কিন্তু মীনহাজুদ্দিনের নদীয়া অভিযান কাহিনী সম্পূর্ণরূপে সত্য বলিয়া গ্রহণ করা কঠিন। যে বিশ্বাসী লোকেরা তাঁহাকে সংবাদ যোগাইয়াছিল, তাহাদের জ্ঞান ও বুদ্ধি কত দূর ছিল, তাহা লক্ষ্মণসেনের অদ্ভুত জন্মবিবরণ ও তাঁহার ৮০ বৎসর রাজত্বের কথা হইতেই বুঝা যায়। বিশেষত এই কাহিনীর মধ্যে অনেক সুপরিচিত প্রবাদ, কথা ও অবিশ্বাস্য ঘটনার সমাবেশ আছে। ‘তুরস্ক আক্রমণ সম্বন্ধে হিন্দুর শাস্ত্রবাণী’ চচ্নামা নামক গ্রন্থে সিন্ধুদেশ সম্বন্ধেও উল্লিখিত হইয়াছে। এই শাস্ত্রবাণীর মূল্য যাহাই হউক, ইহাতে প্রমাণিত হয় যে নদীয়া আক্রমণের অন্তত এক বৎসর পূর্ব্বে ইহার সম্ভাবনা রাজকর্ম্মচারীরা জ্ঞাত ছিলেন। অথচ বখতিয়ার বিহার হইতে নদীয়া পৌঁছিলেন, ইহার মধ্যে তাঁহার অভিযানের কোনো সংবাদ সেন রাজদরবারে পৌঁছিল না। যে সময় তুরস্ক সেনা কর্ত্তৃক দেশ আক্রান্ত হইবার পূর্ণ সম্ভাবনা বিদ্যমান, সেই সময়ে রাজধানীর দ্বাররক্ষাকারীরা ১৮ জন অশ্বারোহী তুর্কীকে বিনা বাধায় নগরে প্রবেশ করিতে দিল এবং অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত বর্ম্মাবৃত সৈন্যকে অশ্বব্যবসায়ী বলিয়া ভুল করিল; নগররক্ষীরাও কোনো সন্দেহ করিল না এবং বখতিয়ার বিনা বাধায় রাজপ্রাসাদের তোরণ পৰ্য্যন্ত পৌঁছিলেন; যখন বখতিয়ারের অবশিষ্ট সৈন্যদল নগরে প্রবেশ করিল তখনো এই অগ্রগামী ১৮ জন অশ্বারোহীকে সন্দেহ করিয়া কেহ তাহাদের গতি প্রতিরোধ করিতে অগ্রসর হইল না! রাজার দেহরক্ষী বা সৈন্যদল অবশ্যই ছিল; এবং যখন রাজা স্বয়ং নদীয়াতে ছিলেন তখন অন্তত একদল রাজসৈন্য তাঁহার রক্ষাকার্যে নিযুক্ত ছিল; অথচ বখতিয়ারের সৈন্যদলের কাহারও গায়ে একটি আঁচড় লাগিল না, তাহারা স্বচ্ছন্দে বিনা বাধায় হত্যাকাণ্ড ও লুণ্ঠনকার্য চালাইতে লাগিল। এ সমুদয় এতই অস্বাভাবিক যে খুব দৃঢ় বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ব্যতীত সত্য বলিয়া স্বীকার করা অসম্ভব।
অথচ যে প্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া মীনহাজুদ্দিন এই অদ্ভুত কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়াছেন তাহা খুবই অকিঞ্চিৎকর। একজন অতিবৃদ্ধ সৈনিক তাঁহাকে বিহার অভিযানের কাহিনী শুনাইয়াছিল। নদীয়া অভিযানের সম্বন্ধে কোনো লিখিত দলিল বা বিবরণ তিনি পান নাই। যে এই কাহিনী বলিয়াছিল তাঁহার এই অভিযানের সম্বন্ধে কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকিলে মীনহাজুদ্দিন তাহা উল্লেখ করিতেন। সুতরাং লক্ষ্মণাবতীর বাজারে প্রচলিত নানাবিধ জনপ্রবাদের উপরই এই কাহিনী প্রতিষ্ঠিত এই অনুমান অসঙ্গত নহে। যে সময়ে মীনহাজুদ্দিন এই কাহিনী শুনিয়াছিলেন তখন অর্দ্ধশতাব্দী যাবৎ তুর্কীদের রাজ্য আৰ্যাবর্তে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে এবং একে একে প্রাচীন হিন্দুরাজ্য তাহাদের পদানত হইয়াছে। বিজয়গৰ্ব্বে দৃপ্ত, প্রভুত্বের উন্মাদনায় মত্ত, বিজিত পরাধীন জাতির প্রতি হতশ্রদ্ধ সাধারণ তুরস্ক সৈনিক অথবা রাজপুরুষ যে নিজেদের অতীত জয়ের ইতিহাস অতিশয়োক্তি ও অলৌকিক কাহিনী দ্বারা রঞ্জিত করিবে ইহা খুব স্বাভাবিক। নদীয়া জয়ের সম্বন্ধে মীনহাজুদ্দিনের বিবরণ ছাড়া আরও অনেক অদ্ভুত কাহিনী প্রচলিত ছিল। মীনহাজুদ্দিনের গ্রন্থরচনার অনধিক এক শতাব্দী পরে (১৩৫০ অব্দে) ঐতিহাসিক ইসমী তাঁহার ফুতু-উস-সলাটিন গ্রন্থে লিখিয়াছেন: “মুহম্মদ বখতিয়ার বণিকের ন্যায় সর্বত্র ঘুরিয়া বেড়াইতেন। রাজা লখমনিয়া শুনিলেন যে একজন সওদাগর বহু মূল্যবান দ্রব্যজাত ও তাতার দেশীয় অশ্ব বিক্রয় করিতে তাঁহার রাজধানীতে আসিয়াছে। লক্ষ্মণসেন রাজপ্রাসাদ হইতে বাহির হইয়া দ্রব্যগুলি ক্রয় করিবার জন্য সওদাগরের নিকট গেলেন। বখতিয়ার রাজাকে দ্রব্য দেখাইতেছেন এমন সময় পূৰ্ব্বব্যবস্থামতো তাঁহার ইঙ্গিতে তাঁহার অনুচরগণ সহসা চতুর্দিক হইতে হিন্দুদিগকে আক্রমণ করিল। অতর্কিত আক্রমণে হিন্দুরা ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল কিন্তু রাজার দেহরক্ষীগণ বহুক্ষণ পর্য্যন্ত যুদ্ধ করিল। খিলজী বীরগণ অল্পসংখ্যক রক্ষীগণকে হত্যা করিয়া রাজাকে বন্দী করিয়া বখতিয়ারের নিকট লইয়া গেলেন। বখতিয়ার ঐ রাজ্যের রাজা হইলেন।”
এই কাহিনীর সমালোচনা নিষ্প্রয়োজন। মীনহাজুদ্দিনের কাহিনী যে সে যুগেও সকলে ঐতিহাসিক সত্য বলিয়া গ্রহণ করে নাই ইহা তাঁহার একটি প্রমাণ। কারণ তাহা হইলে অব্যবহিত পরবর্ত্তী অপর একজন ঐতিহাসিক তাঁহার উল্লেখমাত্র না করিয়া এইরূপ অদ্ভুত আখ্যানের অবতারণা করিতেন না। ইহা হইতে আরও প্রমাণিত হয় যে বখতিয়ার কর্ত্তৃক লক্ষ্মণসেনের পরাজয় সম্বন্ধে কোনো বিশ্বস্ত বিবরণ ঐতিহাসিকগণের জানা ছিল না, এবং এ সম্বন্ধে বিবিধ আজগুবি কাহিনীর সৃষ্টি হইয়াছিল। মীনহাজুদ্দিন ও ইসমী দুইটি লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, এবং সম্ভবত এরূপ আরও অনেক গল্প প্রচলিত ছিল।
কেহ কেহ মীনহাজুদ্দিনের বিবরণ একেবারে অমূলক বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। কিন্তু তাহা সঙ্গত বোধ হয় না। মোটের ওপর মীনহাজুদ্দিনের উক্তি হইতে এই সিদ্ধান্ত করা যাইতে পারে যে বৃদ্ধ রাজা লক্ষ্মণসেন যখন নদীয়ায় বাস করিতেছিলেন তখন বখতিয়ার খিলজী তাঁহাকে বন্দী করিবার জন্য এক ক্ষুদ্র অশ্বারোহী সৈন্যদল লইয়া বিহার হইতে দ্রুতগতিতে অপ্রত্যাশিত পথে আসিয়া অতর্কিতে ঐ নগরী আক্রমণ করেন, এবং রাজাকে না পাইয়া ঐ নগরী লুণ্ঠন করিয়া প্রস্থান করিয়াছিলেন। নদীয়া তখন সেনদের প্রধান রাজধানী অথবা বিশেষভাবে সুরক্ষিত ছিল কি না তাহা নিশ্চিত জানিবার উপায় নাই।
