বিনু চা নিয়ে ঢুকল। এক হাতে চা অন্য হাতে একটা থার্মোমিটার; জাহানারা বললেন, থার্মেমিটার কোথায় পেলে?
কিনিয়েছি।
আগেরটা পাওয়া যাচ্ছে না বলে ফন্ট করে নতুন কিনে ফেললে? অন্যের টাকা বলে মায়া নেই তাই না? সরকারি মাল, দরিয়ামে ঢাল।
বিনু কিছুই বলল না। প্রায় যন্ত্রের মতই থার্মোমিটার এগিয়ে দিল। জাহানারা থার্মেমিটার মুখে দিলেন। এখন তাঁর মনে হচ্ছে জ্বর চেপে আসছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। বমি ভাবও হচ্ছে। তবে খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার নৌকার দুলুনির মত অবস্থাটা আর নেই।
বিনু বলল, আপনার সঙ্গে একটা মেয়ে দেখা করতে এসেছে! আরেকদিন আসতে বলব?
জাহানারার ইচ্ছা করছে হাত বাড়িয়ে বিনু মেয়টার গালে একটা চড় মারেন। তাঁর মুখে একটা থার্মোমিটার ঢুকিয়ে সে ইচ্ছা করে প্রশ্নটা করেছে যাতে তিনি জবাব দিতে না পারেন। কী রকম বজ্জাত একটা মেয়ে! বজ্জাত মেয়েটার অস্থি মজ্জায়। এইসব মেয়েদের একমাত্র অষুধ হল সকাল বিকাল চড় থাপড় দেয়া।
জ্বর একশ এক। এমন কিছু বেশি না, কিন্তু জ্বর বাড়ছে। জাহানারা লক্ষ করলেন তাঁর নিঃশ্বাসের কষ্ট শুরু হয়েছে। এটা নতুন এক উপসর্গ। শরীর একটু খারাপ করলেই নিঃশ্বাসের কষ্ট শুরু হয়।
মেয়েটা কে?
আমি চিনি না।
আমার কাছে চায় কী?
জিজ্ঞেস করি নি।
জিজ্ঞেস করবে না কেন? না-কি জিজ্ঞেস করলে তোমার সম্মান যাবে? মানসম্মান নিয়েতো তালগাছের ওপর বসে আছ। এতদিন এখানে পড়ে আছ। কেউতো খোঁজ নিতেও আসে না। কীসের আশায় তুমি পড়ে আছ?
বিনু চুপ করে আছে। তার মুখ ভাবলেশহীন। কে কী বলছে বা বলছে না তা যেন সে শুনছে না। বা শোনার প্রয়োজন বোধ করছে না। জাহানারা বললেন, যাও মেয়েটাকে এখানে নিয়ে এসে।
আপনার শরীরটা খারাপ, তাকে বরং আরেকদিন আসতে বলি?
মাতব্বরি করবে না। মাতব্বরি আমার ভাল লাগে না। তাকে এখানে নিয়ে এসো।
এখানে আনার দরকার নেই। আপনি একটু কষ্ট করে নিচের বসার ঘরে চলুন।
এত কথা বলছি কেন? তাকে নিয়ে আসতে বললাম নিয়ে আস। হড়বড় করে এত কথার দরকার কী? বেশি কথা বলা অভ্যাস হয়ে গেছে? কথা না বললে পেটের ভাত হজম হয় না? অসুস্থ শরীরে আমি নিচে যাব? আমাকে কোলে করে কে নিয়ে যাবে–তুমি?
বিনু চলে গেল। জাহানারা খাটে হেলান দিয়ে বসলেন। অপরিচিত একটা মেয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। কে এই মেয়ে? শুভ্রর পরিচিত কেউ? মীরা নাতো? শুভ্র যার গলার হাসি রেকর্ড করে এনেছিল। কী যে পাগল ছেলে! মানুষ রাত জেগে ক্যাসেটে গান শুনে। এই ছেলে শুনে হাসি। একবার রাত তিনটায় খিলখিল হাসির শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। শুভ্রর ঘর থেকে হাসির শব্দ আসছে। তিনি জানেন ক্যাসেটে রেকর্ড করা হাসি, তারপরেও ভয়ে তার হাত পা ঠাণ্ড হয়ে গিয়েছিল। নিশি রাতে মেয়েদের উঁচু গলার হাসি খুবই ভয়ঙ্কর। যেই কন্যা নিশিরাত্ৰিতে শব্দ করিয়া এবং শরীর দুলাইয়া হাসে, সেই কন্যা স্বামী ঘাতাকিনী। লক্ষণ বিচার বইতে এই কথা পরিষ্কার লেখা আছে।
জাহানারা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। কী সুন্দর মেয়ে! পাতলা ঠোঁট। বড় বড় চোখ। গায়ের রঙও কত ভাল। ধবধবে সাদা না, অন্যরকম সাদা! চুল লম্বা, সেই চুলে সামান্য খয়েরি আভা আছে। অতিরিক্ত ফর্স মেয়েদের চুলের রঙে সব সময় এই সমস্যাটা হয়। জাহানারা খুব আগ্রহ নিয়ে মেয়েটার চোখের মণির দিকে তাকালেন। অসম্ভব রূপবতীদের কোনো-না-কোনো সমস্যা থাকেই। দেখা যায় তাদের চোখে ট্যারা ভাব থাকে, চোখের মণি হয় কটা। দাঁতের সমস্যা তো থাকেই। দাঁত ফাঁক থাকে, গোঁজা দাঁত থাকে। এই মেয়েটার দাঁত কেমন বোঝা যাচ্ছে না, কারণ এখনো দাঁত দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটা যেভাবে ঠোঁট চেপে আছে তাতে মনে হয় দাঁতে সমস্যা আছে। অনেক রূপবতী মেয়ে আছে যাদের সবই সুন্দর, দাঁতও সুন্দর; শুধু তারা যখন হাসে তখন মাঢ়ি বের হয়ে যায়। এ রকম কিছু নাতো?
জাহানারা আগ্রহ নিয়ে বললেন, মা বোস। এই চেয়ারটায় বোস।
মেয়েটা বসল। তিনি ভেবেছিলেন বসার সময় মেয়েটা সামান্য হলেও হাসবে, সেই সুযোগে তিনি মেয়েটার দাঁতগুলি দেখে ফেলতে পারবেন। তাঁর মনের খুঁতখুঁতনিটা দূর হবে। মেয়েটার দাঁত না দেখা পর্যন্ত তাঁর অস্থির ভাব যাচ্ছে না।
আমি কি তোমাকে চিনি?
মেয়েটা বলল, না, চিনেন না। তবে আমি আপনাকে চিনি।
জাহানারা মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। এইবার মেয়েটা হোসেছে। তার দাঁত ঠিক আছে। এবং গলার স্বরও সুন্দর। একটু ভারী। মনে হয় ঠাণ্ডায় বসে। যাওয়া গলা। তারপরেও ভাল। জাহানারা লক্ষ করলেন মেয়েটা খুব আগ্রহ নিয়ে ঘর দেখছে। সাজসজ্জা দেখছে। দেয়ালে টানানো ছবিগুলি দেখছে। জাহানারা বললেন, এইটা আমার ছেলের ছবি। শুভ্ৰ। ও যখন কলেজে। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে তখন তোলা ছবি।
আমি উনাকে চিনি।
তুমি কি তার সঙ্গে পড়?
জ্বি না। তোমার নাম কী মা?
নাম বললে আমাকে চিনতে পারবেন বলে মনে হয় না। আমার নাম আসমানী।
জাহানারা তাকিয়ে আছেন। তাঁর কাছে মনে হচ্ছে খাটটা দুলছে। খাটের দুলুনির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীর দুলছে এবং মাথার ভেতরটা দ্রুত ফাঁকা হতে শুরু হয়েছে। বুক শুকিয়ে গেছে। পানির তৃষ্ণা হচ্ছে। কেউ যদি বরফ মেশানো এক গ্লাস পানি দিত! বিনু নেই কেন? সে থাকলে তার দিকে তাকিয়ে একটু ভরসা। পাওয়া যেত। তিনি কি ডাকবেন বিনুকে? আচ্ছা এই জন্যেই কি বিনু মেয়েটাকে শেবার ঘরে আসতে দিতে চায় নি? বিনু কি চিনতে পেরেছিল মেয়েটাকে? অবশ্যই চিনতে পেরেছে। গরম লাগছে কেন? মনে হচ্ছে তিনি জ্বলন্ত চুলার সামনে বসে আছেন। মুখে শীত লাগছে, কিন্তু পিঠের দিকে ঠাণ্ডা লাগছে।
