বাংলার শাসনপদ্ধতি সম্বন্ধে যাহা বলা হইল তাহা অতিশয় সামান্য এবং ইহা হইতে এ সম্বন্ধে স্পষ্ট বা সঠিক কোনো ধারণা করা কঠিন। কিন্তু আপাতত ইহার বেশী জানিবার উপায় নাই। তবে যেটুকু জানা গিয়াছে তাহা হইতে এরূপ সিদ্ধান্ত করা যায় যে বাংলায় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দী বা তাঁহার পূৰ্ব্ব হইতেই ধীরে ধীরে একটি বিধিবদ্ধ শাসনপ্রণালী গড়িয়া উঠিয়াছিল এবং পাল ও সেনযুগে তাহা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ইহা ভারতের অন্যান্য প্রদেশের শাসনপদ্ধতির অনুরূপ ছিল বলিয়াই মনে হয়। অন্তত বাংলা দেশ যে এই বিষয়ে কম অগ্রসর হইয়াছিল এরূপ মনে করিবার কোনো সঙ্গত কারণ নাই।
১৬. ভাষা ও সাহিত্য
১৬. ষোড়শ পরিচ্ছেদ –ভাষা ও সাহিত্য
১. বাংলা ভাষার উৎপত্তি
সৰ্ব্বপ্রাচীন যুগে আর্য্যগণ যে ভাষা ব্যবহার করিতেন, এবং যে ভাষায় বৈদিক গ্রন্থাদি লিখিত হইয়াছিল, কালপ্রভাবে তাঁহার অনেক পরিবর্ত্তন হয়, এবং এই পরিবর্ত্তনের ফলেই ভারতবর্ষে প্রাচীন ও বর্ত্তমানকালে প্রচলিত বহু ভাষার উদ্ভব হইয়াছে। এই ভাষা-বিবর্ত্তনের সুদীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনা করা এই গ্রন্থে সম্ভবপর নহে। তবে নিম্নলিখিত তিনটি শ্রেণীবিভাগ হইতে এ সম্বন্ধে কতক ধারণা করা যাইবে।
১। প্রাচীন সংস্কৃত ঋগ্বেদের সময় হইতে ৬০০ খৃ. পূ. পৰ্য্যন্ত
২। পালি-প্রাকৃত-অপভ্রংশ–৬০০ খৃ. পূ.-১০০০ খৃষ্টাব্দ।
৩। অপভ্রংশ হইতে বাংলা ও অন্যান্য দেশীয় ভাষার উৎপত্তি-১০০০ খৃষ্টাব্দ হইতে
আৰ্য্যগণ বাংলায় আসিবার পূর্ব্বে বাংলার অধিবাসীগণ যে ভাষার ব্যবহার করিতেন তাঁহার কোনো নিদর্শন বর্ত্তমান নাই। তবে ইহার কোনো কোনো শব্দ বা রচনাপদ্ধতি যে সংস্কৃত ও বর্ত্তমান বাংলায় আত্মগোপন করিয়া আছে তাহা খুবই সম্ভব, এবং ইহার কিছু কিছু চিহ্নও পণ্ডিতগণ আবিষ্কার করিয়াছেন। ভাষাতত্ত্বের দিক দিয়া ইহার মূল্য খুব বেশী হইলেও বর্ত্তমান প্রসঙ্গে এই আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। যত দূর প্রমাণ পাওয়া যায় তাহাতে অনুমিত হয় যে আর্য্যগণের সংস্পর্শে ও প্রভাবে বাংলার প্রাচীন অধিবাসীগণ নিজেদের ভাষা ত্যাগ করিয়া সম্পূর্ণভাবে আৰ্যভাষা গ্রহণ করেন। উপরে যে শ্ৰেণীভাগ করা হইয়াছে তাহা হইতে দেখা যাইবে যে, যে যুগে আর্য্যগণ এদেশে বসবাস করিতে আরম্ভ করেন তখন প্রাচীন সংস্কৃত হইতে প্রথমে পালি এবং প্রাকৃত ও পরে অপভ্রংশ, এই তিন ভাষার উৎপত্তি হয়। বাংলা দেশেও এই সমুদয় ভাষা প্রচলিত ছিল, কিন্তু ইহাতে কোনো সাহিত্য রচিত হইয়া থাকিলেও তাঁহার বিশেষ কোনো নিদর্শন বর্ত্তমান নাই। অপভ্রংশ হইতে বাংলা প্রভৃতি দেশীয় ভাষার উৎপত্তি হইয়াছে। বাংলার যে সৰ্ব্বপ্রাচীন দেশী ভাষার নমুনা পাওয়া গিয়াছে তাহা দশম শতাব্দীর পূর্ব্বেকার বলিয়া পণ্ডিতগণ মনে করেন না। এই ভাষা হইতেই কালে বর্ত্তমান বাংলা ভাষার সৃষ্টি হইয়াছে, কিন্তু সে হিন্দু যুগের পরের কথা। এই দেশীয় ভাষায় রচিত যে কয়েকটি পদ পাওয়া গিয়াছে তাঁহার সংখ্যা বেশী নহে। কিন্তু ইহা ছাড়া হিন্দযুগে বাঙ্গালীর সাহিত্য প্রধানত সংস্কৃত ভাষায়ই রচিত হইয়াছিল। সুতরাং প্রথমে বাংলার সংস্কৃত সাহিত্যেরই আলোচনা করিব।
.
২. পালযুগের পূৰ্ব্বেকার সংস্কৃত সাহিত্য
মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত বাংলার সৰ্ব্বপ্রাচীন প্রস্তরলিপি প্রাকৃত ভাষায় লিখিত। ইহাই বাংলায় মৌর্যযুগের একমাত্র সাহিত্যিক নিদর্শন। ইহার পাঁচশত বৎসরেরও অধিক পরে সুসুনিয়া পৰ্ব্বতগাত্রে উত্তীর্ণ রাজা চন্দ্রবর্ম্মার লিপি ও গুপ্তযুগের তাম্রশাসনগুলি, সংস্কৃত ভাষায় রচিত। ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে, এবং সম্ভবত তাঁহার বহু পূর্ব্বেই, এদেশে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের যথেষ্ট চর্চ্চা ছিল, কিন্তু এই যুগের অন্য কোনো রচনা এ পর্য্যন্ত পাওয়া যায় নাই। বাংলা দেশে যে উচ্চশিক্ষা ও বিদ্যাচর্চ্চার বিশেষ প্রসার ছিল, চীন পরিব্রাজক ফাহিয়ান (৫ম শতাব্দী), হুয়েন সাং ও ই-সিং (৭ম শতাব্দী) তাঁহার বিশেষ উল্লেখ করিয়াছেন।
এই চর্চ্চার ফলে সপ্তম শতাব্দীতে বাংলার সংস্কৃত সাহিত্য একটি বিশিষ্ট রূপ ধারণ করিয়াছিল। বাণভট্টের একটি প্রসিদ্ধ শ্লোকে উক্ত হইয়াছে যে উৎকৃষ্ট সাহিত্যের যে সমুদয় আদর্শ গুণ তাঁহার সবগুলি একত্রে কোনো দেশেই প্রায় দেখা যায় না, কিন্তু এক এক দেশের সাহিত্যে এক একটি গুণ প্রকটিত হয়; যেমন উত্তর দেশীয় সাহিত্যে ‘শ্লেষ’, পাশ্চাত্যে ‘অর্থ’, দক্ষিণে ‘উৎপ্রেক্ষা’ এবং গৌড়দেশে ‘অক্ষর-ডম্বর’। কেহ কেহ এই শ্লোক হইতে সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে গৌড়দেশের রাজা শশাঙ্কের ন্যায় গৌড়দেশীয় সাহিত্যকেও বাণভট্ট বিদ্বেষের চক্ষে দেখিতেন এবং এই শ্লোকে তাঁহার নিন্দাই করিয়াছেন। কিন্তু এই অনুমান সঙ্গত বলিয়া মনে হয় না। শব্দ-বিন্যাস সাহিত্যের অন্যতম গুণ, এবং গৌড়ীয় সাহিত্যে যে শ্লেষ, অর্থ ও উৎপ্রেক্ষা অপেক্ষা এই গুণেরই প্রাচুর্য দেখিতে পাওয়া যায় ইহা ব্যক্ত করাই সম্ভবত বাণভট্টের অভিপ্রায় ছিল। ভামহ ও দণ্ডী (৭ম ও ৮ম শতাব্দী) যেভাবে গৌড় মার্গ ও গৌড়ী রীতির উল্লেখ করিয়াছেন তাহাও উপরোক্ত অনুমানের সমর্থন করে। তাঁহাদের মতে তখন সংস্কৃত কাব্যে গৌড়ী ও বৈদভী এই দুইটিই প্রধান রীতি ছিল। ভামহের মতে গৌড়ী এবং দণ্ডীর মতে বৈদভী ইহাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
