মেয়েটার গলার স্বর বিনুর মত। সে এখন হাসছেও খুব স্বাভাবিকভাবে। শুভ্র বিনুর পা ছুঁয়ে দেখতে গেল তখনি তার ঘুম ভাঙিল। সে খুবই অপরিচিত জায়গায় শুয়ে আছে। তার বিছানা নরম। বিছানার উপর বালিশ নরম। গায়ের উপর পাতলা চাঁদর দেয়া। সে যে দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে, সেই দেয়ালটা অপরিচিত। দেয়ালে পেন্সিল দিয়ে কয়েকটা টেলিফোন নাম্বার লেখা। শুভ্র দেয়ালের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেই দেখল। খাটে আসমানী বসে আছে। আসমানীর হাতে মগ। মগ থেকে ধোঁয়া উঠছে। আসমানীর চেহারা সম্পূর্ণ অন্য রকম লাগছে। শান্ত সুখী সুখী মুখ। সে চোখে টেনে কাজল দিয়ে চোখ দুটিকে সুন্দর করে ফেলত ঠিকই। তবে খানিকটা অপরিচিতও করে ফেলত। মেয়েটা এখনো চোখে কাজল দেয় নি বলে তার চোখ খুবই পরিচিত লাগছে।
আসমানী বলল, চা আনছি।
শুভ্র বলল, ও।
নেন, আগে কুলি করেন।
মেয়েটা মগে করে শুধু যে চা এনেছে তা না, তার এক হাতে পানির গ্লাসও ধরা আছে। পানির গ্লাস চোখে পড়ে নি। ধোয়া উঠা মগ চোখে পড়েছে।
আসমানী বলল, নেন। কুলি করেন। চিলমচিতে কুলি ফেইলা চা খান।
মেয়েটা এত স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে যেন শুভ্র দীর্ঘদিন ধরে এ বাড়িতে বাস করে। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চিলমচিতে কুলি ফেলে চা খায়।
চায়ে চিনি টিনি সব ঠিক হইছে?
চায়ে চিনি ঠিক হয় নি, সামান্য কম হয়েছে। তারপরেও শুভ্র বলল, হ্যাঁ ঠিক হয়েছে।
আপনার ঘুম ভাল হইছে?
হুঁ।
হুঁ বললেন কেন? আপনার ঘুম মোটেই ভাল হয় নি। ঘুমের মইধ্যে খুব ছটফট করছেন। দুঃস্বপ্ন দেখেছেন।
তুমি জানলে কী করে?
জানব না কেন? আমি তো আপনার পাশেই বইসা ছিলাম।
বলতে বলতে আসমানী হাসল; এই হাসিও কী স্বাভাবিক! যেন শুভ্ৰর বিছানার পাশে বসে থেকে রাত কাটানো এই মেয়েটির অনেক পুরনো অভ্যাস।
আপনি রাতে খুবই খারাপ স্বপ্ন দেখেছেন ঠিক না? ভাং এর সরবতের এই একটা খারাপ ব্যাপার আছে। কম খেয়ে ঘুমুতে গেলে সবাই দুঃস্বপ্ন দেখে। বেশি কইরা খাইলে দেখে শান্তির স্বপ্ন।
ও আচ্ছা।
আমি একবার কী স্বপ্ন দেখছিলাম জানেন? আমি স্বপ্নে দেখছিলাম। আমাকে ঘিরে ভন ভন করে নীল মাছি উড়তেছে। মাছিগুলি দেখতে মানুষের মাথার মত। পরিচিত সব মানুষের মাথা যেন ছোট হয়ে গেছে। যেখানে কান থাকার কথা সেখানে পাখা। সবাইরে চেনা যাইতেছে।
ইন্টারেস্টিং।।
আপনি এই এ রকম কোনো স্বপ্ন দেখছেন?
না। এখন কটা বাজে?
দশটা এখনো বাজে নাই। কিছুক্ষণের মইধ্যে দশটা বাজব। আপনি কি মাশতা খাইবেন?
আমি কোনো নাশতা খাব না। আমি এখন চলে যাব।
আচ্ছা।
আরেক কাপ চা খেতে পারি। চা-টা ভাল হয়েছে।
আসমানী কোনো কথা না বলে চলে যাচ্ছে। সে একবারও বলল না— নাশতা খেয়ে যান। নাশতা না খেয়ে যাবেন কেন? যে মেয়ে খুব যত্ন করে তাকে সারা রাত রেখে দিয়েছে, সে সকালে নাশতা না খাইয়ে বিদেয় করে দিচ্ছে। ব্যাপারটা মিলছে না। তারপরেও মনে হচেচ্ছ ঠিক আছে।
যা ঘটছে সব। এত স্বাভাবিক লাগছে কেন? এখন যা ঘটছে তা স্বপ্নের অংশ নাতো? একমাত্র স্বপ্নদৃশ্যেই সব স্বাভাবিক লাগে। শুভ্র একবার আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। উড়তে উড়তে সে যেন কোথায় কোথায় চলে যাচ্ছে। সে মোটেই বিস্মিত হয় নি। তার কাছে মনে হচ্ছিল- সে তো উড়বেই।
তুমি যখন স্বপ্ন দেখ। তখন স্বপ্নটাকেই বাস্তব মনে হয়। স্বপ্নভঙ্গের পর বুঝতে পার— এতক্ষণ যা ঘটেছে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। পৃথিবীতে যখন তুমি বাস কর, তখন এই পৃথিবীটাকে তোমার কাছে বাস্তব মনে হয়। পৃথিবীর জীবনটাও যে স্বপ্লের জীবনের মত অলিক ভ্রান্তি তা তুমি বুঝতে পারবে যখন তুমি পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে।
কথাগুলি কার? প্রতিটি লাইন মনে আছে অথচ লাইনগুলি করে তা মনে আসছে। না কেন? শুভ্ৰ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তার মাথা কি কাজ করছে না? মস্তিষ্কের নিওরোনে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে? এই বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের সবচে জটিলতম বস্তু হল মানুষের মস্তিষ্ক। জঠিল এবং রহস্যময়। মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র একটি অংশই শুধু মানুষের নিয়ন্ত্রণে। বাকি অংশ কাজ করে সম্পূর্ণ তার মত।
কাগজ পোড়ার গন্ধ আসছে। এই গন্ধের সঙ্গে মিশেছে জুতা পালিশের গন্ধ। শুভ্রর ঘুম পাচ্ছে। আসমানী চা নিয়ে এলে, চা খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লে কেমন হয়? আসমানীর উপর তার রাগ করা উচিত। প্রচণ্ড রাগা! আসমানী যা করেছে। তাকে সমর্থন করার কোনোই কারণ নেই। সে তাকে ইচ্ছে করে ড্রাগ মেশানো অষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারে না।
ভাং-এর সরবত শুনলে তেমন কিছু মনে হয় না। কিন্তু ধুতুরা পাতা কচলে ভাং-এর সরবত বানানো হয়। ধুতুরা গাছ এই পৃথিবীর খুবই রহস্যময় গাছ। এই গাছ মানুষের চেতনার উপর কাজ করে।
শুধু মানুষ না, যাবতীয় পশুপাখি এই গাছের ফল, গাছের পাতা এবং শিকড়ে আক্রান্ত হয়। মানুষ-পশু-পাখি এক চেতনা থেকে অন্য চেতনায় চলে যায়। তখন সেই চেতনার জগতকেই মনে হয় সত্যি জগৎ। বাকি সব মিথ্যা।
আসমানী চা নিয়ে এসেছে। তার হাতে একটা পিরিচ্চে মাখন লাগানো টেষ্ট বিসকিট। আসমানী বলল, আপনের নতুন ম্যানেজার সাহেব আপনারে নিতে এসেছেন।
শুভ্র বলল, ও।
আসমানী বলল, উনি আমার সঙ্গে খুব রাগারগি করছেন।
কেন?
কারণ উনার ধারণা হয়েছে আমি কৌশল করে আপনাকে এখানে রেখে দিয়েছি।
তোমার ধারণা তুমি কৌশল কর নি?
