বিনু বলল, আপনার কী হয়েছে?
তিনি বিনুর দিকে তাকিয়ে খুব সহজ গলায় বললেন, কিছু হয় নি।
কিছু যে হয় নি এটা ভাল করে বুঝানোর জন্যে তিনি সামান্য হাসলেন। তারপর আগ্রহ নিয়ে বললেন, বিনু তুমি আমের টক রাঁধতে পার? ছোট মাছ দিয়ে কাঁচা আম দিয়ে টক। আমের টক রান্না কর তো। আজ কেন জানি আমের টক খেতে ইচ্ছা করছে।
বিনু তাকিয়ে আছে! কিছু বলছে না। জাহানারা বললেন, গরমের সময় টক খেলে গরম কমে এটা কি তুমি জান বিনু?
বিনু না-সূচক মাথা নাড়ল। জাহানারা বললেন, গরম দেশের সব ফল এই কারণেই টক হয়। ঠাণ্ডার দেশে তুমি কোনো টক ফলের গাছ পাবে না। যেমন ধর তেঁতুল গাছ। এই গাছ হয় আমাদের গরমের দেশে। শীতের দেশে হয় না। কারণ ওদের তেঁতুল খাবার কোনো দরকার নেই। আমাদের আছে। কথাগুলি আমাকে বলেছে শুভ্ৰ। শুভ্রের কথা মন দিয়ে শুনলে অনেক কিছু শিখা যায়।
বিনু বলল, আপনার কি জ্বর এসেছে?
জাহানারা বিরক্ত গলায় বললেন, জ্বর আসবে কেন?
বিনু বলল, আপনার চোখ টকটকে লাল হয়ে আছে।
বারবার চোখে পানির ঝাপটা দিচ্ছি। এই জন্যে চোখ লাল হয়েছে।
বলয়ে বলতে জাহানারা আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেই চমকে উঠলেন। মনে হচ্ছে এক্ষুণি চোখ ফেটে রক্ত বের হবে।
বিনু বলল, আপনার শরীর খারাপ লাগলে আপনি বিছানায় শুয়ে থাকুন। আমি আপনার মাথায় পানি চালার ব্যবস্থা করছি।
জাহানারা হঠাৎ নিজের অজান্তেই মুখ ফসকে বলে ফেললেন, কাল রাতে শুভ্র কোথায় ছিল তুমি কি জান?
বিনু বলল, জানি।
জাহানারা অবাক হয়ে বললেন, কীভাবে জান?
বিনু বলল, উনি আমাকে বলেছেন।
কখন বলেছে?
এইত কিছুক্ষণ আগে।
শুভ্ৰ কি বাড়িতে এসেছে?
বিনু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
জাহানারা বললেন, গত রাতে শুভ্ৰ কোথায় ছিল?
বিনু জবাব দিল না।
টেলিফোন বাজছে। জাহানারা বিনুকে ইশারা করলেন। টেলিফোন সেট তার কাছে এগিয়ে দিতে। এ বাড়িতে টেলিফোন আসে খুব কম। সব সময় টেলিফোন তিনি ধরেন। কয়েকদিন ধরে লক্ষ করছেন বিনু টেলিফোন ধরছে। এটা ঠিক না; ধমক দিয়ে নিষেধ করে দিতে হবে। শরীরে রাগটা উঠলে ধমক দিতে হবে। জুরের কারণে রাগ ঠিকমত উঠছে না বলে ধমক দিতে পারছেন না। ধমকটা আজকেই দিতে পারলেই সবচে ভাল হত।
জাহানারা টেলিফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মিষ্টি গলায় একটা মেয়ে বলল, শুভ্ৰ কি বাসায় আছে? ওকে দিতে পারবেন? খুব জরুরি।
তুমি কে?
আমার নাম মীরা। আমি ওর ক্লাসমেট।
জাহানারা কিছু সময় চুপ করে থেকে বললেন, এটা শুত্রদের বাড়ি না। শুভ্র নামে এখানে কেউ থাকে না।
আমার কথাটা আপনি একটু মন দিয়ে শুনুন। আমি নিশ্চিত এটা শুভ্রদের বাড়ি এবং খুব সম্ভব। আপনি তার মা। শুভ্ৰকে টেলিফোন দিতে না চাইলে দেবেন না। কিন্তু একটা খবর তাকে দিতে হবে- আপনি শুভ্ৰকে বললেন আলতাফুর রহমান স্যার মারা গেছেন। রোড এ্যাকসিডেন্টে মারা গেছেন। উনি শুভ্রকে খুব পছন্দ করতেন। তার ডেডবিডি ধানমণ্ডির বাড়িতে রাখা আছে। শুভ্ৰ যেন অবশ্যই সেখানে যায়। দয়া করে এক্ষুণি শুভ্রকে খবরটা দিন।
এই মেয়ে, তোমাকে বললাম এটা শুভ্রর বাসা না।
আমার নাম মীরা। বলবেন মীরা টেলিফোন করেছিল। স্যারের নামটা মনে রাখুন— ড. আলতাফুর রহমান। চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব ইলেক্ট্রনিক্স এন্ড এপ্লায়েড ফিজিক্স। মনে থাকবে?
জাহানারা টেলিফোন নামিয়ে রেখে শুভ্ৰকে ডেকে পাঠালেন। শুভ্ৰ সঙ্গে সঙ্গে এল। তিনি শুভ্ৰর দিকে তাকালেন না। কথা বললেন দেয়ালের দিকে তাকিয়ে যেন শুভ্ৰ বুঝতে পারে তিনি রাগ করেছেন।
শুভ্ৰ, তোর একজন টিচার মারা গেছেন। নাম আলতাফুর রহমান। রোড একসিডেন্টে মারা গেছেন। তাঁর ডেডবডি ধানমণ্ডির বাসায় রাখা আছে। তুই ধানমণ্ডির বাসা চিনিস?
হ্যাঁ।
ওখানে যেতে বলেছে। টেলিফোন কে করেছে?
বুড়ো মত এক ভদ্রলোক। নাম জিজ্ঞেস করেছিলাম— বলল না। তাদের কোনো আত্মীয়স্বজন হবে।
আচ্ছা ঠিক আছে।
শুভ্ৰকে দেখে মনে হচ্ছে না— সে খুব দুঃখিত হয়েছে। কেমন নির্বিকার ভঙ্গিতে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে তার শিক্ষকের ডেড়বডি দেখতেও যাবে না।
শুভ্ৰ।
হুঁ।
তুই তোর স্যারুকে দেখতে যাবি না?
না।
যাবি না কেন?
শুভ্ৰ শান্ত গলায় বলল, উনি তো এখন আর আমার স্যার না। একটা মৃত দেহ। মৃত মানুষ কিছুই না মা। তোমার কি শরীর খারাপ?
না।
দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছ কেন?
তুই তো আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস। পাচ্ছিস না?
পাচ্ছি।
কথা শুনতে পাওয়াটাই আসল। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে কথা বলা যা আসমানের দিকে তাকিয়ে কথা বলাও তা।
বিনুর কাছে শুনলাম তুমি পর পর দু রাত সেই প্রেতটাকে দেখছ। বারান্দায় হাঁটাহাটি করছিল। তোমাকে নাকি হয়ত ইশারায় ডাকছিল। সত্যি?
না, সত্যি না। আমি বানিয়ে বানিয়ে বলেছি।
জাহানারা এতক্ষণ বসেছিলেন। এখন শুয়ে পড়লেন। চাঁদরে মুখ ঢেকে ফেললেন। তিনি মীরা মেয়েটার কথা ভাবছেন। মেয়েটা দেখতে কেমন?
গলার স্বর মিষ্টি কাজেই দেখতে ভাল হবে না। যে মেয়ের গলার স্বর যত মিষ্টি সে দেখতে তত খারাপ। আর যে মেয়ের গলার স্বর যত চিকন সে তত মোটা।
এটা সহজ হিসেব। এই হিসেবে কখনো ভুল হয় না। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এইসব কথা বের করা হয়েছে।
কোনো নারীর পায়ের পাতা যদি হাতির পায়ের পাতার মত থ্যাবড়া হয় তাহলে সেই নারী হয় স্বামী ঘাতকিনী। মীরা মেয়েটার পায়ের পাতা কেমন কে জানে।
