লক্ষ্মণসেন যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন তাঁহার বয়স প্রায় ষাট বৎসর। প্রায় ২০ বৎসর রাজত্ব করিয়া এই অশীতিপর বৃদ্ধ রাজা পিতার ন্যায় গঙ্গাতীরে অবস্থান করিবার উদ্দেশ্যে নবদ্বীপে গমন করেন। তাঁহার এই শেষ বয়সে রাজ্যে আভ্যন্তরিক বিপ্লবের সূচনা দেখা যায়। ১১৯৬ অব্দের একখানি তাম্রশাসন হইতে জানা যায় যে, ডোম্মনপাল নামক এক ব্যক্তি সুন্দরবনের খাড়ী পরগণায় বিদ্রোহী হইয়া এক স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিল। এই সময় আর্য্যাবর্তেও বিষম বিপদ উপস্থিত হয়। তুরস্কজাতীয় ঘোর দেশের অধিপতি মহম্মদ ঘোরী চৌহান পৃথ্বীরাজ ও গাহড়বাল জয়চন্দ্রকে পরাজিত করিয়া ক্রমে ক্রমে প্রায় সমগ্র হিন্দুস্থানে নিজের রাজ্য বিস্তার করেন। আর্য্যাবর্তের প্রসিদ্ধ রাজপুত রাজ্যগুলি একে একে বিজেতা তুর্কীগণের পদানত হয়। ক্রমে তুর্কীগণ যুক্তপ্রদেশ অধিকার করিয়া মগধের সীমান্তে উপনীত হইল।
এই ঘোর দুর্দিনে লক্ষ্মণসেন স্বীয় রাজ্য রক্ষার কী উদ্যোগ করিয়াছিলেন তাহা জানিবার কোনো উপায় নাই। বাঙ্গালী অথবা ভারতীয় কোনো লেখক রচিত দেশের এই দুর্যোগময় যুগের কোনো বিবরণই পাওয়া যায় নাই। ইহার অর্দ্ধশতাব্দী পরে তুর্কী বিজেতার সভাসদ ঐতিহাসিক লোকমুখে সেনরাজ্য জয়ের যে কাহিনী শুনিয়াছিলেন তাহা অবলম্বন করিয়াই এই যুগের ইতিহাস রচিত হইয়াছে। আর সেই ইতিহাসেরও প্রকৃত মর্ম গ্রহণ না করিয়া তাঁহার বিকৃত ব্যাখ্যান দ্বারা কেহ কেহ প্রচার করিয়াছেন যে ১৭ জন তুরস্ক অশ্বারোহী বঙ্গদেশ জয় করিয়াছিল এবং এই অদ্ভুত উপাখ্যানে বিশ্বাস করিয়া অনেকেই লক্ষ্মণসেনকে কাপুরুষ বলিয়া হতশ্রদ্ধা করিয়া আসিতেছে। এইজন্যই এই বিষয়টির একটু বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।
.
৫. তুরস্ক সেনা কর্ত্তৃক গৌড় জয়
তবকাৎ-ই-নাসিরী নামক ঐতিহাসিক গ্রন্থে তুরস্কগণ কর্ত্তৃক মগধ ও গৌড় জয়ের সৰ্ব্বপ্রাচীন বিবরণ পাওয়া যায়। গ্রন্থকার মীনহাজুদ্দিন দিল্লীর সুলতানের অধীনে উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন এবং নানা স্থানে ঘুরিয়া সংবাদ সংগ্রহ করিয়া আ ১২৬০ অব্দের কিছু পরে এই ইতিহাস রচনা করেন। গৌড় ও মগধ জয়ের সম্বন্ধে কোনো সরকারী বিবরণ বা দলিল তাঁহার হস্তগত হয় নাই। মগধ জয়ের ৪০ বৎসর পরে লক্ষ্মণাবতী নগরীতে দুইজন বৃদ্ধ সৈনিকের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হয়। ইহারা এই যুদ্ধে যোগদান করিয়াছিল এবং ইহাদের নিকট শুনিয়াই মীনহাজ মগধ জয়ের বিবরণ লিখিয়াছেন। গৌড়ের অভিযানে লিপ্ত ছিল এরূপ কোনো ব্যক্তির সহিত সম্ভবত তাঁহার দেখা হয় নাই। কারণ তিনি কেবলমাত্র বলিয়াছেন যে বিশ্বাসী লোকদের নিকট হইতে তিনি গৌড় বিজয়ের কাহিনী শুনিয়াছেন।
এইরূপে অর্দ্ধশতাব্দী পরে কেবলমাত্র লোকমুখে শুনিয়া মীনহাজ মগধ ও গৌড় জয়ের যে ঐতিহাসিক বিবরণ লিখিয়াছেন তাঁহার সারমর্ম নিম্নে দেওয়া হইল :
“মুহম্মদ বখতিয়ার নামক খিলজীবংশীয় একজন তুরস্ক সেনানায়ক উপযুক্ত কৰ্ম্মানুসন্ধানে মহম্মদ ঘোরী ও কুতবুদ্দিনের নিকট গিয়া বিফলমনোরথ হইয়া অবশেষে অযোধ্যায় মালিক হুসামুদ্দিনের অনুগ্রহে চুনারগড়ের নিকট দুইটি পরগণা জায়গীরপ্রাপ্ত হন। এখান হইতে বখতিয়ার দুই বত্সর যাবৎ মগধের নানা স্থান লুণ্ঠন করেন এবং লুণ্ঠিত অর্থের দ্বারা সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করিয়া অবশেষে দুইশত অশ্বারোহী সৈন্যসহ হঠাৎ আক্রমণ করিয়া ‘কিল্লা বিহার’ অধিকার করেন। ইহার মুণ্ডিত-মস্তক অধিবাসীদিগকে নিহত ও বিস্তর দ্রব্য লুণ্ঠন করার পরে আক্রমণকারীগণ জানিতে পারিলেন যে, ইহা বস্তুত ‘কিল্লা’ বা দুর্গ নহে, একটি বিদ্যালয় মাত্র, এবং হিন্দুর ভাষায় ইহাকে ‘বিহার’ বলে।
“কিল্লা বিহারের লুণ্ঠিত ধনরত্নসহ বখতিয়ার স্বয়ং দিল্লীতে গিয়া কুতবুদ্দিনের সহিত সাক্ষাৎ করেন এবং বহু সম্মান প্রাপ্ত হন। দিল্লী হইতে ফিরিয়া আসিয়া তিনি বিহার প্রদেশ জয় করিয়াছিলেন।
“এই সময়ে রায় লখমনিয়া রাজধানী ‘নদিয়া’তে অবস্থান করিতেছিলেন। তাঁহার পিতার মৃত্যুসময়ে তিনি মাতৃগর্ভে ছিলেন। তাঁহার জন্মকালে দৈবজ্ঞগণ গণনা করিয়া বলিল যে যদি এই শিশুর এখনই জন্ম হয় তবে সে কখনোই রাজা হইবে না, কিন্তু আর দুই ঘণ্টা পরে জন্মিলে সে ৮০ বৎসর রাজত্ব করিবে। এই কথা শুনিয়া রাজমাতার আদেশে তাঁহার দুই পা বাঁধিয়া মাথা নিচের দিকে করিয়া তাঁহাকে ঝুলাইয়া রাখা হইল। শুভ মুহূর্ত উপস্থিত হইলে তাঁহাকে নামানো হয়, কিন্তু পুত্র প্রসবের পরেই তাঁহার মৃত্যু হইল। রায় লখমনিয়া ৮০ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন এবং হিন্দুস্থানের একজন প্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন।
“বখতিয়ার কর্ত্তৃক বিহার জয়ের পরে তাঁহার বীরত্বের খ্যাতি নদীয়ায় পৌঁছিল। দৈবজ্ঞ, পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণগণ রাজাকে বলিলেন, ‘শাস্ত্রে লেখা আছে তুরস্কেরা এ দেশ জয় করিবে, এবং তাঁহার কাল উপস্থিত, সুতরাং অবিলম্বে পলায়ন করাই সঙ্গত।’ রাজার প্রশ্নোত্তরে তাঁহারা জানাইলেন যে তুরস্ক বিজয়ীর চেহারা কিরূপ তাহাও শাস্ত্রে লেখা আছে। গুপ্তচর পাঠাইয়া বখতিয়ারের আকৃতির বিবরণ আনানো হইলে দেখা গেল যে শাস্ত্রের বর্ণনার সহিত ইহার সম্পূর্ণ ঐক্য আছে। তখন বহু ব্রাহ্মণ ও বণিকগণ নদীয়া হইতে পলায়ন করিল, কিন্তু রাজা লখমনিয়া রাজধানী ত্যাগ করিতে স্বীকৃত হইলেন না।
