পালযুগের পূৰ্ব্ববর্ত্তী হইলেও এই প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম মহাযান লেখক শীলভদ্রের নাম করিতে হয়। তাঁহার মাত্র একখানি গ্রন্থ (‘আৰ্য-বুদ্ধ-ভূমি-ব্যাখ্যান’) তিব্বতীয় অনুবাদে রক্ষিত হইয়াছে।
শান্তিদেব নামে দুইজন তান্ত্রিক সাহিত্যের রচয়িতা ছিলেন। আবার ঠিক এই নামধারী একজন মহাযান গ্রন্থের লেখকও আছেন। এই দুই শান্তিদেব এক কি না এবং তিনি বাঙ্গালী কি না নিশ্চিত বলা যায় না। শান্তি রক্ষিত সম্বন্ধেও এই কথা খাটে। জেরি নামে দুইজন বাঙ্গালী বৌদ্ধ সাহিত্যিক ছিলেন। প্রাচীন জেরি বরেন্দ্রে রাজা সনাতনের রাজ্যে বাস করিতেন এবং দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের গুরু ছিলেন। তৎপ্রণীত তিনখানি ন্যায়ের গ্রন্থের এবং অপর জেরির রচিত ১১ খানি বজ্রযান সাধন গ্রন্থের তিব্বতীয় অনুবাদ মাত্র পাওয়া যায়।
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বাংলার একজন শ্রেষ্ঠ ও জগদ্বিখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন। তিনি ১৬৮ খানি গ্রন্থের রচয়িতা। এই সমুদয়ের অধিকাংশই বজ্রযান সাধন গ্রন্থ।
জ্ঞানশ্রীমিত্র ‘কাৰ্য-কারণ-ভাব-সিদ্ধি’ নামক ন্যায় গ্রন্থের প্রণেতা। চতুর্দ্দশ শতাব্দীতে মাধব তাঁহার ‘সৰ্ব্বদর্শন-সংগ্রহে’ এই গ্রন্থের উল্লেখ করিয়াছেন। ইহার তিব্বতীয় অনুবাদ মাত্র পাওয়া যায়।
অভয়াকর গুপ্ত ২০ খানি বজ্রযান গ্রন্থের লেখক। ইহার মধ্যে মাত্র চারিখানির মূল সংস্কৃত পুঁথি পাওয়া গিয়াছে।
এ পর্য্যন্ত যে সমুদয় গ্রন্থকারের নামোল্লেখ করা হইল ইহারা সকলেই বাংলার বাহিরে বহু খ্যাতি ও কীৰ্ত্তি অর্জন করিয়াছেন এবং ইহাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী একবিংশ অধ্যায়ে আলোচিত হইয়াছে।
অন্যান্য যে সমুদয় বৌদ্ধ গ্রন্থকার তিব্বতীয় কিংবদন্তী অনুসারে বাঙ্গালী ছিলেন তাঁহাদের নাম, রচিত গ্রন্থ ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিম্নে লিপিবদ্ধ হইল :
| নাম | গ্রন্থ (তিব্বতীয় অনুবাদে রক্ষিত) | সংক্ষিপ্ত পরিচয় |
| ১। দিবাকরচন্দ্র | হেরুক সাধন ও ২ খানি অনুবাদ | নয়পালের রাজ্যকালে মৈত্রীপার শিষ্য ছিলেন। |
| ২। কুমারচন্দ্র | ৩ খানি তান্ত্রিক পঞ্জিকা | বিক্রমপুরী বিহারের একজন অবধূত। |
| ৩। কুমারবজ্র | হেরুক সাধক | |
| ৪। দানশীল | ‘পুস্তক পাঠোপায়’ ও ৬০ খানি তান্ত্রিকগ্রন্থের অনুবাদক | জগদ্দল বিহারে ছিলেন। |
| ৫। পুতলি | বোধিচিত্ত-বায়ু চরণ-ভাবনোপায় | বঙ্গাল দেশীয় শূদ্র এবং ৮৪ সিদ্ধের অন্যতম। |
| ৬। নাগবোধি | ১৩ খানি তান্ত্রিক গ্রন্থ | বঙ্গালদেশে শিবসেনা নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। |
| ৭। প্রজ্ঞাবর্ম্মণ | তান্ত্রিকগ্রন্থের ২ খানি টীকা ও অনুবাদ। |
এতদ্ব্যতীত তিব্বতীয় গ্রন্থে বাংলার বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারের কয়েকজন প্রসিদ্ধ গ্রন্থকারের উল্লেখ আছে, কিন্তু তাঁহারা বাঙ্গালী ছিলেন কি না তাহা সঠিক জানা যায় না। ইঁহাদের মধ্যে সোমপুর বিহারের বোধিভদ্র এবং জগদ্দল বিহারের মোক্ষাকরগুপ্ত, বিভূতিচন্দ্র এবং শুভাকরের নাম করা যাইতে পারে।
দশম হইতে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বাংলায় বহু বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব হইয়াছিল; এই সম্বন্ধে সপ্তদশ অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হইবে। এই সম্প্রদায়ের প্রবর্ত্তকগণ সিদ্ধাচাৰ্য্য নামে খ্যাত। এই সমুদয় সিদ্ধাচার্যগণ অনেকেই অপভ্রংশ অথবা প্রাচীন বাংলায় তাঁহাদের ধর্ম্মমত প্রচার করিয়াছেন। এই সমুদয় গ্রন্থের তিব্বতীয় অনুবাদ ও কতকগুলির মূল পাওয়া গিয়াছে। এই সিদ্ধাচাৰ্যগণের নাম, তারিখ ও বিবরণ সম্বন্ধে বহু মতভেদ আছে; তাঁহার সবিস্তার উল্লেখ না করিয়া সংক্ষেপে ইহাদের পরিচয় দিতেছি। ইঁহাদের প্রণীত দোহা অর্থাৎ প্রাচীন বাংলায় রচিত পদ পরে আলোচিত হইবে।
কুক্কুরপাদ বঙ্গদেশীয় ব্রাহ্মণ ছিলেন। তিব্বতীয় প্রবাদ অনুসারে তিনি ডাকিনী দেশ হইতে মন্ত্রযান (হেরুক সাধন) এবং অন্যান্য তন্ত্রমত আনিয়া এদেশে প্রচার করেন। শবরীপাদ বঙ্গালদেশের পাহাড়ে শিকার করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতেন। তিনি ও তাঁহার দুই স্ত্রী, লোকী ও গুণী নাগার্জুনের নিকট দীক্ষা লাভ করেন।
সিদ্ধাচাৰ্য্যগণের মধ্যে লুইপাদ (অথবা লুই-পা) সমধিক প্রসিদ্ধ। তিনি সম্ভবত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের সমসাময়িক। তিনি ৪ খানি বজ্রযান গ্রন্থ এবং বহু দোহা রচনা করেন। তিব্বতীয় প্রবাদ অনুসারে তিনি বাংলা দেশে ধীবর বংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং যোগিনীতন্ত্রের প্রবর্ত্তন করেন।
অনেকে মনে করেন লুইপাদ ও মৎস্যেন্দ্রনাথ একই ব্যক্তি। কারণ মৎস্যেন্দ্রনাথ যে নূতন ধর্ম্মমতের প্রবর্ত্তন করেন তাঁহার সহিত যোগিনী তন্ত্রের অনেক সাদৃশ্য আছে এবং তিনিও বাংলা দেশের চন্দ্রদ্বীপে ধীবর বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার ধর্ম্মমত সংস্কৃত গ্রন্থ ও দোহায় প্রচারিত হয়। সংস্কৃত গ্রন্থের মধ্যে ‘কৌলজ্ঞান-নির্ণয়’ সর্বপ্রাচীন ও সমধিক প্রসিদ্ধ।
মৎস্যেন্দ্রনাথের শিষ্য গোরক্ষনাথ সম্বন্ধে বহু কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। বাংলার রাজা গোপীচাঁদের সন্ন্যাস অবলম্বনে রচিত বহু গীতিকা সমস্ত আৰ্য্যাবর্তে সুপ্রসিদ্ধ। এই গোপীচাঁদ ও তাঁহার মাতা ‘নাথ’ নামে পরিচিত এবং ইহার আচাৰ্য্যগণ সংস্কৃত, অপভ্রংশ ও প্রাচীন বাংলায় বহু গ্রন্থ ও পদ রচনা করিয়াছেন।
