৭। সৈনিক বিভাগ-এই বিভাগে অধ্যক্ষের উপাধি ছিল সেনাপতি অথবা মহাসেনাপতি। পদাতিক, অশ্বারোহী, হস্তী, উষ্ট্র ও রণতরী সৈন্যদলের এই কয়টি প্রধান বিভাগ ছিল। ইহার প্রত্যেকের জন্য একজন স্বতন্ত্র অধ্যক্ষ ছিল। এতদ্ব্যতীত ‘কোট্টপাল’ (দুর্গরক্ষক), ‘প্রান্তপাল’ (রাজ্যের সীমান্তরক্ষক) প্রভৃতি নামও পাওয়া যায়।
বাংলা দেশে, বিশেষত দক্ষিণ ও পূর্ব্ববঙ্গে, রণতরী যুদ্ধসজ্জার একটি প্রধান উপকরণ ছিল। বহু প্রাচীনকাল হইতেই বাংলার নৌবাহিনী প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল! কালিদাস রঘুবংশে ইহার উল্লেখ করিয়াছেন। বাংলার প্রাচীন লিপিতেও তরীর উল্লেখ আছে। কুমারপাল ও বিজয়সেনের রাজত্বে যে নৌযুদ্ধ হইয়াছিল তাহা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। বাংলার সামরিক হস্তীর প্রসিদ্ধিও প্রাচীনকাল হইতে প্রচলিত। ভারতের পূৰ্ব্বপ্রান্তে বহু হস্তী পাওয়া যাইত এবং এখনো যায়। কিন্তু বাংলায় উৎকৃষ্ট অশ্বের অভাব ছিল। পালরাজগণ সুদূর কামোজ হইতে যুদ্ধের অশ্ব সংগ্রহ করিতেন। ভারতের এই প্রদেশ চিরকালই অশ্বের জন্য প্রসিদ্ধ। পালরাজগণের একখানিমাত্র তাম্রশাসনে রথের উল্লেখ আছে। কিন্তু এই যুগের যুদ্ধে রথের খুব ব্যবহার হইত না।
পালরাজগণের তাম্রশাসনে অমাত্যগণের তালিকার শেষে “গৌড়-মালব-খশ-হূণ-কুলিক-কর্ণাট-লাট” প্রভৃতি জাতির উল্লেখ আছে। খুব সম্ভবত ভারতের এই সমুদয় জাতি হইতে পালরাজগণ সৈন্য সংগ্রহ করিতেন এবং বর্ত্তমানকালের মারহাট্টা, বেলুচি, গুর্খা রেজিমেন্টের ন্যায় ঐ সমুদয় ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় সৈন্য দ্বারা সৈন্যদল গঠিত হইত।
.
৪. সেনরাজ্য ও অন্যান্য খরাজ্য
পালরাজ্যের যে শাসনপদ্ধতি প্রচলিত হইয়াছিল তাহা মোটামুটিভাবে সেন, কাম্বোজ, চন্দ্র বর্ম্মবংশীয় রাজগণ গ্রহণ করিয়াছিলেন। অবশ্য কোনো কোনো বিষয়ে কিছু কিছু পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছিল।
ভুক্তি, মণ্ডল ও বিষয় ব্যতীত পাঠক, চতুর, আবৃত্তি প্রভৃতি কয়েকটি নূতন শাসনকেন্দ্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেনরাজ্য পুণ্ড্রবর্দ্ধন ভুক্তির সীমা অনেক। বাড়িয়েছিল। বঙ্গ-বিভাগের পূর্ব্ববর্ত্তী রাজসাহী, ঢাকা ও প্রেসিডেন্সী বিভাগ এবং সম্ভবত বর্ত্তমানকালের চট্টগ্রাম বিভাগেরও কতক অংশ এই ভুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ ইহা উত্তরে হিমালয় হইতে দক্ষিণে সমুদ্র এবং পশ্চিমে ভাগীরথী হইতে মেঘনা অথবা তাঁহার পূৰ্ব্বভাগের প্রদেশ পর্য্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল। অপর দিকে বর্দ্ধমান ভুক্তির সীমা কমাইয়া ইহার উত্তর অংশে কঙ্কগ্রাম নামে নূতন একটি ভুক্তি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল।
সেনবংশীয় লক্ষ্মণসেন ও তাঁহার পুত্রগণ পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ ব্যতীত ‘অশ্বপতি, গজপতি, নরপতি, রাজত্রয়াধিপতি’ প্রভৃতি নূতন পদবীও গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহাদের অনুকরণে দেববংশীয় দশরথদেবও এই সমুদয় উপাধি ব্যবহার করিতেন।
পালরাজগণের ন্যায় সেনরাজগণের তাম্রশাসনেও সামন্ত, অমাত্য প্রভৃতির সুদীর্ঘ তালিকা পাওয়া যায়। কিন্তু ইহার মধ্যে কিছু কিছু নূতনত্ব আছে। সেনরাজগণের তালিকায় রাণীর নাম আছে কিন্তু পালরাজগণের একখানি তাম্রশাসনেও এই সুদীর্ঘ তালিকায় রাণীর নাম পাওয়া যায় না। চন্দ্র, বৰ্ম ও কামোজ রাজগণের তাম্ৰশাসনোক্ত তালিকায়ও রাণীর নাম পাওয়া যায়। এই যুগে রাজ্যশাসন বিষয়ে রাণীর কোনো বিশেষ ক্ষমতা ছিল, অথবা বাংলার বাহির হইতে আগত এই সমুদয় রাজবংশের আদিম বাসস্থানে রাণীর বিশেষ কোনো অধিকার ছিল বলিয়া তাঁহারা বাংলায় এই নূতন প্রথার প্রবর্ত্তন করিয়াছিলেন, তাহা বলা কঠিন। কাম্বোজ, বৰ্ম্ম ও সেনরাজবংশের তাম্রশাসনে পুরোহিতের নাম পাওয়া যায়। সেনরাজগণের শেষযুগে পুরোহিতের স্থানে মহাপুরোহিতের উল্লেখ আছে। ব্রাহ্মণ্য-ধর্ম্মাবলম্বী এই তিন রাজবংশের রাজ্যকালে হিন্দুধর্ম্ম ও সমাজের সহিত রাজশক্তির সম্বন্ধ যে পূৰ্ব্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ হইয়াছিল ইহা তাহাই সূচিত করে।
‘মহামুদ্ৰাধিকৃত’ ও ‘মহাসর্ব্বাধিকৃত’ নামে দুইজন নূতন উচ্চপদস্থ অমাত্যের নাম পাওয়া যায়। এই শেষোক্ত নাম হইতেই বাংলার ‘সর্ব্বাধিকারী’ পদবীর উদ্ভব হইয়াছে বলিয়া বোধ হয়। এইরূপ বিচার বিভাগে মহাধর্ম্মাধ্যক্ষ, রাজস্ব বিভাগে ‘হট্টপতি’ এবং সৈন্য বিভাগে ‘মহাপীলুপতি’, ‘মহাগণস্থ’ এবং ‘মহাব্যুহপতি’ প্রভৃতি আরও কয়েকটি নূতন নাম পাই।
কামোজরাজ নয়পালের তাম্রশাসনে যেভাবে অমাত্যগণের উল্লেখ আছে তাহা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। এই তালিকায় আছে “করণসহ অধ্যক্ষবর্গ; সৈনিক-সঙ্ মুখ্যসহ সেনাপতি; গূঢ়পুরুষসহ দূত; এবং মন্ত্রপাল”। “করণসহ অধ্যক্ষবর্গ” এই সমষ্টিসূচক শব্দ হইতে প্রমাণিত হয় যে একজন অধ্যক্ষ কয়েকজন করণ অর্থাৎ কেরাণীর সহযোগে একটি শাসন বিভাগ তদন্ত করিতেন, এবং নির্দিষ্টসংখ্যক এইরূপ কতকগুলি অধ্যক্ষের দ্বারা দেশের সমুদয় আভ্যন্তরিক শাসনের কাৰ্যনিৰ্বাহ হইত। সৈন্য বিভাগেও বিভিন্ন শ্রেণীর সৈন্যদলের সঙ্ ছিল এবং তাহাদের অধিনায়কদের সহযোগে সেনাপতি এই বিভাগের কাৰ্য্য নিৰ্বাহ করিতেন। পররাষ্ট্র বিভাগ স্বতন্ত্র ছিল এবং ‘দূত’, ‘গূঢ়পুরুষ’ (গুপ্তচর) গণের সহায়তায় ইহার কাৰ্য্য নিৰ্বাহ করিতেন। সর্বোপরি ছিলেন মন্ত্রপাল’ অর্থাৎ মন্ত্রীগণ। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে যে শাসনপদ্ধতির বর্ণনা আছে ইহার সহিত তাঁহার খুবই সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। চন্দ্র, বৰ্ম ও সেনরাজগণের তাম্রশাসনে অমাত্যের যে সুদীর্ঘ তালিকা আছে। তাঁহার যে “এবং অধ্যক্ষ-প্রচারোক্ত অন্যান্য কর্ম্মচারীগণ” এই উক্তি দেখিতে পাওয়া যায়। অর্থশাস্ত্রের যে অধ্যায়ে শাসনপদ্ধতির বিবরণ আছে তাঁহার নাম ‘অধ্যক্ষপ্রচার’। এই সমুদয় কারণে এরূপ অনুমান করা অসঙ্গত হইবে না যে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের যে শাসনপদ্ধতি বর্ণিত আছে তাঁহার অনুকরণেই বাংলার শাসনপদ্ধতি গড়িয়া উঠিয়াছিল।
