না।
ভাং-এর সরবত দিয়ে তুমি আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলে। সারারাত আমি মরার মত ঘুমুলাম। এখন বলছি তুমি কৌশল কর নি!
আমি কোনো কৌশল করি নাই। আপনের খুব ইচ্ছা করতেছিল এখানে রাত কাটাবার। সাহস করে কথাটা বলতে পারতেছিলেন না। আমি সেই সাহসটা দিয়েছি।
শুভ্ৰ শান্ত গলায় বলল, আমার খুব ইচ্ছা করছিল এখানে থাকার?
আসমানী হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
শুভ্র বলল, সেটা কী করে বুঝে ফেললে?
ইচ্ছা করতেছিল বলেই আপনি বলামাত্র থেকে গেলেন। একবারও আপত্তি করলেন না। ঘুম থেকে উঠেও কিছু বলেন নাই।
সব মানুষ এক রকম না। একেক মানুষ একেক রকম।
আসমানী শব্দ করে হাসল। শুভ্র বলল, তুমি হাসছ কেন? আসমানী বলল, আপনের কথা শুনে হাসতেছি।
হাসার মত কী বললাম?
আপনের ধারণা আপনে অন্যদের চেয়ে আলাদা। আপনে মোটেই আলাদা না। সব মানুষই এক রকম। যদিও তারা মনে করে তারা একেক জন একেক রকম। এইটা মনে করে সে আনন্দ পায়।
তুমি কী করে বুঝলে সবাই এক রকম?
আমার পক্ষে বোঝা সবচে সহজ। কত পুরুষের সাথে আমি বসি। চা ঠিক আছে?
হ্যাঁ ঠিক আছে।
চিনি ঠিক হইছে?
হ্যাঁ।
আসমানী আবারো শব্দ করে হেসে ফেলল। শুভ্র বলল, হাসছ কেন? আসমানী বলল, আপনের চায়ে আমি এক দানা চিনি দেই নাই। অথচ আপনে বলছেন চায়ে চিনি হইছে। এই জন্যে হাসতেছি। আপনে এখন একবার চুমুক দিন
শুভ্ৰ চায়ে চুমুক দিল। আসলেই চায়ে কোনো চিনি নেই। আসমানী এখনো হাসছে। তবে এখন আগের মত শব্দ করে হাসছে না। নিঃশব্দ হাসি। শুভ্ৰ বলল, তুমি এই কাজটা কেন করলে?
দেখার জন্যে যে আপনে বুঝতে পারেন কি না।
তুমি কি অনেকের সঙ্গেই এই কাজটা করি?
হ্যাঁ।
কেন করে?
একবারতো বললাম, মজা করার জন্যে করি।
কীসের মজা?
কীসের মজা সেটা আরেক দিন বলব। আইজ না।
আজই বল। শুনে যাই।
আইজ না। আরেক দিন। আপনার ম্যানেজারের খুব রাগ হইতেছে। আপনে আইজ চলে যান। আপনের আগের ম্যানেজারটা ভাল ছিল। রাগারগি কম করত—এই ম্যানেজারের রাগ বেশি। খালি ছ্যাঁৎ ছ্যাঁৎ করে। আমি এই ম্যানেজারের নাম দিলাম ছাঁৎ ম্যানেজার।
শুভ্রর যেতে ইচ্ছা করছে না। সে চিনি ছাড়া চায়ে চুমুক দিচ্ছে। চা-টা খেতেও তার খারাপ লাগছে না। ভালই লাগছে।
জাহানারার মনে হল তাঁর মুখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছে। শুধু মুখ না, সারা শরীর দিয়েই বের হচ্ছে। বাথটাব ভর্তি পানি নিয়ে সেই পানিতে গলা পর্যন্ত ড়ুবিয়ে বসে। থাকতে পারলে ভাল হত। সেটা সম্ভব না। বাথটাবের পানিতে তিনি গোসল করতে পারেন না; শরীরের ময়লা পানিতে মেশে। সেই নোংরা পানিই আবার গায়ে দেয়া— কী কুৎসিত, কী নোংরা! তিনি এখন বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। দুহাতে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিচ্ছেন। তাতে মুখের গরম কমছে না। সারা মুখে বরফ ঘষলে গরমটা বোধহয় কমত। ফ্রিজে বরফ নেই। বরফের ট্রে-টা খালি।
বিনু কাছে এসে দাঁড়িয়ে আছে। সে তাঁকে কৌতূহলী চোখে দেখছে। এমনভাবে দেখার কী আছে! তিনি অস্বাভাবিক কিছু তো করছেনও না। চোখে মুখে পানি দিচ্ছেন। এটা নতুন কিছুও তো নয়। মাঝে মধ্যেই তাঁর মনে হয় চোখ মুখ দিয়ে আগুনের হালকা বের হচ্ছে। ডাক্তারের সঙ্গে কথাও হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন। এটা স্নায়ুর একটা অসুখ। স্নায়ুর অসুখ তো মানুষের হতেই পারে। এই অসুখের সঙ্গে শুভ্ৰর কোনো সম্পর্ক নেই। শুভ্র একটা রাত বাইরে কাটিয়েছে এটা এমন কোনো ব্যাপার না। ছেলে বড় হয়েছে। মাঝে মধ্যে সে বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে থাকবে। এটাই স্বাভাবিক।
বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে বসলে সময়ের হিসেব থাকে না, রাত হয়ে যায়। এত রাতে ফেরার চেয়ে না ফেরাই ভাল। তবে খবরটা দিতে পারত। শুভ্ৰ কোনোই খবর দেয় নি। রাত একটার দিকে টেলিফোন করে অফিসের নতুন ম্যানেজার জানিয়েছে – ছোট সাহেব রাতে ফিরবেন না। সকালে ফিরবেন।
জাহানারা বললেন, রাতে ফিরবে না কেন?
বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে গল্প করছেন।
জাহানারা বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। ম্যানেজার বলল, আম্মা আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। ঘুমিয়ে পড়েন।
ম্যানেজারের টেলিফোন পেয়ে জাহানারার দুশ্চিন্তা পুরোপুরি চলে গিয়েছিল। তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ঘুমুতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিছানায় শোয়ামাত্র তাঁর মনে হল— শুভ্ৰ বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে গল্প করছে এই খবরটা তার ম্যানেজার কীভাবে জানল? ম্যানেজারের তো জানার কথা না! শুভ্ৰ নিশ্চয়ই ম্যানেজারকে সঙ্গে নিয়ে বন্ধু বান্ধবের বাসায় গল্প করতে যায় নি।
শুভ্রর বাবা যখন বেঁচে ছিলেন তখন এরকম ঘটনা ঘটত। হঠাৎ হঠাৎ ম্যানেজার টেলিফোন করে বলত— বড় সাহেবের একটা কাজ পড়ে গেছে। রাতে তিনি আসতে পারবেন না। জাহানারা বলতেন, আচ্ছা। কী কাজে বড় সাহেব আটকা পড়েছেন, তিনি কোথায় রাত কাটাবেন- কিছুই জিজ্ঞেস করতেন না। ম্যানেজার টেলিফোন রাখার আগে বলতো- আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। ঘুমিয়ে পড়েন।
গতকাল রাতে ম্যানেজার শুভ্ৰ সম্পর্কে একই কথা বলেছে। এর মানে কী? দুই এবং দুই যোগ করলে চার হয়। মানুষের ব্যাপারে এমন অংক করা কি ঠিক? মানুষ কোনো অংক না। শুভ্র এবং শুভ্রর বাবা এক না। দুজন দুধরনের মানুষ। জাহানারার সারারাত এক ফোঁটা ঘুম হল না। ভোর থেকে শুরু হল— গরম লাগার অসুখ। মনে হচ্ছে কেউ তাঁর শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। চোখ মুখ দিয়ে আগুনের হালকা বের হচ্ছে।
