.
২. পট্টিকেরা রাজ্য
বর্ত্তমান কুমিল্লা জিলায় পট্টিকেরা রাজ্য অবস্থিত ছিল। পট্টিকেরা নামে একটি পরগণা এখনো এই প্রাচীন রাজ্যের স্মৃতি বহন করিতেছে। বিগত মহাযুদ্ধের সময় (১৯৪৩ অব্দ) সামরিক প্রয়োজনে মাটি খনন করার ফলে কুমিল্লার অনতিদূরবর্ত্তী লালমাই বা ময়নামতী পাহাড়ে বহু প্রাচীন স্তূপ, মন্দির প্রভৃতির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে। প্রায় দশ মাইল ব্যাপিয়া এই সমুদয় প্রাচীন কীৰ্ত্তির চিহ্ন এখনো বিদ্যমান। এই স্থানেই যে প্রাচীন পট্টিকেরা রাজ্যের রাজধানী অথবা অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল তাহা এক প্রকার নিঃসংশয়ে বলা যাইতে পারে।
১০১৫ অব্দে লিখিত একখানি পুঁথিতে ষোড়শভুজা এক দেবীর চিত্রের নিম্নে লিখিত আছে “পট্টিকেরে চুন্দাবরভবনে চুন্দা”। ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে রাজধানী পট্টিকেরে প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ চুন্দা দেবীর মূর্ত্তি একাদশ শতাব্দীর পূর্ব্বেই প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল। পূর্ব্বোক্ত ধ্বংসাবশেষ হইতে অনুমিত হয় যে ইহারও ৩-৪ শত বৎসর পূর্ব্বে পট্টিকেরা একটি সমৃদ্ধ জনপদ ছিল।
ব্রহ্মদেশের ঐতিহাসিক আখ্যানে পট্টিকেরা রাজ্যের বহু উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। ব্রহ্মের প্রসিদ্ধ রাজা অনিরুদ্ধ (১০৪৪-১০৭৭ অব্দ) পট্টিকেরা পর্য্যন্ত স্বীয় রাজ্য বিস্তার করেন এবং এই সময় হইতেই দুই রাজ্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্থাপিত হয়। ব্রহ্মরাজ কনজিথের (১০৮৪-১১১২) কন্যার সহিত পট্টিকেরার রাজপুত্রের ব্যর্থ প্রেমের কাহিনী ব্রহ্মদেশের আখ্যানে সবিস্তারে বর্ণিত হইয়াছে এবং এই ঘটনা অবলম্বন করিয়া তথায় অনেক কবিতা ও নাটক রচিত হইয়াছে। এই সমুদয় নাটক এখনো ব্রহ্মদেশে অভিনীত হয়। ব্রহ্মরাজের ইচ্ছা থাকিলেও রাজনৈতিক কারণে তাঁহার কন্যার সহিত পট্টিকেরার রাজকুমারের বিবাহ অসম্ভব হইলে উক্ত রাজকুমার আত্মহত্যা করেন। কিন্তু এই রাজকন্যার গর্ভজাত পুত্র অলংসিথু মাতামহের মৃত্যুর পর ব্রহ্মদেশের রাজা হন এবং পট্টিকেরার রাজার কন্যাকে বিবাহ করেন। অলংসিথুর মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র নরথু সিংহাসনে আরোহণ করিয়া স্বহস্তে তাঁহার বিমাতা পট্টিকেরার রাজকন্যাকে বধ করেন। কন্যার মৃত্যুসংবাদ শ্রবণ করিয়া পট্টিকেরার রাজা প্রতিশোধ লইতে সংকল্প করিলেন। তিনি আটজন বিশ্বস্ত সৈনিককে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে ব্রহ্মদেশের রাজধানী পাগানে পাঠাইলেন। ব্রাহ্মণেরা আশীর্বাদ করিবার ছলে রাজসমীপে উপস্থিত হইয়া রাজাকে বধ করে এবং সকলেই স্বেচ্ছায় প্রাণ বিসর্জন দেয়। এই সমুদয় কাহিনী কত দূর সত্য বলা যায় না, কিন্তু ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে পট্টিকেরা একটি প্রসিদ্ধ রাজ্য ছিল এবং নিকটবর্ত্তী ব্রহ্মদেশের সহিত তাঁহার রাজনৈতিক সম্বন্ধ ছিল।
ময়নামতী পাহাড়ে প্রাপ্ত একখানি তাম্রশাসনে রণবঙ্কমল্ল শ্রীহরিকালদেব নামক পট্টিকেরার এক রাজার নাম পাওয়া যায়। ইনি ১২০৮ অব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং অন্তত ১৭ বৎসর রাজত্ব করেন। এই তাম্রশাসন দ্বারা রাজমন্ত্রী শ্রী ধড়ি-এব পট্টিকেরা নগরে এক বৌদ্ধবিহারে কিঞ্চিৎ ভূমি দান করেন। রাজমন্ত্রীর পিতার নামে হেদি-এব এবং তাম্রশাসনের লেখকের নাম মেদিনী-এব। এই সমুদয় নাম ব্রহ্মদেশীয় নামের অনুরূপ এবং পট্টিকেরা রাজ্যের সহিত ব্রহ্মদেশের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের পরিচায়ক।
শ্রীহরিকালদেব প্রাচীন পট্টিকেরা-রাজবংশীয় ছিলেন অথবা নিজেই একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন তাহা বলা যায় না। এই সময়ে যে দেববংশীয় রাজগণ এই অঞ্চলে রাজত্ব করিতেন তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। অসম্ভব নহে যে শ্রীহরিকালদেবও দেববংশীয় ছিলেন। কিন্তু তাঁহার নামের অন্ত স্থিত ‘দেব’ শব্দ বংশপদবী অথবা রাজকীয় সম্মানসূচক পদমাত্র তাহা নিশ্চিত বলা যায় না। তবে রণবঙ্কমল্ল উপাধিধারী শ্রীহরিকালদেবের পর যে পট্টিকেরা রাজ্য দেববংশীয় দামোদরদেবের রাজ্যভুক্ত হইয়াছিল ইহাই সম্ভবপর বলিয়া মনে হয়।
১৫. রাজ্যশাসনপদ্ধতি
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ –রাজ্যশাসনপদ্ধতি
১. প্রাচীন যুগ
গুপ্তসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পূর্ব্বে বাংলার রাজ্যশাসনপদ্ধতি সম্বন্ধে কোনো সঠিক বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে প্রাচীন গ্রন্থে সুহ্ম পু প্রভৃতি জাতি এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের উল্লেখ দেখিয়া অনুমান হয় যে আর্য্যাবর্তের অন্যান্য অংশের ন্যায় বাংলা দেশেও প্রথমে কয়েকটি বিশিষ্ট সংঘবদ্ধ জাতি বসবাস করে এবং ইহা হইতেই ক্রমে রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়।
গ্রীক লেখকগণ গঙ্গরিডই রাজ্যের যে বর্ণনা করিয়াছেন তাহাতে কোনো সন্দেহ থাকে না যে খৃষ্টপূৰ্ব চতুর্থ শতাব্দের পূর্ব্বেই বাংলায় রাজতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশ হইয়াছিল। কারণ রাজ্যশাসনপদ্ধতি সুনিয়ন্ত্রিত ও বিশেষ শৃঙ্খলার সহিত বিধিবদ্ধ না হইলে এরূপ পরাক্রান্ত রাজ্যের উদ্ভব সম্ভবপর নহে। মহাভারতের উল্লিখিত হইয়াছে যে বাংলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলি মিলিত হইয়া বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করিতে চেষ্টা করিয়াছিল এবং তাহারা বিদেশী রাজ্যের সহিতও রাজনৈতিক সম্বন্ধ স্থাপন করিয়াছিল। ইহাও বাংলা দেশে রাজনৈতিক জ্ঞানের প্রসার ও প্রভাব সূচিত করে। রাজকুমার বিজয়ের আখ্যান (পৃ. ১৪) সত্য হইলে বাংলা দেশে যে প্রজাশক্তি প্রভাবশালী ছিল তাহা স্বীকার করিতে হইবে।
