তোমার কথাবার্তা কিছু বুঝতে পারছি না।
সরবতটা এত তাড়াতাড়ি খাওন ঠিক না। ধীরে খান।
আসমানী তোমাদের এখানে কি টেলিফোন আছে? আমার একটা টেলিফোন করা দরকার।
এখানে টেলিফোন নাই। আপনে টেলিফোন করবেন?
হ্যাঁ।
খুব দরকার?
হ্যাঁ খুব দরকার।
খুব দরকার হইলে আমি একটা টেলিফোনও জোগাড় করে দেব। এখানে রাণী নামের একজন আছে— তাকে তার সাহেব একটা মোবাইল টেলিফোন দিয়েছে।
ও।
বুড়া সাহেব! রাতে ঘুমাইবার আগে টেলিফোনে খারাপ কথা না বললে বুড়ার ঘুম হয় না। এই জন্যেই দিয়েছে। সে প্রতি রাতে রাণীর সাথে খারাপ কথা বলে। এর জন্যে মাসকাবারি টাকা দেয়।
ও।
আপনি অস্তে আস্তে সরবত খান। আমি টেলিফোন এনে দিব।
তোমার সরবীতটা খেতে খুবই ভাল। আমি আরেক গ্লাস খাব।
আসমানী আবাৱে হাসল। শুভ্ৰর মনে হল এবারের হাসিটা আগের বারের চেয়েও সুন্দর।
টেলিফোন ধরল বিনু। শুভ্ৰ বলল, বিনু তুমি কি একটা কাজ করে দিতে পারবে? আমার ঘরে একটু যাও। টেবিলের ড্রয়ারটা খুলে দেখতো দুটা ক্যাসেট আছে কি-না। একটায় লেখা মীরা, অন্যটায় বিনু! ক্যাসেট দুটা কীসের বুঝতে পারছতো?
পারছি।
আমি টেলিফোন ধরে আছি। তুমি ক্যাসেট নিয়ে এসো বেশি দেরি করবে না। আমি ঘুমিয়ে পড়তে পারি। আমার খুবই ঘুম পাচ্ছে।
শুভ্ৰ তার গ্লাস প্ৰায় শেষ করে এনেছে। সে এখন নিশ্চিত— সরবতে বিশেষ কিছু দেয়া হয়েছে। সেই বিশেষ কিছুটা কী জানতে ইচ্ছা করছে না। ঘুম ঘুম পাচ্ছে। আবার জেগে থাকতেও ইচ্ছা করছে।
বিনু বলল, হ্যালো।
শুভ্ৰ আগ্রহের সঙ্গে বলল, ক্যাসেট পেয়েছ?
হ্যাঁ।
আমার একটা ব্ল্যাংক ক্যাসেট এবং ক্যাসেট প্লেয়ার দরকার। আরেকটা মেয়ের হাসি রেকর্ড করব। সমস্যা হল ঘরেতো কোনো রেকর্ডার নেই। কী করা যায় বিনু বলতো। প্রবলেমে পড়ে গেলাম।
আপনি বলেন কী করা যায়।
আচ্ছা ঠিক আছে আমি নিজেই ব্যবস্থা করছি। মঞ্জুকে ক্যাসেট কিনতে পাঠাব। মঞ্জু যে বসে আছে খেয়াল ছিল না।
শুভ্ৰ মোবাইল সেটটা আসমানীর দিকে এগিয়ে দিল। আসমানী বলল, আপনার কাছে রেখে দিন। যদি কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে কথা বলবেন।
শুভ্ৰ বলল, আচ্ছা? আমি আপনার মাথার চুলে বিলি দিয়ে দিব?
দাও।
আপনি আরাম করে ঘুমান। আপনাকে দেইখা মনে হইতাছে আপনি খুব অস্থির হয়ে আছেন। অস্থির হইয়া লাভ নাই। আপনে অস্থির হইলেও দুনিয়া যেমনে চলাব, সুস্থির হইলেও তেমনই চলব।
সরবতে কী দিয়েছ?
ভাংয়ের সরবত। ভাং খুব সামান্য দেয়া হয়েছে। আপনার খুব ভাল ঘুম হবে।
ভাং এর সরবত কীভাবে বানায়?
ধুতুরা গাছের পাতা দুধের মধ্যে কচলে বানায়।
ধুতুরা গাছের বোটানিক্যাল নাম কি তুমি জান?
জ্বি না।
মীরা জানবে। মীরার অনেক পড়াশোনা। দেখি টেলিফোনটা। মীরাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেই। আরেকদিন হয়ত জানতে ইচ্ছা করবে না।
জানতে ইচ্ছা না করলে জানবেন না।
পান খেতে ইচ্ছা করছে। আসমানী একটা পান আনিয়ে দেবে? হাফিজ মিয়ার পান।
হাফিজ মিয়া কে?
আছে একজন— খুব ভাল পান বানায়। সবাই তার পান খায়।
আচ্ছা আনায়ে দিতেছি।
শুভ্ৰ ঘুমিয়ে পড়ল। পুরো রাতে তার একবারও ঘুম ভাঙল না।
ঘুম এবং জাগরণের মাঝখানের পর্দা
ঘুম এবং জাগরণের মাঝখানের পর্দা ক্রমেই হালকা হয়ে যাচ্ছে। এবং এই পর্দা কাঁপছে। দুলছে! শুভ্ৰ জেগে উঠছে এবং প্রায় সঙ্গেই সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ছে! মজার ব্যাপার ঘুমের সময় সে যে স্বপ্ন দেখছে এই স্বপ্লের ধারাবাহিকতা তাতে নষ্ট হচ্ছে না। স্বপ্নটা যেখানে শেষ হচ্ছে সেখান থেকেই আবারো শুরু হচ্ছে। স্বপ্নের ঘটনা সামান্য বদলে যাচ্ছে কিন্তু মূল পাত্র-পাত্রী ঠিকই থাকছে। তবে পত্ৰিপাত্রীদের চেহারা পাল্টাচ্ছে।
স্বপ্নে মীরা ছিল। মীরার সঙ্গে প্ৰায় তালগাছের মত লম্বা একটি মেয়ে ছিল। সেই মেয়েটা হাঁটছিল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। লম্বা মেয়েটা স্বপ্নে শুধুই হাসছিল। পুরুষদের মত হাসছিল। ভরাট গম্ভীর গলার হাসি। মাঝখানের বিরতির পর স্বপ্ন আবার যখন শুরু হল। তখনো মীরা আছে, এবং মীরার সঙ্গিনীও আছে। তবে সে আর আগের মত লম্বা না বরং মীরার চেয়েও বেঁটে হয়ে গেছে। এবং তার চেহারাও পাল্টে গেছে। তাকে দেখাচ্ছে খানিকটা বিনুর মত। এই বিনু যে প্রথমে দেখা তালগাছ মেয়ে তা বোঝা যাচ্ছিল তার হাসি থেকে। সবকিছু বদলালেও তার হাসি বদলায় নি। সেই আগের মত ভরাট গম্ভীর গলার হাসি। শুভ্ৰ ঠিক করল তাকে জিজ্ঞেস করবে- আপনি তো একটু আগেই প্রায় তালগাছের মত লম্বা ছিলেন। এখন এমন বেটে হয়ে গেছেন কেন? আপনাকে দেখাচ্ছে স্লীপিং বিউটির সাত বামুনের একজনের মত।
যে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার কথা থাকে সেই প্রশ্ন স্বপ্লে কখনোই করা হয় না। সম্পূর্ণ অন্য প্রশ্ন করা হয়। কাজেই শুভ্র যা বলল তা হচ্ছে- আপনি খুঁড়িয়ে হাঁটছেন কেন? মেয়েটা বলল (হাসতে হাসতে), আমি খুঁড়িয়ে হাঁটছি কারণ আমার একটা পা কাঠের। দেখতে চান?
শুভ্ৰ বলল, না।
স্বপ্নে সময়ের ব্যাপারটা বদলে যায়। দীৰ্ঘবাক্য বলতে খুব কম সময় লাগে, আবার সামান্য না বলতেও অনেক সময় লাগে। শুভ্র দীর্ঘ সময় নিয়ে না বলল, তার আগেই মেয়েটা তার কাঠের পা দেখাবার জন্যে তার শাড়ি তুলে ফেলেছে। শুভ্ৰ অবাক হয়ে দেখছে মেয়েটার পা মোটেই কাঠের না। রক্ত-মাংসের পা। শুভ্র বলল, আপনার পা তো কাঠের না। মেয়েটা বলল, হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখ। হাত দিয়ে ছুঁয়ে না দেখলে কী করে বুঝবে?
