মৌৰ্য্যযুগের একখানিমাত্র লিপি মহাস্থানগড়ে অর্থাৎ প্রাচীন পুণ্ড্রবর্দ্ধনে পাওয়া গিয়াছে। ইহাতে একজন মহামাত্রের উল্লেখ আছে। এই লিপির প্রকৃত মৰ্ম্ম কী তাহা লইয়া পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ আছে। দুর্ভিক্ষ বা অন্য কোনো কারণবশত প্রজাগণের দুরাবস্থা হওয়ায় সরকারী ভাণ্ডার (কোষাগার) হইতে দুস্থ লোকদিগকে শস্য ও নগদ টাকা ধার দিয়া সাহায্য করার আদেশই এই লিপিতে উক্ত হইয়াছে। খুব সম্ভবত মৌর্যগণের সুপরিচিত রাজ্যশাসনপদ্ধতি বাংলা দেশেও প্রচলিত ছিল।
.
২. গুপ্তসাম্রাজ্য ও অব্যবহিত পরবর্ত্তী যুগ
বাংলা দেশ গুপ্তসাম্রাজ্যভুক্ত হইলেও ইহার এক অংশমাত্র গুপ্ত সম্রাটগণের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে ছিল। শাসনকার্য্যের সুবিধার জন্য এই অংশে বর্ত্তমান কালের ন্যায় কতকগুলি নির্দিষ্ট শাসন বিভাগ ছিল। সৰ্ব্বাপেক্ষা বড় বিভাগের নাম ছিল ভুক্তি। প্রত্যেক ভুক্তি কতকগুলি বিষয়, মণ্ডল, বীথি ও গ্রামে বিভক্ত ছিল। বঙ্গ বিভাগের পূর্ব্বে বাংলার যে অংশকে আমরা রাজসাহী বিভাগ বলিতাম মোটামুটি তাহাই ছিল পুণ্ড্রবর্দ্ধন ভুক্তির সীমা। প্রাচীন ভুক্তি ও বর্ত্তমান বর্দ্ধমান বিভাগও মোটামুটি একই বলা যাইতে পারে। বিষয়গুলি ছিল বর্ত্তমান জিলার মতো।
গুপ্ত সম্রাট স্বয়ং ভুক্তির শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিতেন-ইহার উপাধি ছিল উপরিক মহারাজ। সাধারণত উপরিক-মহারাজই অধীনস্থ বিষয়গুলির শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিতেন, কিন্তু কোনো কোনো স্থলে স্বয়ং সম্রাট কর্ত্তৃক তাঁহাদের নির্বাচনের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহাদের নানা উপাধি ছিল,–কুমারামাত্য, আযুক্তক, বিষয়পতি প্রভৃতি। ইহা ভিন্ন আরও বহুসংখ্যক কাজকর্ম্মচারীর নাম পাওয়া যায়।
ভুক্তি, বিষয়, বীথি প্রভৃতি প্রত্যেক বিভাগেরই একটি কেন্দ্র ছিল এবং সেখানে তাহাদের একটি অধিকরণ (আফিস) থাকিত। তাম্রপট্টে উৎকীর্ণ কতকগুলি ভূমি বিক্রয়ের দলিল হইতে এই সমুদয় অধিকরণের কিছু কিছু বিবরণ জানিতে পাওয়া যায়। ইহার কয়েকখানিতে কোটিবর্ষ বিষয়ের অধিকরণের উল্লেখ আছে। কোটিবর্ষ নগরীর ধ্বংসাবশেষ বর্ত্তমানকালে বাণগড় নামে পরিচিত। এই নগরীর নাম অনুসারেই উক্ত বিষয়ের নামকরণ হইয়াছিল এবং এখানেই এই বিষয়ের অধিকরণ অবস্থিত ছিল। বিষয়পতি ব্যতীত এই অধিকরণের আর চারিজন বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন। তাঁহারা নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম সার্থবাহ, প্রথম কুলিক ও প্রথম কায়স্থ। এই চারিটি পদবীর প্রকৃত অর্থ নিরূপণ করা দুরূহ। সম্ভবত প্রথম তিনটি ধনী মহাজন, বণিক ও শিল্পীগণের প্রতিনিধিস্বরূপ অধিকরণের সদস্য ছিলেন। কায়স্থ শব্দে লেখক ও এক শ্রেণীর রাজকর্ম্মচারী বুঝাইত। সেকালে ধনী মহাজন, বণিক ও শিল্পীগণের বিধিবদ্ধ সংঘ-প্রতিষ্ঠান ছিল। এই সমুদয় সংঘ-মুখ্যগণই সম্ভবত বিষয় অধিকরণের সদস্য হইতেন। ইহা হইতে সেকালের স্বায়ত্তশাসন প্রথার মূল কত দৃঢ় ছিল তাহা বুঝা যায়। প্রতি বিষয়পতি এই সমুদয় বিভিন্ন সংঘের প্রতিনিধির মিলিত হইয়া বিষয়ের কাৰ্য্য নিৰ্ব্বাহ করিতেন। কী প্রণালীতে এই সমুদয় অধিকরণ জমি বিক্রয় করিত তাঁহার বিবরণ পূৰ্ব্বোক্ত তাম্রশাসনগুলি হইতে জানা যায়। প্রথমে ক্রেতা অধিকরণের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া কী উদ্দেশ্যে কোনো জমি কিনিতে চান তাহা নিবেদন করিতেন। তখন অধিকরণের আদেশে পুস্তপাল নামক একজন কর্ম্মচারী ঐ জমি সম্বন্ধে অনুসন্ধান করিয়া উহা বিক্রয় করা যাইতে পারে কি না এবং উহার মূল্য কত প্রভৃতি বিষয় অধিকরণের গোচর করিতেন। তারপর নির্ধারিত মূল্য দেওয়া হইলে ক্রেতা জমির অধিকার পাইতেন। কোনো কোনো স্থলে দেখা যায় যে এই জমি বিক্রয়ের কথা পার্শ্ববর্ত্তী গ্রামবাসীগণকে জানানো হইত এবং গ্রামের মহত্তর (মাতব্বর) ও কুটুম্বিগণের (গৃহস্থ) সাক্ষাতে জমি মাপিয়া তাঁহার সীমা নির্দিষ্ট করা হইত।
বাংলার যে অংশ প্রত্যক্ষভাবে গুপ্ত সম্রাটগণের শাসনাধীনে ছিল না তাহা সামন্ত মহারাজগণের অধীনে ছিল। সম্ভবত যে সমুদয় স্বাধীন রাজ্য গুপ্তগণের পদানত হইয়াছিল তাহাদের রাজারাই গুপ্তগণের অধীনস্থ সামন্তরাজরূপে পরিগণিত হইয়াছিলেন। ইঁহাদের বিভিন্ন উপাধি দেখিয়া অনুমিত হয় যে ইহারা দেশের আভ্যন্তরিক শাসন বিষয়ে সম্পূর্ণ ক্ষমতা পরিচালিত করিতেন। ক্রমে গুপ্তগণের প্রবর্তিত শাসনপদ্ধতি বাংলা দেশের সর্বত্র প্রচলিত হইয়াছিল। দক্ষিণ ও পূর্ব্ববঙ্গে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হইবার পরও ভুক্তি, বিষয়, বীথি প্রভৃতি শাসন বিভাগের ও বিষয় অধিকারের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। অবশ্য স্বাধীন রাজগণ মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করিতেন। গুপ্ত সম্রাটগণের ন্যায় ইঁহারাও বিভিন্ন শ্ৰেণীর বহুসংখক রাজকর্ম্মচারী নিযুক্ত করিতেন। গোপচন্দ্রের মল্লসারূল তাম্রশাসনে এই কর্ম্মচারীগণের একটি তালিকা পাওয়া গিয়াছে, কিন্তু ইহাদের কাহার কী কাৰ্য্য বা কী পরিমাণ ক্ষমতা ও দায়িত্ব ছিল অধিকাংশস্থলেই তাহা নির্ণয় করা যায় না।
.
৩. পালসাম্রাজ্য
পালবংশীয় রাজগণের চারি শতাব্দীব্যাপী রাজত্বকালে বাংলায় শাসনপ্রণালী দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। গুপ্তযুগের ন্যায় ভুক্তি, বিষয়, মণ্ডল প্রভৃতি সুনির্দিষ্ট শাসন বিভাগের বহু উল্লেখ পাওয়া যায়। পুণ্ড্রবর্দ্ধন ও বর্দ্ধমান ভুক্তি ব্যতীত বাংলায় আর একটি ভুক্তির প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল। ইহার নাম দণ্ডভুক্তি। ইহা বর্ত্তমান মেদিনীপুর জিলায় অবস্থিত ছিল। এতদ্ব্যতীত উত্তর বিহারে তীর-ভুক্তি (ত্রিহুত), দক্ষিণ বিহারে শ্রীনগর-ভুক্তি এবং আসামে প্রাগজ্যোতিষ-ভুক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু এই সমুদয় ভুক্তি বা ইহাদের অধীনস্থিত বিষয়, মণ্ডল প্রভৃতির শাসনপ্রণালী সম্বন্ধে কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না।
