পরাক্রান্ত পাল সম্রাটগণ প্রাচীন বাংলার মহারাজ বা পরবর্ত্তীকালের ‘মহারাজাধিরাজ’ পদবীতে সন্তুষ্ট থাকেন নাই। গুপ্ত সম্রাটগণের ন্যায় তাঁহারাও পরমেশ্বর, পরমভট্টারক, মহারাজাধিরাজ প্রভৃতি গৌরবময় উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহাদের রাজ্য বহু বিস্তৃত হওয়ায় শাসনপ্রণালীরও তদনুরূপ পরিবর্ত্তন হইয়াছিল। এই সময় হইতেই রাজত্বের সমুদয় ব্যাপারে প্রভূত ক্ষমতাসম্পন্ন একজন প্রধানমন্ত্রীর উল্লেখ দেখিতে পাই। গর্গ নামে এক ব্রাহ্মণ ধৰ্ম্মপালের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন–তারপর তাঁহার বংশধরগণই নারায়ণপালের রাজ্য পৰ্য্যন্ত প্রায় একশত বৎসর যাবৎ এই পদে নিযুক্ত ছিলেন। এই বংশীয় গুরবমিশ্রের একখানি শিলালিপিতে উক্ত হইয়াছে যে ম্রাট দেবপাল স্বয়ং তাঁহার মন্ত্রী দর্ভপাণির অবসরের অপেক্ষায় তাঁহার দ্বারদেশে দণ্ডায়মান থাকিতেন, এবং এই দর্ভপাণি ও তাঁহার পৌত্র কেদারমিশ্রর নীতিকৌশলে ও বুদ্ধিবলেই বৃহৎ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। এই সমুদয় উক্তি অতিরঞ্জিত হইলেও পালরাজ্যে প্রধানমন্ত্রীগণ যে অসাধারণ প্রভুত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। পরবর্ত্তী যুগে এইরূপ আর এক মন্ত্রীবংশের পরিচয় পাই। এই বংশীয় যোগদেব তৃতীয় বিগ্রহপালের এবং বৈদ্যদেব কুমারপালের মন্ত্রী ছিলেন। বৈদ্যদেব পরে কামরূপে এক স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন।
গুপ্তযুগের ন্যায় পালরাজ্যের অধীনেও অনেক সামন্ত রাজা ছিলেন। ইহাদের মধ্যে রাজা, রাজন্যক, রাজনক, রাণক, সামন্ত ও মহাসামন্ত প্রভৃতি বহু শ্রেণীবিভাগ ছিল। কেন্দ্রীয় রাজশক্তি দুর্বল হইলে এই সমুদয় সামন্তরাজগণ যে স্বাধীন রাজার ন্যায় ব্যবহার করিতেন রামপালের প্রসঙ্গে তাহা বর্ণিত হইয়াছে।
প্রাচীন ভারতে রাজগণ রাজ্যের শাসন সংরক্ষণ ব্যতীত সমাজ ও অর্থনীতি, এমনকি ধর্ম্মের ব্যাপারেও হস্তক্ষেপ করিতেন। ধর্ম্মপাল শাস্ত্রানুসারে বর্ণাশ্রম ধৰ্ম্ম প্রতিপালন করিতেন। তিনি নিজে বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী হইলেও হিন্দু প্রজাগণকে তাঁহাদের ধর্ম্মব্যবস্থা অনুসারেই শাসন করিতেন। পালরাজগণের প্রধানমন্ত্রীগণও যে ব্রাহ্মণবংশীয় ছিলেন ইহাও সে যুগের ধর্ম্মমত বিষয়ে উদারতা প্রমাণিত করে।
পালরাজগণের তাম্রশাসনে রাজকর্ম্মচারীগণের যে সুদীর্ঘ তালিকা আছে তাহা হইতে বেশ বোঝা যায় যে, রাজ্যশাসনপ্রণালী বিধিবদ্ধ ও সুনিয়ন্ত্রিত ছিল। দুঃখের বিষয় এই সমুদয় রাজকর্ম্মচারীগণের অনেকের সম্বন্ধেই আমাদের কিছু জানা নাই। তাহাদের নাম বা উপাধি হইতে যেটুকু অনুমান করা যায় তাহা ব্যতীত শাসনপ্রণালী ও বিভিন্ন কর্ম্মচারীর কর্তব্য ও ক্ষমতা সম্বন্ধে আর কিছুই জানিবার উপায় নাই। এই কর্ম্মচারীর তালিকা বিশ্লেষণ করিয়া যে সামান্য তথ্য পাওয়া যায় এখানে মাত্র তাঁহারই উল্লেখ করিতেছি।
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বর্ণিত শাসনপ্রণালীতে দেখিতে পাই যে রাজ্যের সমুদয় শাসনকাৰ্য্য নিৰ্ব্বাহের জন্য কতকগুলি নির্দিষ্ট শাসন বিভাগ ছিল এবং ইহার প্রত্যেকটির জন্য একজন অধ্যক্ষ নিযুক্ত হইতেন। পালরাজগণও মোটামুটি এই ব্যবস্থার অনুসরণ করিতেন। কয়েকটি প্রধান প্রধান শাসন বিভাগ ও তাঁহার কর্ম্মচারীগণের সম্বন্ধে যাহা জানা যায় তাহা সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ হইল।
১। কেন্দ্রীয় শাসন-প্রধানমন্ত্রী এবং আরও অনেক মন্ত্রী ও অমাত্যের সাহায্যে রাজা স্বয়ং এই বিভাগ পরিচালনা করিতেন। এই সমুদয়ের মধ্যে ‘মহাসান্ধিবিগ্ৰহিক’ একজন প্রধান অমাত্য ছিলেন। অপর রাজ্যের সহিত সম্বন্ধ রক্ষা করাই ছিল তাঁহার কাজ। দূতও একজন প্রধান কর্ম্মচারী ছিলেন এবং বিদেশীয় রাজ্যের সহিত প্রত্যক্ষভাবে যোগসূত্র রক্ষা করিতেন। ‘রাজস্থানীয়’ ও ‘অঙ্গরক্ত’ নামে দুইজন অমাত্যের উল্লেখ আছে। ইহারা সম্ভবত যথাক্রমে রাজার প্রতিনিধি ও দেহরক্ষীর দলের নায়ক ছিলেন। অনেক সময়, বিশেষত রাজা বৃদ্ধ হইলে, যুবরাজ শাসন বিষয়ে পিতাকে সাহায্য করিতেন। পালরাজগণের লিপিতে ও রামচরিতে যুবরাজগণের উল্লেখ আছে।
২। রাজস্ব বিভাগ-বিভিন্ন প্রকার রাজস্ব আদায়ের জন্য বিভিন্ন শ্রেণীর কর্ম্মচারী নির্দিষ্ট ছিল। উৎপন্ন শস্যের উপর নানাবিধ কর ধার্য্য হইত, যথা, ভাগ, ভোগ, কর, হিরণ্য, উপরিকর প্রভৃতি,-এবং সম্ভবত গ্রামপতি ও বিষয়পতিরাই ইহা সংগ্রহ করিতেন। ‘ষষ্ঠাধিকৃত’ নামে একজন কর্ম্মচারীর উল্লেখ আছে। মনুস্মৃতি অনুসারে কতকগুলি দ্রব্যের ষষ্ঠভাগ রাজার প্রাপ্য ছিল,-সম্ভবত উক্ত কর্ম্মচারী এই কর আদায় করিতেন। ‘চৌরোদ্ধরণিক’, ‘শৌল্কিক’, ‘দাশাপরাধিক’ ও ‘তরক’ নামক কর্ম্মচারীরা সম্ভবত যথাক্রমে, দস্যু ও তস্করের ভয় হইতে রক্ষার জন্য দেয় কর, বাণিজ্যদ্রব্যের শুল্ক, চৌৰ্যাদি অপরাধের নিমিত্ত অর্থদণ্ড এবং খেয়াঘাটেরও মাশুল আদায় করিতেন।
৩। ‘মহাক্ষপটলিক’ ও ‘জ্যেষ্ঠকায়স্থ’ সম্ভবত হিসাব ও দলিল বিভাগ পর্যবেক্ষণ করিতেন।
৪। ‘ক্ষেত্রপ’ ও ‘প্রমাতৃ’ সম্ভবত জমির জরিপ বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন।
৫। ‘মহাদণ্ডনায়ক’ অথবা ‘ধর্ম্মাধিকার’ বিচার বিভাগের কর্ত্তা ছিলেন।
৬। মহাপ্রতীহার’, ‘দাণ্ডিক’, ‘দাপাশিক’ ও ‘দণ্ডশক্তি সম্ভবত পুলিশ বিভাগের প্রধান কর্ম্মচারী ছিলেন।
