‘পঞ্চরক্ষা’ নামক একখানি বৌদ্ধ গ্রন্থের পুঁথি হইতে জানা যায় যে, ইহা ১২১১ শকে (১২৮৯ অব্দে) পরমসৌগত পরমরাজাধিরাজ গৌড়েশ্বর মধুসেনের রাজ্যে লিখিত হইয়াছিল। এই বৌদ্ধ নরপতি মধুসেন লক্ষ্মণসেনের বংশধর কি না তাহা সঠিক জানা যায় না, কিন্তু তাঁহার ‘সেন’ উপাধি হইতে এরূপ অনুমান করা অসঙ্গত নহে। মধুসেন এয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে রাজত্ব করেন। কিন্তু তাঁহার রাজ্যের অবস্থিতি ও বিস্তৃতি সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না। তিনি গৌড়েশ্বর উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন, কিন্তু গৌড়ের কোনো অংশ তাঁহার রাজ্যভুক্ত ছিল কি না অন্য সমর্থক প্রমাণ না পাইলে সে সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু বলা যা না। মুধুসেনের পর বাংলায় সেন উপাধিধারী কোনো রাজার অস্তিত্বের প্রমাণ অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয় নাই। বর্দ্ধমান জিলার কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত মঙ্গলকোট নামক গ্রামের এক মসজিদে একখানি ভগ্ন প্রস্তরখণ্ডে একটি সংস্কৃত লিপির কিয়দংশ উত্তীর্ণ আছে। কেহ কেহ বলেন ইহাতে চন্দ্রসেন নামক রাজার উল্লেখ আছে। কিন্তু এই রাজার সম্বন্ধে আর কোনো বিবরণ জানা যায় নাই।
এয়োদশ শতাব্দীতে বুদ্ধসেন ও তাঁহার পুত্র জয়সেন পীঠি রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। বর্ত্তমান গয়া জিলায় পীঠি রাজ্য অবস্থিত ছিল। পীঠিপতি আচাৰ্য্য জয়সেন “লক্ষ্মণসেনস্য অতীতরাজ্য-সম্বৎসর-৮৩” এই অব্দে বৌদ্ধগয়ার মহাবোধি বিহারকে একখানি গ্রাম দান করেন। এই তারিখের প্রকৃত অর্থ লইয়া পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ আছে। “লক্ষ্মণসেনের রাজ্য ধ্বংস হওয়ার ৮৩ বৎসর পরে,”-উক্ত পদের এই প্রকার অর্থই সঙ্গত বলিয়া মনে হয়। গয়া অঞ্চলে আ ১২০০ অব্দে সেনরাজ্য ধ্বংস হয়। সুতরাং বুদ্ধসেন ও জয়সেন ত্রয়োদশ শতাব্দের শেষার্ধে রাজত্ব করিতেন। ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে তুরস্ক বিজয়ের পরও মগধে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশীয় রাজ্য বিদ্যমান ছিল এবং সেন উপাধিধারী রাজগণ তথায় রাজত্ব করিতেন।
তিব্বতীয় লামা তারনাথ লিখিয়াছেন যে সেনবংশীয় লবসেন, কাশসেন, মণিতসেন এবং রাথিকসেন এই চারিজন রাজা মোট ৮০ বৎসর রাজত্ব করেন। তৎপর লবসেন, বুদ্ধসেন, হরিতসেন এবং প্রতীতসেন এই চারিজন তুরস্ক রাজার অধীনে রাজত্ব করেন। তারনাথের এই উক্তির সমর্থক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। কিন্তু অসম্ভব নহে যে তারনাথ কথিত বুদ্ধসেনই পূর্ব্বোক্ত পীঠিপতি বুদ্ধসেন।
পীঠির সেনরাজগণের সহিত বাংলার সেনরাজবংশের কোনো সম্বন্ধ ছিল কি না তাহা নিশ্চিত বলা যায় না। জয়সেনের লিপিতে লক্ষ্মণসেনের নাম সংযুক্ত সম্বৎসর ব্যবহৃত হওয়ায় ইহাই প্রমাণিত হয় যে এককালে এই অঞ্চল লক্ষ্মণসেনের রাজ্যভুক্ত ছিল কিন্তু ইহা হইতে জয়সেনের সহিত লক্ষ্মণসেনের কোনো বংশগত সম্বন্ধ ছিল এরূপ সিদ্ধান্ত করা যায় না। তবে এরূপ সম্বন্ধ থাকা অস্বাভাবিক বা অসম্ভব নহে।
পঞ্জাবের অন্তর্গত সুকে, কেওস্থল, কষ্টওয়ার এবং মণ্ডী প্রভৃতি কয়েকটি ক্ষুদ্র পার্ব্বত্য রাজ্যের রাজাদের মধ্যে একটি প্রাচীন প্রবাদ প্রচলিত আছে যে তাঁহাদের পূৰ্বপুরুষগণ গৌড়ের রাজা ছিলেন। এই সমুদয় রাজাদের সেন উপাধি হইতে কেহ কেহ অনুমান করেন যে, হঁহারা বাংলার সেনরাজগণের বংশধর। অবশ্য সমর্থক অন্য প্রমাণ না পাইলে এ সম্বন্ধে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত করা যায় না।
তুর্কী আক্রমণই সেন রাজবংশের পতনের একমাত্র কারণ নহে। সম্ভবত আভ্যন্তরিক বিদ্রোহও ইহার ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করিয়াছিল। ডোম্মনপাল দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে সুন্দরবন অঞ্চলে যে এক স্বাধীন রাজ্যের পত্তন করিয়াছিলেন তাহা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। তুর্কী আক্রমণের ফলে সেনরাজগণের বিপদ ও দুর্বলতার সুযোগে এইরূপ আরও কয়েকটি স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব হয়। পরবর্ত্তী অধ্যায়ে এ সম্বন্ধে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হইয়াছে।
সেনরাজগণের রাজধানী কোথায় ছিল সে সম্বন্ধে এ যাবৎ বহু বাদানুবাদ হইয়াছে। ইহার বিস্তৃত আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। রাঢ় দেশের কোন অংশে হেমন্ত সেন রাজত্ব করিতেন এবং তাঁহার রাজধানী কোথায় ছিল তাহা বলা যায় না। কিন্তু বিজয়সেন বঙ্গদেশ জয় করার পর যে ঢাকার নিকটবর্ত্তী বিক্রমপুরে সেনরাজগণের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। বিজয়সেন ও বল্লালসেনের এবং লক্ষ্মণসেনের রাজত্বের প্রথমভাগের যে সমুদয় তাম্রশাসন অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হইয়াছে তাঁহার সকলই “শ্রীবিক্রমপুর-সমাবাসিত শ্রীমজ্জয়স্কন্ধাবার” হইতে প্রদত্ত। “স্কন্ধাবার” শব্দে শিবির ও রাজধানী উভয়ই বুঝায়, কিন্তু যখন তিনজন রাজার তাম্রশাসনেই এই এক স্কন্ধাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়, তখন ইহাকে রাজধানী অর্থেই গ্রহণ করা সঙ্গত। ইহার অন্যবিধ প্রমাণও আছে। বিজয়সেনের তাম্রশাসন হইতে জানা যায় যে, তাঁহার মহাদেবী অর্থাৎ প্রধানা মহিষী বিলাসদেবী বিক্রমপুর উপকারিকা মধ্যে তুলাপুরুষ মহাদান নামক বিরাট অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। সুতরাং বিক্রমপুর যে অস্থায়ী শিবির মাত্র নহে, কিন্তু স্থায়ী রাজধানী ছিল, সে বিষয় সন্দেহ নাই। এখনো স্থানীয় প্রবাদ অনুসারে বিক্রমপুরে বল্লালবাড়ী প্রভৃতি সেনরাজগণের অতীত কীৰ্ত্তির ধ্বংসপ্রাপ্ত নিদর্শন আছে।
