অন্যান্য সিদ্ধাচাৰ্য্যগণের মধ্যে কৃষ্ণপাদ (অথবা কানুপা), সরহপাদ প্রভৃতি নাম করা যাইতে পারে।
.
৪. সেনযুগে সংস্কৃত সাহিত্য
সেনরাজগণের অভ্যুদয়ের ফলে অপভ্রংশ ও বাংলায় রচিত তান্ত্রিক সহজিয়া সাহিত্যের প্রসার কমিয়া পুনরায় সংস্কৃত সাহিত্যের উন্নতির যুগ আরম্ভ হয়। সেনরাজগণ শৈব ও বৈষ্ণবধর্ম্মের উপাসক ছিলেন এবং বৈদিক যাগযজ্ঞ ও ক্রিয়াকাণ্ডের অনুষ্ঠান করিতেন। সুতরাং তাঁহাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের ন্যায় বঙ্গদেশেও সংস্কৃত সাহিত্য ও হিন্দুধর্ম্মের নবজাগরণের সূত্রপাত হয়।
বৌদ্ধ ও তান্ত্রিক মতের প্রভাবে হিন্দুর আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াপদ্ধতি অনেকটা লোপ পাইয়াছিল। সুতরাং এই সম্বন্ধীয় গ্রন্থের বিশেষ প্রয়োজন ছিল। বল্লালসেনের গুরু অনিরুদ্ধ ভট্ট হারলতা ও পিতৃদয়িত’ নামক দুইখানি গ্রন্থে অশৌচ, শ্রাদ্ধ, সন্ধ্যা, তর্পণ প্রভৃতি হিন্দুর বিবিধ অনুষ্ঠানের ও নিত্যকর্মের বিস্তৃত আলোচনা করেন। বল্লালসেন নিজে ‘ব্ৰত-সাগর’, ‘আচার-সাগর’, ‘প্রতিষ্ঠা-সাগর’, ‘দানসাগর’, ও ‘অদ্ভুতসাগর’ নামক পাঁচখানি গ্রন্থ রচনা করেন। কিন্তু মাত্র শেষোক্ত দুইখানি গ্রন্থ পাওয়া গিয়াছে। প্রাচীন বহু ধর্ম্মশাস্ত্র হইতে মত ও উক্তি উদ্ধৃত করিয়া বল্লালসেন এই সমুদয় গ্রন্থে হিন্দুর নানা আচার, প্রতিষ্ঠান, দান কৰ্ম্মাদি ও শুভাশুভাদি নানা নৈমিত্তিক লক্ষণ প্রভৃতির বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। বল্লালসেনের এই সমুদয় গ্রন্থ যে বাংলায় ও বাংলার বাহিরে প্রামাণিক বলিয়া গণ্য হইত তাঁহার যথেষ্ট প্রমাণ আছে।
হলায়ূধ এই যুগের একজন প্রসিদ্ধ গ্রন্থকার। তিনি অল্প বয়সেই রাজপণ্ডিত ছিলেন; লক্ষ্মণসেন তাঁহাকে যৌবনে মহামাত্য এবং প্রৌঢ় বয়সে ধৰ্ম্মাধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত করেন। হলায়ূধ ‘ব্রাহ্মণ-সর্ব্বস্ব’, ‘মীমাংসা-সৰ্ব্বস্ব’, ‘বৈষ্ণব-সর্ব্বস্ব’, ‘শৈব-সর্ব্বস্ব’ ও ‘পণ্ডিত-সর্ব্বস্ব’ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন; কিন্তু ব্রাহ্মণ-সৰ্ব্বস্ব ব্যতীত আর কোনো গ্রন্থ এযাবৎ আবিষ্কৃত হয় নাই। হলায়ূধ লিখিয়াছেন যে রাঢ় ও বরেন্দ্রের ব্রাহ্মণগণ বেদ পড়িতেন না এবং বৈদিক অনুষ্ঠান সম্বন্ধে তাঁহাদের প্রকৃত জ্ঞান ছিল না-এইজন্য হিন্দুর আহ্নিক অনুষ্ঠান ও বিবিধ সংস্কারে ব্যবহৃত বৈদিক মন্ত্রের তাৎপৰ্য ব্যাখ্যা করিবার জন্য তিনি ব্রাহ্মণ-সৰ্ব্বস্ব গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। এই গ্রন্থ বঙ্গদেশে ও বাহিরে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। হলায়ুধের দুই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ঈশান ও পশুপতি শ্রাদ্ধ ও অন্যান্য দৈনিক অনুষ্ঠান সম্বন্ধে দুইখানি ‘পদ্ধতি’ রচনা করেন। পশুপাতি শ্রাদ্ধপদ্ধতি ব্যতীত পাক্যজ্ঞ সম্বন্ধেও একখানি গ্রন্থ রচনা করেন।
ভাষাতত্ত্বেও এই যুগের দুই-একজন গ্রন্থকার প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। ইঁহাদের মধ্যে আৰ্ত্তিহর-পুত্র বন্দ্যঘটীয় সর্ব্বানন্দের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘টীকাসৰ্ব্বস্ব’ নামে হঁহার রচিত অমরকোশের টীকা ভারতের সর্বত্র প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। সর্ব্বানন্দ ১১৫৯-৬০ অব্দে এই গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি অপূৰ্ব্ব পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়াছেন এবং বহু দেশী শব্দের উল্লেখ করিয়াছেন। এই সমুদয় দেশী শব্দের অধিকাংশই এখনো বাংলা ভাষায় প্রচলিত।
‘ভাষাবৃত্তি’, ত্রিকাণ্ডশেষ’, ‘হারাবলী’, ‘বর্ণদেশনা’ ও ‘দ্বিরূপকোষ’ প্রভৃতি কোষ ও ব্যাকরণ গ্রন্থের রচয়িতা পুরুষোত্তম বাঙ্গালী ছিলেন বলিয়া অনেকে মত প্রকাশ করিয়াছেন; কিন্তু এই মতের সমর্থক নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নাই।
সেনরাজগণ প্রায় সকলেই কবিতা রচনা করিতেন, এবং এই যুগকে বাংলায় সংস্কৃত কাব্যের সুবর্ণযুগ বলা যাইতে পারে। লক্ষ্মণসেনের সভাসদ ও সুহৃদ বটুদাসের পুত্র শ্রীধর দাস ১২০৬ অব্দে ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ নামে সংস্কৃত কবিতা সংগ্রহ প্রকাশিত করেন। ইহাতে ৪৮৫ জন কবির রচিত ২৩৭০টি মনোজ্ঞ কবিতা সংগৃহীত হইয়াছে। এই কবিগণের মধ্যে অনেকেই অজ্ঞাত এবং সম্ভবত বঙ্গদেশীয় ছিলেন; কিন্তু ইহা সঠিক জানিবার উপায় নাই। সদুক্তিকর্ণামৃতে রাজা বল্লালসেন, লক্ষ্মণসেনের এবং কেশবসেনের রচিত কবিতা আছে। লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় ধোয়ী, উমাপতিধর, গোবর্দ্ধন, শরণ ও জয়দেব এই পাঁচজন প্রসিদ্ধ কবি ছিলেন। ইঁহাদের বহু কবিতা শ্রীধরদাসের সংগ্রহে পাওয়া যায়।
কবি ধোয়ী তাঁহার একটি শ্লোকে লক্ষ্মণসেনকে রাজা বিক্রমাদিত্যের সহিত তুলনা করিয়াছেন। এই তুলনা কেবলমাত্র কবিসুলভ অত্যুক্তি নহে। তাঁহার সভার উক্ত পঞ্চ কবি সত্য সত্যই পঞ্চ রত্ন ছিলেন।
কবি ধোয়ীর ‘পবনদূত’ কাব্য মেঘদূতের অনুকরণে রচিত। গৌড়ের রাজা লক্ষ্মণসেন যখন দিগ্বিজয়ে প্রবৃত্ত হইয়া দাক্ষিণাত্যে গিয়াছিলেন তখন মলয় পৰ্ব্বতের গন্ধৰ্ব্বকন্যা কুবলয়বতী তাঁহার রূপে মুগ্ধ হন এবং পবনমুখে তাঁহার প্রণয়কাহিনী রাজার নিকট প্রেরণ করেন-এই ভূমিকার উপর ১০৪টি শ্লোকে সম্পূর্ণ এই দূতকাব্য রচিত হইয়াছে। কালিদাসের মেঘদূতের অনুকরণে যে সমুদয় দূতকাব্য রচিত হইয়াছে তাঁহার মধ্যে পবনদূতের স্থান খুব উচ্চ। পবনদূত ব্যতীত ধোয়ী সম্ভবত অন্য কাব্যও লিখিয়াছিলেন, কিন্তু ইহা পাওয়া যায় না। জয়দেব ধোয়ীকে কবিক্ষ্মাপতি অর্থাৎ কবিগণের রাজা এবং শ্রুতিধর বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন।
