মীরা সিট বেল্ট পরল। ক্যাসেট প্লেয়ার বন্ধ করল। আখলাক সাহেব বললেন, জানালার সব কাচ নামিয়ে দাও। দরজা আনব্লক করা। গাড়ি যদি উল্টে যায় দরজা ফুলক থাকলে বের হওয়া যাবে না। তোমার ভয় লাগছে নাতো?
না।
আমি তৈরিই আছি।
তুমি সময়মত ট্রাকের সামনে থেকে সরে আসতে পারবে তো?
অবশ্যই পারব। শুধু যদি ট্রাক ড্রাইভার তার সামনে হঠাৎ একটা গাড়ি চলে আসতে দেখে ভড়কে গিয়ে ব্রেকের বদলে একসিলেটরে চাপ দেয় বা আমি যেদিকে গাড়ি সরাচ্ছি। সেও সেদিকে সরায়। সে রকম কিছু ঘটলে ভিন্ন কথা।
এ রকম কিছু ঘটলে তুমি কী করবে? বিকল্প ব্যবস্থা কি ভাবা আছে?
হ্যাঁ আছে। জরুরি বিকল্প ব্যবস্থাগুলি নির্ভর করে পরিস্থিতির উপর।
মীরা লক্ষ করল তার পাশে স্টিয়ারিং হুইল ধরে থাকা মানুষটা বড় বড় করে নিঃশ্বাস ফেলছে। এবং গাড়ির স্পীড ক্রমেই বাড়ছে। মীরা বলল, তুমি এ রকম করে নিঃশ্বাস নিচ্ছ কেন?
আখলাক বলল, বেশি করে অক্সিজেন নিয়ে নিচ্ছি। ব্ৰেইনে যেন প্রচুর অক্সিজেন থাকে সেই ব্যবস্থা। অক্সিজেনের অভাব হলে লজিক্যালি চিন্তা করা যায় না। দূরে তাকিয়ে দেখ একটা ট্রাক আসছে। এই ট্রাকটাকে আমি টার্গেট করলাম।
মীরা লক্ষ করল আখলাকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। হাত সামান্য কাঁপছে। চোখের দৃষ্টি স্থির। মাথা স্টিয়ারিং হুইলের দিকে সামান্য ঝুঁকে এসেছে; মানুষটা অতি বিপদজনক একটা খেলা খেলতে যাচ্ছে। যে খেলা যত বিপদজনক ততই তার মজা। গভীর বনে মানুষ বাঘ শিকার করতে যায়। সে জানে যে-কোনো মুহুর্তে একটা বাঘ উল্টো দিক থেকে এসে তার ঘাড়ে ঝাপিয়ে পড়তে পারে। সে বিপদের ব্যাপারটা জানে বলেই শিকার শিকার খেলাটা তার কাছে মজার বলে মনে
হয়।
ট্রাক প্রায় চলে এসেছে। মীরা লক্ষ করল তার মুখ দিয়ে গরম বাতাস বের হচ্ছে। আখলাক বলল, মীরা ভয় লাগছে?
মীরা বলল, সামান্য লাগছে। তবে যতটা লাগবে ভেবেছিলাম ততটা লাগছে না। I am enjoying the game.
মীরা চোখ বন্ধ করে রাখ। আমি এক্ষুণি গাড়ি নিয়ে ট্রাকটার সামনে চলে যাব। তারপর ট্রাকটাকে পাশ কাটিয়ে উল্টো দিকের মাঠে গাড়ি নিয়ে যাব। খানিকটা ফাঁকা জায়গা পাওয়া গেছে, কাজেই কোনো সমস্যা নেই। বিসমিল্লাহ বলতে চাইলে বলতে পায়। রেডি গোট সেট গো।
গাড়ি ঝড়ের মত ট্রাকের সামনে চলে গেল। মীরা কোনো দিকে তাকাচ্ছে না। সে তাকিয়ে আছে হতভম্ব ট্রাক ড্রাইভারের দিকে। ট্রাক ড্রাইভার এমন বিস্ময়কর দৃশ্য অনেকদিন দেখে নি।
মীরাদের গাড়ি রাস্তার পাশের ফাঁকা জায়গাটায় কান্ত হয়ে আছে। মীরা এবং আখলাক সাহেব দুজনই গাড়ির বাইরে। বিশ পঁচিশ গজ দূরে ট্রাকটা থেমে আছে। মীরাদের ঘিরে ছোটখাট একটা ভিড়। আখলাক সিগারেট টানছেন। তাঁর মুখ বিষণ্ণ। তিনি ট্রাক ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাই হঠাৎ করে আমার মাথাটা ঘুরে গেছে। চোখের সামনে দেখি অন্ধকার। এরপর আমার কী হয়েছে কিছুই মনে নাই। আপনি যে হার্ডব্রেক করতে পেরেছেন এটা বিরাট ব্যাপার।
ট্রাক ড্রাইভার অল্প বয়েসী। এত বড় বিপদের মুখোমুখি সে সম্ভবত আগে কখনো হয় নি। তার চোখে ঘোর লেগে আছে। সে পিচ করে থুথু ফেলল।
আখলাক সিগারেটের প্যাকেট ট্রাক ড্রাইভারের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললেন, নেন ভাই আমার কাছ থেকে একটা সিগারেট খান।
ট্রাক ড্রাইভার সিগারেট নিতে নিতে বলল, আপনে ভাল ড্রাইভার। আমি হার্ড ব্ৰেক দেওনের আগেই আপনি গাড়ি নিয়া মাঠে নেমেছেন। শখের ড্রাইভার এই কাজ পারবে না।
আখলাক বললেন, আল্লাহ বাঁচায়ে দিয়েছে।
ট্রাক ড্রাইভার বলল, এইটা সত্য। আল্লাহ না বাঁচালে বাঁচা সম্ভব না। আপনের কী হয়েছিল বললেন— আন্ধাইর দেখছেন?
জ্বি অন্ধকার। হঠাৎ সব অন্ধকার হয়ে গেল।
এর নাম আঁধি লাগা। মাঝে মাঝে গাড়ির ড্রাইভাররা আন্ধাইর দেখে। বেশির ভাগ সময় রাইতে হয়। হাই বীম দিয়া হেড জ্বালাইয়া চলতেছেন। হঠাৎ মনে হইব- হেড লাইট নিভা। চউখে কিছুই দেখা যায় না। চউখের উপর পর্দা পাইরা যায়।
আখলাক বললেন, আপনার দেরি করায়ে দিলাম। আপনি চলে যান। আমি এখানে কিছুক্ষণ থাকব। মাথাটা ঠাণ্ডা হলে তারপর যাব।
চা খান। গরম চা খেলে উপকার হবে। আর ভাই সাহেব শুনেন বাড়িতে গিয়া একটা মুরগি সদাগ দেন।
আখলাক কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, মুরগি সদগা। অবশ্যই দেব। যাই দেখি চায়ের দোকান পাই কি-না।
ট্রাক ড্রাইভার বলল, একটু সামনে গেলেই পাইবেন। ইদারিসের একটা দোকান আছে, ভাল চা বানায়।
ধন্যবাদ। দেখি ইদারিসের দোকানেই যাই। আপনি কি আরেকটা সিগারেট নেবেন?
মীরা ইদারিসের দোকানের সামনে একটা বেঞ্চিতে বসে আছে! আখলাক চা খাচ্ছেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আখলাক বললেন— মীরা তোমার অসুস্থ ভাবটা দূর হয়েছে না?
মীরা বলল, হ্যাঁ।
সত্যি সত্যি দূর হয়েছে, না-কি এমনি বলছ?
সত্যি সত্যি দূর হয়েছে।
আমার বাকি চিকিৎসা কেমন দেখলে?
ভাল।
আমি তোমার সাহস দেখেও মুগ্ধ হয়েছি। আমি কল্পনাও করি নি তুমি রাজি হবে। এবং শেষ পর্যন্ত চোখ খোলা রেখে তাকিয়ে থাকবে।
আমি সাহসী মেয়ে। অবশ্যি তেলাপোকা দেখে এখনো ভয় পাই।
আখলাকের চা শেষ হয়েছে। তিনি আরেক কাপ চা নিতে নিতে বললেন, মীরা তোমাকে নিয়ে আমি আজ যে বেড়াতে বের হয়েছি তার একটা কারণ আছে। কারণটা বলব?
বল।
গাড়িতে যেতে যেতে বলি– না-কি এখানেই বলব?
