সুতরাং বাংলায় যে সংস্কৃত সাহিত্যের চর্চ্চা বহুল পরিমাণে ছিল তাহাতে সন্দেহ নাই। দুঃখের বিষয় বৌদ্ধ তান্ত্রিক গ্রন্থ ব্যতীত এই যুগে বাঙ্গালীর রচিত গ্রন্থ যাহা পাওয়া গিয়াছে তাহা এইরূপ বহু শতাব্দীব্যাপী বিস্তৃত চর্চ্চার নিদর্শন হিসেবে নিতান্তই সামান্য ও অকিঞ্চিৎকর।
মুদ্রারাক্ষস প্রণেতা নাট্যকার বিশাখদত্ত, অনর্ঘরাঘবের কবি মুরারি, চণ্ডকৌশিক নাটকের গ্রন্থকার ক্ষেমীশ্বর, কীচকবধ কাব্য প্রণেতা নীতিবর্ম্মা এবং নৈষধ-চরিত রচয়িতা শ্রীহর্ষ-এই সকল প্রসিদ্ধ লেখক বাঙ্গালী ছিলেন বলিয়া কেহ কেহ মত প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ইহাদের কাহাকেও বাঙ্গালার সন্তান বলিয়া নিঃসন্দেহে গ্রহণ করা যায় না।
অভিনন্দ নামে একজন বাঙ্গালী কবির সন্ধান পাওয়া যায়। শার্গধর-পদ্ধতিতে ইঁহাকে গৌড় অভিনন্দ বলা হইয়াছে, সুতরাং ইনি যে বাঙ্গালী ছিলেন সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। অভিনন্দের রচনা বলিয়া যে সমুদয় শ্লোক বিভিন্ন প্রসিদ্ধ পদ্যসংগ্রহ গ্রন্থে উদ্ধৃত হইয়াছে, সম্ভবত সে সমুদয় তাঁহারই রচনা। কেহ কেহ মনে করেন যে ইনিই কাদম্বরী-কথা-সার নামক কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। অভিনন্দ সম্ভবত নবম শতাব্দীতে জীবিত ছিলেন।
পালযুগের একখানি কাব্যগ্রন্থ এ পর্য্যন্ত আবিষ্কৃত হইয়াছে। ইহা সন্ধ্যাকরনন্দী প্রণীত ‘রামচরিত’ কাব্য। ইহার রচনাপ্রণালী, ঐতিহাসিক মূল্য ও আখ্যানভাগ রামপালের ইতিহাস প্রসঙ্গে সংক্ষেপে আলোচিত হইয়াছে। এই দুরূহ শ্লেষাত্মক কাব্যের প্রতি শ্লোক এমন সুকৌশলে রচিত হইয়াছে যে পৃথক পৃথকভাবে বর্ণবিন্যাস ও শব্দযোজনা করিলে ইহা একদিকে রামায়ণের রামচন্দ্রের ও অপরদিকে পালসম্রাট রামপালের পক্ষে প্রযোজ্য হইবে। এই গ্রন্থের উপসংহারে একটি কবিপ্রশস্তি আছে। তাহা হইতে জানা যায় যে সন্ধ্যাকরনন্দী বরেন্দ্রে পুণ্ড্রবর্দ্ধনের নিকট বাস করিতেন। তাঁহার পিতা প্রজাপতিনন্দী রামপালের সান্ধি বিগ্রহিক ছিলেন। মদনপালের রাজত্বকালে এই কাব্য রচিত হয়। দ্ব্যর্থবোধক শ্লোকের দ্বারা ঐতিহাসিক আখ্যান বর্ণনা হেতু এই কাব্যে কবিত্বশক্তি সর্বত্র পরিস্ফুট হইবার সুযোগ পায় নাই। কিন্তু বরেন্দ্র ও রামাবতী নগরীর বর্ণনা ও ভীমের সহিত যুদ্ধের বিবরণ প্রভৃতি সাহিত্যের দিক দিয়াও উপভোগ্য। উচ্চাঙ্গের কবিত্ব না থাকিলেও ‘রামচরিত’ বাঙ্গালীর সংস্কৃত কাব্যে নিষ্ঠা ও নৈপুণ্যের পরিচয় হিসেবে চিরদিনই সমাদৃত হইবে।
দর্শনশাস্ত্রে আমরা এই যুগের মাত্র একজন প্রসিদ্ধ বাঙ্গালী লেখকের নাম জানি। ইনি বিখ্যাত ন্যায়কন্দলী প্রণেতা শ্রীধরভট্ট। ইঁহার পিতার নাম বলদেব, মাতার নাম অব্বোকা, এবং জন্মভূমি দক্ষিণ রাঢ়ের অন্তর্গত ভূরিশ্রেষ্ঠি (বর্দ্ধমানের নিকটবর্ত্তী ভুরশুট গ্রাম)। প্রশস্তপাদ বৈশেষিক সূত্রের যে ‘পদার্থ-ধৰ্ম্ম’ সংগ্রহ নামক ভাষ্য রচনা করেন শ্রীধরভট্ট তাঁহার ন্যায়কন্দলী টীকা দ্বারা ন্যায়বৈশেষিক মতের উপর আস্তিক্যবাদ প্রতিষ্ঠা করিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। শ্রীধর ‘অদ্বয় সিদ্ধি’, ‘তত্ত্বসংবাদিনী’, ‘তপ্রবোধ’ এবং সগ্রহটীকা প্রভৃতি বেদান্ত ও মীমাংসাবিষয়ক কয়েকখানি গ্রন্থ রচনা করেন-কিন্তু ইহার একখানিও পাওয়া যায় নাই। ন্যায়কন্দলীর রচনাকাল ৯১৩ (অথবা ৯১০) শকাব্দ (৯৯১ অথবা ৯৮৮ অব্দ)।
জিনেন্দ্রবুদ্ধি, মৈত্রেয়রক্ষিত এবং বিমলমতি প্রভৃতি এই যুগের কয়েকজন বিখ্যাত বৈয়াকরণিক এবং অমরকোষের টীকাকার সুভূতিচন্দ্রকে কেহ কেহ বাঙ্গালী বলিয়া গ্রহণ করিয়াছেন কিন্তু ইহার সমর্থক সন্তোষজনক প্রমাণ এখনো কিছু পাওয়া যায় নাই।
বৈদ্যক শাস্ত্রে কয়েকজন বাঙ্গালী গ্রন্থকার প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। সুবিখ্যাত ‘রুগবিনিশ্চয়’ অথবা ‘নিদান’ গ্রন্থের প্রণেতা মাধব বাঙ্গালী ছিলেন কি না সন্দেহের বিষয়। কিন্তু চরক ও সুশ্রুতের প্রসিদ্ধ টীকাকার চক্রপাণিদত্ত যে বাঙ্গালী ছিলেন সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। তাঁহার ‘চিকিৎসা সংগ্রহ’ গ্রন্থে তিনি নিজের যে সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়াছেন তাহা হইতে জানা যায় যে তিনি লোধুবংশীয় কুলীন ছিলেন; তাঁহার পিতা নারায়ণ গৌড়াধিপের পাত্র ও রসবত্যধিকারী (অর্থাৎ রন্ধনশালার অধ্যক্ষ) [কেহ কেহ এই পদের পাঠান্তর কল্পনা করিয়া লিখিয়াছেন যে চক্রপাণিদত্ত নিজেই গৌড়াধিপের পাত্র ছিলেন], এবং তাঁহার ভ্রাতা একজন বিচক্ষণ চিকিৎসক ছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীতে শিবদাসসেন এই গ্রন্থের টীকায় লিখিয়াছেন যে উক্ত গৌড়াধিপ নয়পাল। ইহা সত্য হইলে চক্রপাণিদত্ত একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে অথবা প্রথমার্ধে জীবিত ছিলেন এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। তিনি চিকিত্সা সংগ্রহ এবং ‘আয়ুর্ব্বেদ দীপিকা’ নামক চরকের ও ‘ভানুমতী’ নামক সুশ্রুতের টীকা ব্যতীত ‘শব্দচন্দ্রিকা’ ও ‘দ্রব্যগুণ সংগ্রহ’ নামক আরও দুইখানি গ্রন্থ রচনা করেন। নিশ্চলকর ‘রত্নপ্রভা’ নামে ‘চিকিৎসা সংগ্রহের’ যে টীকা লিখিয়াছেন তাহাতে বহু বৈদ্যক গ্রন্থের উল্লেখ আছে। নিশ্চলকর খুব সম্ভবত বাঙ্গালী ছিলেন এবং তিনি সম্রাট রামপাল ও কামরূপ রাজার সাক্ষাতের যে বিবরণ দিয়াছেন তাহাতে মনে হয় যে তিনি রামপালের সমসাময়িক ছিলেন।
