সুরেশ্বর অথবা সুরপাল নামে আর একজন বাঙ্গালী বৈদ্যক গ্রন্থকার দ্বাদশ শতাব্দে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন। ইঁহার পিতামহ দেবগণ রাজা গোবিন্দচন্দ্রের এবং পিতা ভদ্রেশ্বর রামপালের সভায় রাজবৈদ্য ছিলেন। তিনি নিজে রাজা ভীমপালের বৈদ্য ছিলেন। সুরেশ্বর আয়ুৰ্ব্বেদোক্ত উদ্ভিদের পরিচয় দিবার জন্য শব্দ-প্রদীপ ও ‘বৃক্ষায়ুর্ব্বেদ’ নামে দুইখানি এবং ঔষধে লৌহের ব্যবহার সম্বন্ধে ‘লোহ-পদ্ধতি বা ‘লোহ-সর্ব্বস্ব’ নামে একখানি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
পালযুগে, বিশেষত দশম ও একাদশ শতাব্দীতে, বাংলায় বৈদ্যক শাস্ত্রের বিশেষ উন্নতি হইয়াছিল। অনেকে মনে করেন যে বৈদ্যক গ্রন্থের টীকাকার অরুণদত্ত, বিজয় রক্ষিত, বৃন্দ কুণ্ড, শ্রীকণ্ঠ দত্ত, বঙ্গসেন এবং সুশ্রুতের প্রসিদ্ধ টীকাকার গয়দাস বাঙ্গালী ছিলেন এবং ইহাদের অনেকেই পালযুগে আবির্ভূত হইয়াছিলেন।
‘চিকিৎসা-সার সংগ্রহের’ গ্রন্থকার বঙ্গসেন সম্ভবত বাঙালী ছিলেন, কিন্তু এ সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।
বাংলায় যে বৈদিক সাহিত্যের চর্চ্চা হইত তাহা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। দশম শতাব্দীতে ‘কুসুমাঞ্জলি’ প্রণেতা উদয়ন (কেহ কেহ ঘঁহাকে বাঙ্গালী বলেন) লিখিয়াছেন যে বাংলার মীমাংসকগণ বেদের প্রকৃত মৰ্ম্ম জানেন না। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে গঙ্গেশ উপাধ্যায়ও এইরূপ বলিয়াছেন। মীমাংসাশাস্ত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তির অভাব সূচিত করিলেও ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে বাংলায় এই বিষয়ে চর্চ্চা ও গ্রন্থ রচিত হইত। অনিরুদ্ধভট্ট ও ভবদেবভট্ট উভয়েই কুমারিলের গ্রন্থে ব্যুৎপন্ন ছিলেন। কিন্তু ভবদেব প্রণীত ‘তৌতাতিত-মত-তিলক’ ব্যতীত বাঙ্গালী রচিত আর কোনো মীমাংসা গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায় নাই। বৈদিক কৰ্ম্মানুষ্ঠান সম্বন্ধে উত্তর রাঢ় নিবাসী নারায়ণ ‘ছান্দোগ্য পরিশিষ্টে’র ‘প্রকাশ’ নামক টীকা রচনা করিয়াছিলেন। নারায়ণ দেবপালের সমসাময়িক ছিলেন। ভবদেবভট্টও ‘ছান্দোগ্য কৰ্ম্মানুষ্ঠান পদ্ধতি’ লিখিয়াছিলেন। ইহা ‘দর্শকর্ম্মপদ্ধতি’, ‘দশকৰ্ম্মদীপিকা’ ও ‘সংস্কারপদ্ধতি’ নামেও পরিচিত।
ধর্ম্মশাস্ত্র সম্বন্ধে অনেক বাঙ্গালী গ্রন্থ লিখিয়াছেন। জিতেন্দ্রিয়, বালক এবং যোগ্লোক নামে তিনজন লেখকের বচন ও মত পরবর্ত্তী লেখকগণ বহুস্থানে উল্লেখ করিয়াছেন-কিন্তু ইহাদের মূল গ্রন্থগুলি পাওয়া যায় নাই। ভবদেবভট্ট প্রণীত ‘প্রায়শ্চিত্ত-প্রকরণ’ এ বিষয়ে একখানি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। ইহা সম্পূর্ণ পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু তাঁহার ব্যবহার তিলক গ্রন্থ পাওয়া যায় নাই। আচার সম্বন্ধে তাঁহার গ্রন্থও পাওয়া যায় নাই। ভবদেবভট্টের এই সমুদয় গ্রন্থ ভারতের প্রসিদ্ধ স্মার্তগণ শ্রদ্ধার সহিত উল্লেখ করিয়াছেন।
জীমূতবাহন সম্ভবত ভবদেবভট্টের পরবর্ত্তী, কিন্তু তাঁহার সঠিক কাল নির্ণয় সম্ভব নহে। জীমূতবাহন রাঢ়দেশীয় পারিভদ্ৰকুলে জন্মগ্রহণ করেন। এই পারিভদ্ৰকুল রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণের ‘পারিহাল’ বা ‘পারি’ গাঁঈর অন্তর্গত। জীমূতবাহন প্রণীত ‘দায়ভাগ’ অনুসারে এখন পর্য্যন্তও বাংলার উত্তরাধিকার, স্ত্রীধন প্রভৃতি বিধিগুলি পরিচালিত হইতেছে। বাংলার বাহিরে ভারতের সৰ্ব্বত্র মিতাক্ষরা আইন প্রচলিত। সুতরাং জীমূতবাহনের মত বাঙ্গালীর একটি বৈশিষ্ট্য সূচিত করিতেছে। তৎপ্রণীত ‘ব্যবহার-মাতৃকা’ বিচারপদ্ধতি সম্বন্ধীয় গ্রন্থ। ইহাও বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। তাঁহার তৃতীয় গ্রন্থ ‘কাল বিবেক। হিন্দুগণের আচরিত বিবিধ অনুষ্ঠানের কাল নিরূপণ করাই এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য। সৌভাগ্যের বিষয় জীমূতবাহনের তিনখানি গ্রন্থই অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়াছে এবং বহুবার মুদ্রিত হইয়াছে।
পালরাজগণ বৌদ্ধ ছিলেন এবং এই সময় ভারতবর্ষে একমাত্র তাহাদের রাজ্যেই অর্থাৎ বাংলায় ও বিহারেই বৌদ্ধধর্ম্মের প্রতিষ্ঠা ও প্রতিপত্তি বেশ দৃঢ় ছিল। এই যুগে বৌদ্ধধর্ম্মের প্রকৃতিও অনেক পরিবর্তিত হইয়াছিল এবং মহাযানের পরিবর্তে সহজযান বা সহজিয়া ধৰ্ম্ম প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিল। সপ্তদশ পরিচ্ছেদে এই বিষয় বিস্তারিত উল্লিখিত হইবে। সহজিয়া বৌদ্ধধর্ম্মের এক বিপুল সাহিত্য আছে। তাঁহার অধিকাংশই বাঙ্গালীর রচিত। তাহারা যে সমুদয় গ্রন্থ লিখিয়াছিলেন তাঁহার অধিকাংশই বিলুপ্ত হইয়াছে। কিন্তু তিব্বতীয় ভাষায় এই সমুদয় গ্রন্থের যে অনুবাদ হইয়াছিল তাহা অবলম্বন করিয়া আমরা এই বিরাট ধর্ম্মসাহিত্যের স্বরূপ নির্ণয় করিতে পারি। যে সমুদয় গ্রন্থের প্রণেতা বাঙ্গালী ছিলেন বলিয়া তিব্বতীয় সাহিত্যে স্পষ্ট উল্লেখ আছে তাহা ছাড়াও হয়তো আরও অনেক বাঙ্গালী গ্রন্থকার ছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে আর কোনো প্রমাণ না পাওয়া পর্য্যন্ত আমরা তাঁহাদিগকে বাঙ্গালী বলিয়া গ্রহণ করিতে পারি না। কিন্তু যেটুকু জানা গিয়াছে তাহা হইতে নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে যে পালযুগের এই তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাহিত্য বাঙ্গালীর একটি বিশেষ মূল্যবান সম্পদ বলিয়া গণ্য হইবার যোগ্য। গ্রন্থকারগণের নাম, পরিচয় ও কাল-নির্ণয় লইয়া অনেক গোলমাল ও বিভিন্ন মতবাদ আছে; এ স্থানে তাঁহার উল্লেখের প্রয়োজন নাই। যে সমুদয় বাঙ্গালীর লেখায় এই তান্ত্রিক সাহিত্য সৃষ্ট ও পুরিপুষ্ট হইয়াছিল মোটামুটিভাবে তাঁহাদের নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় লিপিবদ্ধ হইল।
