পল্লবয়তি’ অর্থাৎ তিনি বাক্যবিন্যাসে পটু। তাঁহার রচিত বিজয়সেনের প্রশস্তি (দেওপাড়া লিপি) এই মন্তব্যের সমর্থন করে। মাধাই নগরে প্রাপ্ত লক্ষ্মণসেনের তাম্রশাসনের একটি শ্লোকও সদুক্তিকর্ণামৃতে উমাপতিধরের রচিত বলিয়া উদ্ধৃত হইয়াছে। সুতরাং এই তাম্রশাসনও সম্ভবত তাঁহারই রচনা। সদুক্তিকর্ণামৃতে উমাপতিধরের ৯০টি শ্লোক উদ্ধৃত হইয়াছে এবং উমাপতিরচিত ‘চন্দ্রচূড়-চরিত’ কাব্যের উল্লেখ আছে। সম্ভবত এই উমাপতি ও উমাপতিধর একই ব্যক্তি।
আচাৰ্য গোবর্দ্ধন সম্বন্ধে জয়দেব লিখিয়াছেন যে শৃঙ্গার রসাত্মক কবিতা রচনায় তাঁহার সমকক্ষ কেহ ছিল না। এই কবি গোবর্দ্ধনই যে ‘আৰ্য্যাসপ্তশতীর’ কবি গোবর্দ্ধনাচাৰ্য সে বিষয়ে বিশেষ কোনো সন্দেহ নাই। এই কাব্যগ্রন্থ গোবর্দ্ধনের অপূৰ্ব্ব কবিত্ব ও পাণ্ডিত্যশক্তির পরিচায়ক। সম্ভবত তাঁহার পাণ্ডিত্যের জন্যই তিনি আচার্য্য বলিয়া অভিহিত হইতেন।
কবি শরণ সম্বন্ধে জয়দেব লিখিয়াছেন যে তিনি শ্লাঘ্য দুরূহ-দ্রুতে অর্থাৎ দুরূহ রচনায় তিনি দ্রুত সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ইহা হইতে কেহ কেহ মনে করেন যে তিনি ও দুর্ঘটবৃত্তির’ গ্রন্থকার বৈয়াকরণিক শরণ একই ব্যক্তি। কিন্তু ইহা অনুমান মাত্র। সদুক্তিকর্ণামৃতে শরণের কবিতা উদ্ধৃত হইয়াছে, কিন্তু তাঁহার কোনো কাব্যগ্রন্থ পাওয়া যায় নাই।
লক্ষ্মণসেনের সভাকবিদের মধ্যে জয়দেব যে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। তাঁহার গীতগোবিন্দের ‘কোমল-কান্ত-পদাবলী’ কেবলমাত্র বৈষ্ণবগণের নহে, সাহিত্যরস-পিপাসু মাত্রেরই চিত্তে চিরদিন আনন্দদান করিবে। সংস্কৃত ভাষায় এরূপ শ্রুতিমধুর, জনপ্রিয়, অথচ উচ্চাঙ্গের রসসম্পন্ন কাব্য খুব বেশি নাই। ইহার ৪০ খানি বা ততোধিক টীকা আছে এবং ইহার অনুকরণে প্রায় ১২।১৪ খানি কাব্যগ্রন্থ রচিত হইয়াছে। সমগ্র ভারতে গীতগোবিন্দ যে কিরূপ সমাদর লাভ করিয়াছে ইহাই তাঁহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এই অসাধারণ জনপ্রিয়তার জন্যই কবি জয়দেবকে মিথিলা ও উড়িষ্যার অধিবাসীরা তাঁহাদের স্বদেশবাসী বলিয়া দাবি করিয়া থাকেন। কিন্তু অজয় নদের তীরে কেন্দুবিল্বগ্রাম তাঁহার জন্মভূমি, এই প্রবাদ এত দৃঢ়ভাবে প্রচলিত যে বিশেষ প্রমাণ না পাইলে অন্যরূপ বিশ্বাস করা কঠিন। এখনো প্রতি বৎসর মাঘী সংক্রান্তিতে জয়দেবের স্মৃতি রক্ষার্থে কেন্দুবিন্ত্রে বিরাট মেলার অধিবেশন হয়। তাঁহার জীবনী সম্বন্ধে বিশেষ কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। গীতগোবিন্দের একটি শ্লোক হইতে জানা যায় যে তাঁহার পিতার নাম ভোজদেব এবং মাতার নাম রামদেবী (পাঠান্তর-রাধাদেবী, বামাদেবী)। তাঁহার স্ত্রীর নাম সম্ভব পদ্মাবতী। জয়দেব যে সঙ্গীতে নিপুণ ছিলেন তাঁহার গীতগোবিন্দ রচনা হইতে তাহা বুঝা যায়। কারণ ইহার অনেক পদ প্রকৃতপক্ষে সঙ্গীতের উপযোগী করিয়াই রচিত এবং এখনো গীত হয়।
গীতগোবিন্দে রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনী বর্ণিত হইয়াছে, এবং বাংলার বৈষ্ণব সম্প্রদায় রসশাস্ত্রের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা হিসেবে ইহাকে তাহাদের একখানি বিশিষ্ট ধর্ম্মগ্রন্থ বলিয়া গণ্য করেন। কিন্তু ইহার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ছাড়িয়া দিলেও কেবলমাত্র ভাব ও রসের বিচারে ইহা সংস্কৃত সাহিত্যে একখানি উৎকৃষ্ট কাব্য বলিয়া বিবেচিত হইবার যোগ্য। ইহা প্রচলিত সংস্কৃত কাব্য হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রকৃতির এবং সাহিত্যিক জগতে এক নতুন সৃষ্টি। রচনাপ্রণালীর দিক হইতে সংস্কৃত কাব্য অপেক্ষা অপভ্রংশ এবং বাংলা ও মৈথিলী ভাষায় রচিত পদাবলীর সহিত ইহার সাদৃশ্য অনেক বেশী। কেহ কেহ মনে করেন যে গীতগোবিন্দ প্রথমে অপভ্রংশ অথবা প্রাচীন বাংলায় রচিত হইয়াছিল এবং পরে সংস্কৃতে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু অনেকেই এই মত গ্রহণ করেন নাই।
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ বাংলায় সংস্কৃত সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ যুগ বলা যাইতে পারে। একদিকে ধর্ম্মশাস্ত্র ও অপরদিকে উচ্চাঙ্গের কাব্য এই যুগকে অমর করিয়া রাখিয়াছে। অর্দ্ধশতাব্দীর মধ্যে অনিরুদ্ধ ভট্ট, হলায়ূধ, বল্লালসেন, সর্ব্বানন্দ, জয়দেব, উমাপতি, ধোয়ী, গোবর্দ্ধন ও শরণ-এতগুলি পণ্ডিত ও কবির সমাবেশ যেকোনো দেশের পক্ষেই গৌরবজনক।
.
৫. বাংলা ভাষা ও সাহিত্য
স্বাভাবিক বিবর্ত্তনের ফলে সংস্কৃত ভাষা হইতে ক্রমে ক্রমে পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ ও দেশীয় ভাষার উৎপত্তির কথা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। কোন সময়ে বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয় তাহা নিশ্চিত বলা যায় না। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালে কতকগুলি প্রাচীন বৌদ্ধ-চর্য্যাপদ আবিষ্কার করেন এবং বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামক গ্রন্থে প্রকাশিত করেন। বর্ত্তমান বাংলা ভাষার সহিত অনেক প্রভেদ থাকিলেও এই চর্য্যাপদগুলিই যে সর্বপ্রাচীন বাংলা ভাষার নিদর্শন তাহা সকলেই স্বীকার করেন।
এই চর্য্যাপদগুলির প্রত্যেকটিতে চারি হইতে ছয়টি পদ আছে। এগুলির বিষয়বস্তু সহজিয়া বৌদ্ধমতের গূঢ় আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা। এ পর্য্যন্ত মোট ২২ জন কবি রচিত ৪৭টি চর্য্যাপদ পাওয়া গিয়াছে। এই পদগুলির সংস্কৃত টীকা আছে-কিন্তু তাহাও এত দুরূহ যে সকল স্থলে মূলের তাৎপর্য বোধগম্য হয় না। এই প্রাচীন বাংলায় রচিত চর্যাপদের সঙ্গে শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষায় রচিত সরহ ও কাহ্নের দোহা এবং ‘ডাকার্ণব’ এই তিনখানি পুঁথি পাওয়া গিয়াছে। পণ্ডিতেরা অনুমান করেন যে দশম শতাব্দে এইগুলি রচিত হয়। ঐযুগে বাংলায় ও বাংলার বাহিরে শৌরসেনী অপভ্রংশই বহুল পরিমাণে সাহিত্যের ভাষা ছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন বাংলাও ক্রমশ পরিপুষ্ট হইয়া সাহিত্যের উপযুক্ত ভাষা বলিয়া পরিগণিত হয়, এবং একই কবি শৌরসেনী অপভ্রংশ ও বাংলা এই দুই ভাষাতেই কবিতা রচনা করেন। খুব সম্ভব এই প্রাচীন বাংলা আরও দুই-একশত বৎসর পূর্ব্ব হইতেই অর্থাৎ পালযুগের প্রারম্ভেই প্রচলিত ছিল, কিন্তু যে চর্য্যাপদগুলি ইহার সৰ্ব্বপ্রাচীন নিদর্শন তাহা সম্ভবত দশম শতাব্দীতে রচিত। তখনো শৌরসেনী অপভ্রংশই আর্য্যাবর্তের পূর্ব্বভাগে সাধুভাষা বলিয়া সম্মানের আসন পাইত। কিন্তু ক্রমে ক্রমে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়া বাংলার একমাত্র সাহিত্যিক ভাষায় পরিণত হয়। মোটামুটিভাবে বলা যাইতে পারে যে নবম হইতে দ্বাদশ এই চারি শতাব্দীই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদিম যুগ।
