এখানেই বল। এখানের পরিবেশটিাতো আমার কাছে খারাপ লাগছে না। রাস্তার পাশে গ্ৰাম্য ধরনের চায়ের দোকান। আকাশ মেঘমেদুর। এই রোদ এই মেঘ। আমার শরীরটাও এখন ভাল। শরীরটাকে নতুন কেনা গাড়ির মত ফিট মনে হচ্ছে।
মনের অবস্থা কী? মনটা কি ফিট?
আমার মন সব সময়ই ফিট। শরীর খারাপ থাকলেও ফিট। শরীর ভাল থাকলেও ফিট। আমার মনের সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক নেই। বল তোমার কথা।
আমি বিয়ে করার কথা ভাবছি।
কেন?
বয়স হয়েছে সেই কারণেই বোধহয়। রাত দুপুরে ঘুম ভাঙলে খুবই লোনলি লাগে। কথা বলার মানুষের জন্যে মন টানে।
তোমার বিছানার পাশেই তো টেলিফোন। একগাদা নাম্বার তোমার মুখস্থ। যে কাউকে টেলিফোন করলে সে খুব আগ্রহ নিয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলবে।
যার সঙ্গে কথা বলব তাকে ছুঁতে ইচ্ছা করে। মুখে কথা বলব। কিন্তু একটা হাত থাকবে তার গায়ে; তুমি মেয়ে বলে আমার ফিলিংসটা বুঝতে পারছ না। পুরুষদের এই ফিলিংস শুধুমাত্র পুরুষরাই বুঝতে পারে।
মীরা বলল, তোমাকে আমি একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দেই। গভীর রাতে তোমার যদি কথা বলার ইচ্ছা করে তুমি টেলিফোনে তোমার পছন্দের কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বলবে। তখন গায়ে হাত রাখার জন্যে তোমার কাজের মেয়েটিকে রাখবে সামনে। সাপও মরাল, লাঠিও ভাঙল না।
আখলাক বললেন, তোমাকে সরাসরি কথাটা বলি। জল স্পর্শ না করে জলের উপর উড়াউড়ি আমার ভাল লাগছে না। I want to marry you. আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
কেন তুমি কি আমার প্রেমে পড়েছ?
না। আমি তোমার প্রেমে পড়ি নি। প্রেমে কীভাবে পড়তে হয় আমি জানি না। তোমাকে আমার পছন্দ এইটুকু বলতে চাই। বেশ পছন্দ। May be তোমার শরীরটাই আমার পছন্দ।
তোমাকেও আমার পছন্দ।
তাহলে বিয়েতে বাধা কোথায়?
মীরা বলল, বাধা আছে। বিশাল বাধা। সেই বাধাটা হল শুভ্ৰ।
শুভ্র বাধা হবে কেন? Is he in ove with you?
না। শুভ্ৰর স্বভাবও অনেকটা তোমার মত— সেও কাউকে ভালবাসতে পারে না। শুভ্রর সঙ্গে তোমার অনেক মিল আছে।
আখলাক শান্ত গলায় বললেন, হ্যাঁ তা আছে। আমরা দুজন সম্পূর্ণ দুমেরুতে বাস করছি। তারপরেও আমাদের মধ্যে অনেক মিল। একটা সময় ছিল যখন আমি খারাপ পাড়ায় রাত কাটাতাম। নেশা টেশা করতাম। এখন শুনছি শুভ্রও তাই করছে। শুভ্রর সাম্প্রতিক কাণ্ডকারখানা কি তুমি জান?
হ্যাঁ, জানি।
মীরা হাসতে হাসতে বলল, চল গাড়িতে উঠি। তোমার সঙ্গে লং ড্রাইভে এসে খুব ভাল হয়েছে। শরীরটা ঘেমে গেছে। আমার নিজের শরীরটার জন্যেও ঝাঁকি দরকার ছিল। আমি শরীর নির্ভর মানুষ। আমার শরীর চলে যাওয়া মানে সবই চলে যাওয়া। থ্যাংক য়্যু।
ইয়াসিন সাহেব ঘুমুতে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রস্তুতি পর্ব বেশ দীর্ঘ। দাঁত ব্রাশ করেন। সুতা দিয়ে ফ্লস করেন। গরম পানি দিয়ে হাত মুখ ধোন। মেপে মেপে ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ লিটার পানি খান। পানি খাবার পর এক পেগ রোড ওয়াইন খান। তাঁর মদ্যপানের নেশা নেই। রেড ওয়াইন খান হার্ট ঠিক রাখার জন্যে। অষুধ হিসেবে রেডিওয়াইন খেতে হয়। ঘুমুতে যাবার আগে। এইসব নিয়ম কানুন তিনি পেয়েছেন। Natural Heading নামের একটা বিখ্যাত বই থেকে। বইটি তিনি আমেরিকা থেকে এনেছেন। সেখানে এই বই টু মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। টু মিলিয়নের একটি আছে তাঁর কাছে। শুধু যে আছে তা না। তিনি বইটা মন দিয়ে পড়ছেন। নিয়ম কানুন মেনে চলছেন। নিজস্ব কিছু নিয়মও তার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। যেমন ঠিক ঘুমুতে যাবার আগে আগে নিম গাছের ডাল দিয়ে শেষবার দাঁত মাজেন।
ঘুমুতে যাবার সব প্ৰস্তুতি তিনি শেষ করেছেন। নিমগাছের ডাল দিয়ে দাঁত মাজা শেষ হয়েছে। এখন তিনি অপেক্ষা করছেন যে দুগ্ৰাস পানি খেয়েছেন সেই পানি বের হয়ে যাবার জন্যে। পেট ভর্তি পানি নিয়ে ঘুমুতে গেলে মাঝ রাতে ঘুম ভাঙবে। একবার ঘুম ভাঙলে তাঁর আর ঘুম আসে না। একা জীবন যাপন করার এই সমস্যা। একাকীত্বটা ধরা পড়ে। শুধু রাতে ঘুম ভাঙার পর।
দরজার পর্দা সরিয়ে মীরা ঢুকল। বাবার সামনে বসতে বসতে বলল, আজকের মত Natural Healing treatment কি শেষ হয়েছে?
হুঁ।
ঘুমুতে যাচ্ছে না কেন? অপেক্ষাটা কীসের? শেষ বাথরুম এখনো হয় নি?
না।
গল্প করতে এসেছি।
বিশেষ কোনো গল্প?
হ্যাঁ। আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি বাবা।
সেই ভাগ্যবান মানুষটা কে? আমি চিনি? শুভ্ৰ?
না শুভ্ৰ না। আর্কিটেক্ট আখলাকুর রহমান।
মনস্থির করে ফেলেছিস?
হ্যাঁ।
বিয়েটা কবে?
আগামীকাল। দুজনে মিলে কোনো একটা কাজি অফিসে যাব। তুমি হবে সাক্ষীদের একজন।
কোনো উৎসব হবে না?
না। এই বিয়ে টিকবে না বাবা। কাজেই হাস্যকর উৎসবের কোনো অর্থ হয় না।
যে বিয়ে টিকবে না। সেই বিয়েটা না করলে হয় না?
উঁহু। হয় না।
বিয়েটা করতে চাচ্ছিস কেন?
জানি না কেন?
না জেনে তুই কিছু করবি বিশ্বাস হচ্ছে না।
মীরা ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বাবা আমি জানি। কিন্তু তোমাকে বলতে চাচ্ছি না।
আমার মেয়ে তাহলে বিয়ে করতে যাচ্ছে!
হ্যাঁ।
My good wishes for you.
মীরা উঠে দাঁড়াল। আবার বসে পড়ল। মীরা বলল, বাবা শোন ছোটবেলা থেকে আমি তোমাকে নিয়ে একটা খেলা খেলতাম। খেলাটার নাম দিয়েছিলাম–Marking game. বিভিন্ন সময়ে বাবা হিসেবে তোমাকে নাম্বার দিতাম। একশর ভেতর নাম্বার দেয়া হত। সব সময় তুমি আমার কাছ থেকে কম নম্বর পেতে। একশতে চল্লিশের উপায় নম্বর আমি তোমাকে কখনোই দিতে পারি নি।
