Sorry to hear that.
আজ তোমাকে আমি শেষ বারের মত নাম্বার দিতে এসেছি। কাল আমার বিয়ে হয়ে যাবে। আমি আর কখনোই তোমাকে নাম্বার দেব না। তোমার পরীক্ষা শেষ।
শেষ পরীক্ষায় কত পেলাম রে মা?
শেষ পরীক্ষায় আমি তোমাকে দিলাম। একশতে একশ দশ। একশতে একশ তুমি এম্নিতেই পেয়েছ। দশ আমি দিলাম নিজের থেকে। খুশি হয়ে।
মীরা কাঁদছে। ইয়াসিন সাহেব অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আছেন। ক্ৰন্দসী। কন্যাকে তার দেখতে ইচ্ছা করছে না। কন্যার ক্রান্দসী রূপের সঙ্গে তার পরিচয় নেই।
কফি খাবি মা? আজ বিশেষ এক রাত কাজেই Natural heading বই এর নিয়ম ভঙ্গ করে কফি খাওয়া যায়। কফি খেতে খেতে গল্প করা।
কফি খেতে ইচ্ছা করছে না বাবা।
ইচ্ছা না করলেও খা।
মীরা বলল, তুমি বোস আমি বানিয়ে আনছি।
ইয়াসিন সাহেব বললেন, ঘরে না বসে ছাদে বসলে কেমন হয়? আকাশে চাঁদ আছে কিনা জানি না। চাঁদ থাকলে খুব ভাল লাগবে।
আমার সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠতে ইচ্ছা করছে না। তোমার যখন ইচ্ছা— চল।
আকাশে চাঁদ নেই। আর থাকলেও চাঁদ দেখা যেত না। আকাশ মেঘে ঢাকা। বাতাস দিচ্ছে। বাতাস মেঘ উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে না, বরং আরো মেঘ জড় করছে।
ইয়াসিন সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, আজ প্রচণ্ড বর্ষণ হবে। বুঝলি মীরা এসি ঘরে বাস করার জন্যে ঝুম বৃষ্টি কখনো বুঝতেই পারি না। আমি ভেবে রেখেছিলাম তোর বিয়ের পর গ্রামে গিয়ে থাকব। টিনের ঘর থাকবে। টিনের ছাদে বৃষ্টি – অসাধারণ ব্যাপার।
আমার কারণে তোমার এই শখ মিটাতে পারছিলে না?
তা না। তবে তুই নিশ্চয়ই— আমার সঙ্গে গ্রামে গিয়ে থাকতে রাজি হতি না।
মীরা কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলল, গ্রামে টিনের ঘরে গিয়ে থাকার শখটা তোমার না বাবা। এই শখটা মার। তুমি ছাদে তার শখ মিটাতে।
ইয়াসিন সাহেব চুপ করে রইলেন। মীরা বলল, আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে মারি প্রতি তোমার এই ভালবাসা কতটুকু সত্য।
সত্য হবে না কেন?
সত্য না হবার সম্ভাবনা আছে। মানুষ অনেক সময় দায়িত্ব পালনের মত ভালবাসে। সে বিশ্বাস করে তার ভালবাসা সত্য ও সুন্দর। আসলে তা না।
ইয়াসিন সাহেব ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি তোর মত জ্ঞানী না মা। তোর কথা সত্যি হতেও পারে। তবে তোর মা প্রায়ই বলত গ্রামে টিনের ঘরে বর্ষ। কাটাতে। কথাটা আমার মাথার মধ্যে ঢুকে গেছে। সত্য ভালবাসার কারণে ঢুকেছে, না দায়িত্ব পালনের জন্যে ঢুকেছে তা জানি না। জানতেও চাই না।
জাহানারার জ্বর এসেছে
জাহানারার জ্বর এসেছে।
এমন কিছু না, থার্মোমিটার একশ হয়ত উঠবে না, কিন্তু তিনি বিছানায় পড়ে গেছেন এবং কাতরাচ্ছেন। মাথায় ঘূর্ণির মত হচ্ছে। মনে হচ্ছে তিনি নৌকায় বসে আছেন। নদীতে প্রবল ঢেউ উঠেছে। তিনি কেবলি ওঠা-নমা করছেন।
তিনি বিনুকে ডাকলেন। বিনু সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকাল। উদ্বিগ্ন গলায় বলল, কী হয়েছে? জ্বর এসেছে? তিনি জবাব দিলেন না। বিনুকে দেখে এখন তাঁর বিরক্ত লাগছে। সে জ্বর দেখার জন্যে হাত বাড়াতেই তিনি বললেন, গায়ে হাত দিও না তো। কেউ গায়ে হাত দিলে আমার ভাল লাগে না। বিনু বলল, ডাক্তারকে খবর দিব?
জাহানারা। থমথমে গলায় বললেন, ডাক্তারকে খবর দিতে হলে আমি খবর দিব। তোমাকে খবর দিতে হবে কেন? তুমি কে?
এ ধরনের অপমানসূচক কথা শোনার পর বিনুর দাঁড়িয়ে থাকার কথা না। কিন্তু সে দাঁড়িয়ে আছে। বিনু বলল, জ্বর মেপেছেন?
জাহানারা বললেন, না।
জ্বর মাপার থার্মোমিটার জাহানারার সাইড টেবিলের ড্রয়ারে থাকে। সেখানে পাওয়া গেল না। বিনু ব্যস্ত হয়ে থার্মোমিটার খুঁজছে। জাহানারা ভুরু কুঁচকে বিনুর দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর ইচ্ছা কঠিন কোনো কথা বলে বিনুকে আহত করা। কঠিন কথাগুলি মনে আসছে না। তাছাড়া তিনি চাচ্ছেনও না বিনু তাঁর ঘরে থাকুক। শুভ্র তার মার অসুখের খবর পেয়েছে। সে মাকে দেখতে আসবে। মায়ের বিছানার কাছে চেয়ার টেনে বসবে। মাতা-পুত্রের কথার মাঝখানে তৃতীয় কারোর থাকা छेद्धि ना।
জাহানারা বললেন, বিনু আমি বাঁচি না মাথার যন্ত্রণায়— তুমি কী খটখট শুরু করেছ? কী খোঁজ?
থার্মেমিটার।
তোমাকে ডাক্তারনী সাজতে হবে না। তুমি ঘর থেকে যাও। শুভ্রর সকালের চা আমার ঘরে পাঠাবার ব্যবস্থা কর। তাহলেই হবে।
বিনু বলল, উনি নেই। বের হয়ে গেছেন।
জাহানারা হতভম্ব হয়ে বললেন, ও কখন গেল?
দশ মিনিট আগে।
আমার শরীর খারাপ করেছে এটা কি সে জানে?
জ্বি জানেন। আমাকে বলে গেছেন ডাক্তার আনার ব্যবস্থা করতে।
আমাকে দেখে যাবার কথা তার মনে হল না?
উনার অফিসে কী-না-কী জরুরি কাজ আছে। চাচি আপনাকে এক কাপ আদা চা দেব?
জাহানারা যন্ত্রের মত বললেন, দাও।
তার হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছে। এসব কী হচ্ছে? শুভ্ৰ জানে তাঁর জ্বর। তারপরেও সে ঘরে উঁকি না দিয়েই চলে গেল? এ রকম তো কখনো হয় নি। প্রথম হল। প্ৰথমের পরই দ্বিতীয় আসে, দ্বিতীয়র পরে আসে তৃতীয়। হচ্ছেটা কী? বিনুর সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে আলাপ করবেন? না, তা কেন করবেন? বিনু কে? বিনু কেউ না। তাদের ব্যক্তিগত কোনো কিছুর সঙ্গেই বিনুর যোগ থাকবে না। বিনু ছাড়া আর কে আছে যার সঙ্গে কথা বলা যায়! ঢাকা শহরে তাঁর আত্মীয়স্বজনের অভাব নেই। কোনো একটা খবর পেলেই এরা বীকে বাকে কাকের মত উড়ে আসে। চা-নাশতা খায়, বিজ্ঞের মত কথা বলে। অসহ্য।
