মোটের উপর এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সপ্তম শতাব্দীর পূর্ব্বেই বাঙ্গালীর প্রতিভা সংস্কৃত সাহিত্যে একটি অভিনব রচনারীতির প্রবর্ত্তন করিয়াছিল। এই রচনারীতির কিছু কিছু নিদর্শন ত্রিপুরায় প্রাপ্ত লোকনাথের তাম্রশাসন ও নিধানপুরে প্রাপ্ত ভাস্করবর্ম্মার তাম্রশাসনে পাওয়া যায়। প্রথমটি পদ্যে ও দ্বিতীয়টি গদ্যে লিখিত। এ যুগে যে বাংলায় অনেক গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই–কিন্তু তাঁহার অধিকাংশই বিলুপ্ত হইয়াছে। যাহা আছে তাহাও এদেশীয় বলিয়া নিঃসন্দেহে গ্রহণ করার কোনো উপায় নাই।
এই যুগের কতকগুলি গ্রন্থ বাঙ্গালীর রচিত বলিয়া কেহ কেহ মত প্রকাশ করিয়াছেন। তাঁহার মধ্যে হস্ত্যায়ুর্ব্বেদ একখানি। চারি খণ্ডে ও ১৬০ অধ্যায়ে বিভক্ত এই বিশাল গ্রন্থে হস্তীর নানারূপ ব্যাধির আলোচনা করা হইয়াছে। ঋষি পালকাপ্য চম্পা নগরীতে অঙ্গদেশের রাজা রামপাদের নিকট ইহা বিবৃত করেন এবং ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে তাঁহার আশ্রম ছিল-উক্ত গ্রন্থে এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে। ইহা হইতে অনুমিত হয় যে, এই গ্রন্থ বাংলা দেশে লিখিত হইয়াছিল, কিন্তু ইহার রচনাকাল সম্বন্ধে পণ্ডিতগণ একমত নহেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ইহার তারিখ খৃষ্টপূর্ব্ব পঞ্চম বা ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্দেশ করিয়াছেন। কিন্তু ইহার সমর্থক কোনো প্রমাণ নাই। অমরকোষ ও অগ্নিপুরাণে এই গ্রন্থের উল্লেখ আছে এবং কালিদাসের রঘুবংশে সম্ভবত ইহার ইঙ্গিত করা হইয়াছে। ইহা সত্য হইলে হস্তায়ুর্ব্বেদ গ্রন্থ অন্তত কালিদাসের পূর্ব্ববর্ত্তী বলিয়া স্বীকার করিতে হয়। গ্রন্থ প্রণেতা ঋষি পালকাপ্য সম্ভবত কাল্পনিক নাম। এক হস্তিনীর গর্ভে তাঁহার জন্ম হইয়াছিল এরূপ কথিত হইয়াছে।
চান্দ্র ব্যাকরণ একখানি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। ইহার প্রণেতা চন্দ্রগোমিন্ সম্ভবত বাঙ্গালী ছিলেন। ইনি পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ শতাব্দীতে জীবিত ছিলেন, এবং পাণিনির সূত্রগুলি নূতন প্রণালীতে বিভক্ত করিয়া যে ব্যাকরণ গ্রন্থ ও তাঁহার বৃত্তি রচনা করেন তাহা সমগ্র ভারতবর্ষে বিশেষ খ্যাতি লাভ করে। কাশ্মীর, নেপাল, তিব্বত ও সিংহল দ্বীপে ইহার পঠনপাঠন বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল। চন্দ্রগোমিন্ বৌদ্ধ ছিলেন। তিব্বতীয় কিংবদন্তী অনুসারে ‘ন্যায়সিদ্ধালোক’ নামক দার্শনিক গ্রন্থ এবং ৩৬ খানি তন্ত্রশাস্ত্রের রচয়িতা চন্দ্রগোমিন্ ও উল্লিখিত বৈয়াকরণিক চন্দ্রগোমি একই ব্যক্তি; তিনি বরেন্দ্রভূমিতে এক ক্ষত্রিয় বংশে জন্মগ্রহণ করেন, তথা হইতে নির্বাসিত হইয়া চন্দ্রদ্বীপে বাস করেন এবং পরে নালন্দায় স্থিরমতির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ইহার সম্বন্ধে তিব্বতে যে সমুদয় আখ্যান প্রচলিত আছে একবিংশ পরিচ্ছেদে তাহা বিবৃত হইবে। চন্দ্রগোমিন্ উপরোক্ত গ্রন্থগুলি ব্যতীত তারা ও মঞ্জুশ্রীর স্তোত্র, ‘লোকানন্দ’ নাটক ও ‘শিষ্য-লেখ-ধৰ্ম্ম’ নামক একখানি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন বলিয়া প্রসিদ্ধি আছে। লোকানন্দ নাটকের তিব্বতীয় অনুবাদ মাত্র পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু শিষ্য-লেখ-ধর্ম্মের মূল ও অনুবাদ উভয়ই বর্ত্তমান।
প্রসিদ্ধ দার্শনিক গৌড়পাদ সম্ভবত বাঙ্গালী ছিলেন-কারণ তিনি গৌড়াচাৰ্য্য নামে অভিহিত হইয়াছেন। প্রচলিত প্রবাদ অনুসারে ইনি শঙ্করাচার্য্যের পরমগুরু অর্থাৎ গুরুর গুরু ছিলেন। ইহার রচিত আগম-শাস্ত্র ‘গৌড়পাদকারিকা’ নামে পরিচিত। ইহার দার্শনিক তথ্য শঙ্করের পূর্ব্বে প্রচলিত বেদান্ত মতবাদ ও মাধ্যমিক শূন্যবাদের সমন্বয়; ইহার কোনো কোনো অংশে বৌদ্ধ প্রভাব লক্ষিত হয়। গৌড়পাদ এতদ্ব্যতীত ঈশ্বরকৃষ্ণ রচিত সাংখ্যকারিকার টীকা করেন; মাঠরবৃত্তির সহিত ইহার অনেক সাদৃশ্য আছে।
চন্দ্রগোমিন্ ও গৌড়পাদ ব্যতীত এই যুগের আর কোনো বাঙ্গালি গ্রন্থকারের নাম এ পর্য্যন্ত পাওয়া যায় নাই। কিন্তু এ যুগে যে বাংলায় বহু সংস্কৃত কবি ও পণ্ডিত জন্মিয়াছিলেন এবং তাঁহাদের গ্রন্থ ভারতবর্ষের সর্বত্র প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল বাণভট্ট, ভামহ ও দণ্ডী এবং চীনদেশীয় পরিব্রাজকগণের লেখা হইতে তাহা আমরা নিঃসন্দেহে জানিতে পারি।
.
৩. পালযুগে সংস্কৃত সাহিত্য
পালরাজগণের বহুসংখ্যক তাম্রশাসনে যে সমুদয় সংস্কৃত শ্লোক আছে তাহা হইতে প্রমাণিত হয় যে এই যুগে বাংলায় সংস্কৃত কাব্য চর্চ্চা ও কাব্য রচনা আরও প্রসার লাভ করিয়াছিল। সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যান্য বিভাগেও যে এই যুগে বাঙ্গালীরা পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন এই সমুদয় তাম্রশাসনে তাঁহারও প্রকৃষ্ট প্রমাণ আছে। নারায়ণপালের মন্ত্রী গুরবমিশ্র তাঁহার পূর্ব্বপুরুষগণের প্রশস্তিতে লিখিয়াছেন যে দেবপালের মন্ত্রী দৰ্ভপাণি চতুর্বেদে ব্যুৎপন্ন ছিলেন ও কেদারমিশ্র চতুর্বিদ্যাপয়োধি পান করিয়াছিলেন। তিনি নিজে বেদ, আগম, নীতি ও জ্যোতিষশাস্ত্রে পারদর্শিতা ও বেদের ব্যাখ্যা দ্বারা প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। এইরূপে পালযুগের অন্যান্য তাম্রশাসনে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির বৈদিক সাহিত্য, মীমাংসা, ব্যাকরণ, তর্ক, বেদান্ত ও প্রমাণশাস্ত্রে পাণ্ডিত্যের কথা লিপিবদ্ধ হইয়াছে। চতুর্ভুজ তাঁহার হরিচরিত কাব্যে লিখিয়াছেন যে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণগণ শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ, ব্যাকরণ ও কাব্যে বিচক্ষণ ছিলেন। হরিবৰ্ম্মদেবের মন্ত্রী ভট্টভবদেবের কথা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। প্রশস্তিকার লিখিয়াছেন যে, তিনি দর্শন, মীমাংসা, অর্থশাস্ত্র, ধর্ম্মশাস্ত্র, আয়ুর্ব্বেদ, অস্ত্রবেদ, সিদ্ধান্ত, তন্ত্র এবং গণিতে পারদর্শী ছিলেন এবং হোরাশাস্ত্রে গ্রন্থ লিখিয়া ‘দ্বিতীয় বরাহ’ উপাধি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। বিভিন্ন তাম্রশাসনে ভূমিদান-গ্রহণকারী ব্রাহ্মণগণের যে পরিচয় আছে তাহা হইতে তাঁহাদের বেদের বিভিন্ন শাখায় পাণ্ডিত্য ও বৈদিক ক্রিয়াকলাপে প্রচুর জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়।
