বখতিয়ার যে নদীয়ায় বসতি করেন নাই, বরং ইহা ধ্বংস করিয়াছিলেন, মীনহাজুদ্দিন তাহা স্বীকার করিয়াছেন। তাঁহার নদীয়া আক্রমণ গৌড় জয়ের প্রথম অভিযান কি না তাহাও নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। মীনহাজুদ্দিন লিখিয়াছেন যে বিহার জয়ের পূর্ব্বে তিনি ঐ প্রদেশের নানা স্থানে লুটতরাজ করিয়া ফিরিতেন। “কিল্লা বিহারের” ন্যায় কেবলমাত্র লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যেই তিনি অতর্কিত নদীয়া আক্রমণ করিয়া থাকিবেন ইহাও অসম্ভব নহে।
১২৫৫ অব্দে মুঘিসুদ্দিন উজবেক নদীয়া জয়ের চিহ্নস্বরূপ যে মুদ্রা প্রচলিত করেন তাহা হইতে অনুমিত হয় যে ঐ তারিখের পূৰ্ব্বে নদীয়ায় তুর্কী শাসন স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। সুতরাং নদীয়া কিছুদিন বখতিয়ারের অধিকারে থাকিলেও ইহা যে আবার সেন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল এরূপ অনুমান করাই সঙ্গত।
নদীয়া জয়ের কত দিন পরে এবং কিভাবে বখতিয়ার লক্ষ্মণাবতী জয় করিয়া সেখানে রাজধানী স্থাপন করিয়াছিলেন মীনহাজুদ্দিনের গ্রন্থে তাঁহার কোনো উল্লেখ নাই। লক্ষ্মণসেন ও তাঁহার বংশধরেরা নদীয়া জয়ের পর বহু বৎসর বঙ্গে রাজত্ব করিয়াছিলেন। তিনি এবং তাঁহার দুই পুত্র যে ম্লেচ্ছ ও যবনদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হইয়াছিলেন সমসাময়িক তাম্রশাসন ও কবিতায় তাঁহার স্পষ্ট উল্লেখ আছে। যখন প্রায় সমগ্র আর্য্যাবর্ত্ত তুর্কীগণের পদানত, তখনো যাঁহারা বীরবিক্রমে বঙ্গের স্বাধীনতা রক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, তাঁহাদের সৈন্যবল এত দুৰ্বল বা শাসনতন্ত্র এমন বিশৃঙ্খল ছিল না যে অতর্কিত আক্রমণে নদীয়া অধিকার করিতে পারিলেও বখতিয়ার বিনা বাধায় গৌড় জয় করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। কিন্তু এই গৌড় জয়ের কোনো ঐতিহাসিক বিবরণই পাওয়া যায় নাই।
.
৬. সেন রাজ্যের পতন
আ ১২০২ অব্দে বখতিয়ার নদীয়া আক্রমণ করেন। ইহার পরও লক্ষ্মণসেন অন্তত তিন-চারি বৎসর রাজ্য করিয়াছিলেন। তাঁহার এই সময়কার দুইখানি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে। ইহাতে রাজকবি যেভাবে তাঁহার শৌর্যবীর্যের ও প্রাচীন রীতি অনুযায়ী রাজপদবী প্রভৃতির উল্লেখ করিয়াছেন তাহাতে বাংলা দেশের গুরুতর রাষ্ট্রীয় পরিবর্ত্তনের কোনো আভাসই পাওয়া যায় না। অপরদিকে উত্তরবঙ্গ অথবা তাঁহার এক অংশ ব্যতীত বখতিয়ার বাংলার আর কোনো প্রদেশে স্বীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিয়াছিলেন ইহার কোনো প্রমাণ নাই। বঙ্গজয় সম্পূর্ণ না করিয়াই বখতিয়ার সুদূর তিব্বতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং এই অভিযানে সর্ব্বস্বান্ত হইয়া ভগ্নহৃদয়ে প্রাণত্যাগ করেন। বখতিয়ারের এই বিফলতার সহিত সেনরাজগণের যুদ্ধোদ্যমের কোনো সম্বন্ধ আছে কি না তুর্কী ঐতিহাসিকগণ সে সম্বন্ধে একেবারে নীরব।
লক্ষ্মণসেন ও বখতিয়ার উভয়েই সম্ভবত ১২০৫ অব্দে বা তাঁহার দুই-এক বৎসরের মধ্যেই মৃত্যুমুখে পতিত হন। লক্ষ্মণসেনের পর তাঁহার দুই পুত্র বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন সিংহাসনে আরোহণ করেন। সম্ভবত বিশ্বরূপসেনই জ্যেষ্ঠ ছিলেন এবং প্রথমে রাজত্ব করেন, কিন্তু এ বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যায়। এই দুই রাজারই তাম্রশাসন পাওয়া গিয়াছে। ইহাতে বিশ্বরূপসেন “অরিরাজ বৃষভাঙ্কশঙ্কর গৌড়েশ্বর” ও কেশবসেন “অরিরাজ অসহ্য শঙ্কর গৌড়েশ্বর উপাধিতে ভূষিত হইয়াছেন। উভয়েই ‘সৌর’ অর্থাৎ সূর্যের উপাসক ছিলেন। এইরূপে দেখা যায় যে, সেনরাজগণ যথাক্রমে শৈব, বৈষ্ণব ও সৌর সম্প্রদায়ভুক্ত হইয়াছিলেন।
এই দুই রাজার রাজ্যকালের কোনো বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় নাই। কিন্তু দক্ষিণ ও পূৰ্ব্ব বাংলা যে তাঁহাদের রাজ্যভুক্ত ছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। কারণ ইহাদের তাম্রশাসনে বিক্রমপুর ও দক্ষিণবঙ্গের সমুদ্রতীরে ভূমিদানের উল্লেখ আছে। বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন উভয়েই “যবনান্বয়-প্রলয়-কাল-রুদ্র” বলিয়া তাম্রশাসনে অভিহিত হইয়াছেন। ইহা হইতে অনুমিত হয় যে উভয়েই উত্তরবঙ্গের মুসলমান তুর্কীরাজ্যের সহিত যুদ্ধে সফলতা লাভ করিয়াছিলেন। ইহা কেবলমাত্র প্রশস্তিকারের স্তুতিবাক্য নহে। কারণ মীনহাজুদ্দিনের ইতিহাস হইতেও প্রমাণিত হয় যে তুর্কীগণ উত্তরবঙ্গের সমগ্র অথবা অধিকাংশ অধিকার করিলেও বহুদিন পৰ্য্যন্ত পূৰ্ব্ব ও দক্ষিণবঙ্গ অধিকার করিতে পারেন নাই। তিনি লিখিয়াছেন যে গঙ্গার দুই তীরে, রাঢ় ও বরেন্দ্রেই, তুর্কীরাজা সীমাবদ্ধ ছিল, এবং তখনো লক্ষ্মণসেনের বংশধরগণ বঙ্গে রাজত্ব করিতেন। তুর্কীরাজগণ যে মধ্যে মধ্যে বঙ্গে অভিযান করিতেন তাহাও এই গ্রন্থে উল্লিখিত হইয়াছে। সুতরাং বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন যে যবণ-রাজকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া পূৰ্ব্ব ও দক্ষিণবঙ্গ স্বীয় অধিকারে রাখিতে সমর্থ হইয়াছিলেন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই।
বিশ্বরূপসেনের একখানি তাম্রশাসন তাঁহার রাজত্বের চতুর্দ্দশ সম্বৎসরে এবং আর একখানি ইহার পরে প্রদত্ত হইয়াছিল। কেশবসেনের তাম্রশাসনখানির তারিখ তাঁহার রাজ্যের তৃতীয় বৎসর। সুতরাং এই দুই ভ্রাতার মোট রাজ্যকাল প্রায় ২৫ বৎসর ছিল এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। কেশবসেনের মৃত্যুর পরে (আ ১২৩০) কে রাজসিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন তাহা জানা যায় না। বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসনে কুমার সূৰ্য্যসেন ও কুমার পুরুষোত্তমসেনের নামোল্লেখ আছে। কুমার’ এই উপাধি হইতে অনুমিত হয় যে ইহারা উভয়েই রাজপুত্র, অন্তত রাজবংশীয়, ছিলেন। কিন্তু ইহাদের কেহ যে রাজা হইয়াছিলেন তাঁহার প্রমাণ নাই। পরবর্ত্তীকালে রচিত রাজাবলী, বিপ্রকল্পলতিকা প্রভৃতি গ্রন্থ, আবুল ফজল প্রণীত আইন-ই-আকবরী এবং এদেশে প্রচলিত লৌকিক কাহিনীতে অনেক সেনরাজার নামোল্লেখ আছে, কিন্তু এই সমুদয় বিবরণ ঐতিহাসিক বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। মীনহাজুদ্দিনের পূৰ্বোল্লিখিত উক্তি হইতে প্রমাণিত হয় যে তিনি যে সময়ে তাঁহার গ্রন্থ সমাপ্ত করেন (আ ১২৬০ অব্দ),-অন্তত যে সময়ে লক্ষ্মণাবতীতে আসিয়া বাংলা দেশের ঐতিহাসিক বিবরণ সংগ্রহ করেন (আ ১২৪৪ অব্দ)-তখনো লক্ষ্মণসেনের বংশধরগণ বঙ্গে রাজত্ব করিতেন। সুতরাং কেশবসেনের পরেও যে এক বা একাধিক সেন রাজা বঙ্গে রাজত্ব করিয়াছিলেন সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নাই।
