“ইহার এক বৎসর পরে বখতিয়ার একদল সৈন্য অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করিয়া বিহার হইতে যাত্রা করিলেন। তিনি এরূপ দ্রুতগতিতে অগ্রসর হইয়াছিলেন যে যখন অতর্কিতভাবে তিনি সহসা নদীয়া পৌঁছিলেন, তখন মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী তাঁহার সঙ্গে আসিতে পারিয়াছিল, বাকী সৈন্য পশ্চাতে আসিতেছিল। নগরদ্বারে উপস্থিত হইয়া বখতিয়ার কাহাকেও কিছু না বলিয়া এমন ধীরেসুস্থে সঙ্গীগণসহ শহরে প্রবেশ করিলেন যে লোকেরা মনে করিল যে, সম্ভবত ইহারা একদল সওদাগর, অশ্ব বিক্রয় করিতে আসিয়াছে। বখতিয়ার যখন রাজপ্রাসাদের দ্বারে উপনীত হইলেন তখন বৃদ্ধ রাজা লখমনিয়া মধ্যাহ্নভোজন করিতেছিলেন। সহসা প্রাসাদদ্বারে এবং নগরীর অভ্যন্তর হইতে তুমুল কলরব শোনা গেল। লখমনিয়া এই কলরবের প্রকৃত কারণ জানিবার পূর্ব্বেই বখতিয়ার সদলে রাজপুরীতে প্রবেশ করিয়া রাজার অনুচরগণকে হত্যা করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন রাজা নগ্নপদে প্রাসাদের পশ্চাৎ দ্বার দিয়া বাহির হইয়া নৌকাযোগে পলায়ন করিলেন। বখতিয়ারের সমুদয় সেনা নদীয়ায় উপস্থিত হইয়া ঐ নগরী ও তাঁহার চতুস্পার্শ্ববর্ত্তী স্থানসমূহ অধিকার করিল এবং বখতিয়ারও সেখানেই বসতি স্থাপন করিলেন। ওদিকে রায় লখমনিয়া সঙ্কনাৎ ও বঙ্গের অভিমুখে প্রস্থান করিলেন। তথায় অল্পদিন পরেই তাঁহার রাজ্য শেষ হইল, কিন্তু তাঁহার বংশধরগণ এখনো বঙ্গদেশে রাজত্ব করিতেছেন।
“রায় লখমনিয়ার রাজ্য অধিকার করার পরে বখতিয়ার ধ্বংসপ্রায় নদীয়া ত্যাগ করিয়া বর্ত্তমানে যে স্থান লক্ষ্মণাবতী নামে পরিচিত সেই স্থানে রাজধানী স্থাপন করিলেন।”
বখতিয়ার খিলজী কর্ত্তৃক বাংলা দেশ জয় সম্বন্ধে যত কাহিনী ও মতবাদ প্রচলিত আছে তাহা উল্লিখিত বিবরণের উপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ এ সম্বন্ধে অন্য কোনো সমসাময়িক ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় নাই। মীনহাজুদ্দিনের বিবরণ সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক বলিয়া গ্রহণ করিলেও প্রচলিত বিশ্বাস অনেক পরিমাণে ভ্রান্ত বলিয়াই প্রতিপন্ন হইবে। প্রথমত “সপ্তদশ অশ্বারোহী যবনের ডরে” কাপুরুষ লক্ষ্মণসেন “সোনার বাংলা রাজ্য” বিসর্জন দিয়াছিলেন, কবিবর নবীনচন্দ্রের এই উক্তি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বখতিয়ার যখন নগরদ্বারে উপনীত হইয়াছিলেন তখন তাঁহার সহিত মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী সৈন্য ছিল, কিন্তু বাকী সৈন্য নিকটেই পশ্চাতে ছিল। কারণ যে সময় বখতিয়ার রাজবাড়ী পৌঁছিয়াছিলেন সেই সময়ই এই সৈন্য বা অন্তত তাঁহার এক বড় অংশ শহরে ঢুকিয়া পড়িয়াছিল। তাঁহার ফলে নগরমধ্যে যে আর্তনাদ উঠিয়াছিল বখতিয়ার রাজপ্রাসাদে প্রবেশের পূর্ব্বেই রাজার কর্ণে তাহা প্রবেশ করিয়াছিল। সুতরাং লক্ষ্মণসেন যখন পলায়ন করিয়াছিলেন তখন বখতিয়ারের বহু সৈন্য নগরমধ্যে ছিল। তারপর যখন সকল সৈন্য পৌঁছিল তখনই নদীয়া অধিকৃত হইল। বখতিয়ারের এই দিনকার অভিযানে কেবল এই নগরটিই অধিকৃত হইয়াছিল-সমস্ত বঙ্গদেশ তো দূরের কথা গৌড়ের অপর কোনো অংশই বিজিত হয় নাই।
যখন তুরস্ক আক্রমণের আশঙ্কায় নদীয়ার অধিবাসীরা বৎসরাবধি অন্যত্র পলাইতে ব্যস্ত ছিল তখন এই অশীতিপর বৃদ্ধ রাজা মন্ত্রী, দৈবজ্ঞ ও সভাসদ পণ্ডিতগণের পরামর্শ অগ্রাহ্য করিয়া রাজধানীতেই অবস্থান করিতেছিলেন। সুতরাং প্রজাবৰ্গ অপেক্ষা রাজার শৌর্য্য ও সাহস অনেক বেশী পরিমাণেই ছিল। যখন নগররক্ষীগণের মূর্খতায় বা অন্য কোনো কারণে বিনা বাধায় তুরস্ক সৈন্যগণ রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করিল, তখন অতর্কিত সহসা আক্রান্ত হইয়া বৃদ্ধ রাজার পলায়ন করিয়া আত্মরক্ষা করা ভিন্ন আর কোনো উপায় ছিল না। সুতরাং ইহাকে কোনোমতেই কাপুরুষতার দৃষ্টান্ত বলা যায় না।
মীনহাজুদ্দিনের বিবরণের উপর নির্ভর করিয়া যাহারা লক্ষ্মণসেনের চরিত্রে দোষারোপ করেন তাঁহারা ভুলিয়া যান যে মীনহাজুদ্দিন স্বয়ং তাঁহার বহু সুখ্যাতি করিয়াছেন। তিনি লক্ষ্মণসেনকে হিন্দুস্থানের “রায়গণের পুরুষানুক্রমিক খলিফাস্থানীয়” বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। সুতরাং মীনহাজুদ্দিনের মতে লক্ষ্মণসেন আর্য্যাবর্তের রাজগণের মধ্যে সৰ্ব্বপ্রধান ছিলেন। তিনি পৃথ্বীরাজ ও জয়চাঁদের সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই বলেন নাই, কিন্তু লক্ষ্মণসেনের জন্মকাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করিয়া তাঁহার দানশীলতার সুখ্যাতি ও শাসনরীতির প্রশংসা করিয়াছেন। এমনকি সাধারণত মুসলমান লেখকেরা অমুসলমান সম্বন্ধে যে প্রকার উক্তি করেন না, তিনি লক্ষ্মণসেন সম্বন্ধে তাহাও করিয়াছেন। তিনি তাঁহাকে “সুলতান করিম কুতবুদ্দীন হাতেমুজ্জামান” বা সেই যুগের হাতেম কুতবুদ্দীনের সঙ্গে তুলনা করিয়াছেন এবং আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানাইয়াছেন যেন তিনি “পরলোকে লক্ষ্মণসেনের শাস্তির (যাহা অমুসলমান মাত্রেরই প্রাপ্য) লাঘব করেন।”
সুতরাং মীনহাজুদ্দিনের উক্তি সম্পূর্ণ সত্য বলিয়া গ্রহণ করিলেও লক্ষ্মণসেনের চরিত্র ও খ্যাতি সম্বন্ধে উচ্চ ধারণাই পোষণ করিতে হয়। বখতিয়ার কর্ত্তৃক নদীয়া অধিকারের জন্য যে বৃদ্ধ রাজা অপেক্ষা তাঁহার মন্ত্রী, সৈন্যাধ্যক্ষগণ ও প্রজাবৰ্গই অধিকতর দায়ী যে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ থাকিতে পারে না। যিনি আকৌমার যুদ্ধক্ষেত্রে শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিয়াছিলেন, গৌড়, কামরূপ, কলিঙ্গ, বারাণসী ও প্রয়াগে যাঁহার বীরত্ব খ্যাতি বিস্তৃত হইয়াছিল, মীনহাজুদ্দিনের লেখনী তাঁহার পূত চরিত্রে কলঙ্ক কালিমা লেপন করে নাই।
