অফিসের কেউ যদি না হও তাহলে অফিস সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করবে না।
জিজ্ঞেস করলে সমস্যা কী?
সমস্যা আছে। বাবাকে যেমন তুমি কখনো কিছু জিজ্ঞেস কর নি। আমাকেও করবে না।
তোর বাবাকে কখনো কিছু জিজ্ঞেস করি নি কে বলল?
কেউ বলে নি। আমি জানি। বাবার কর্মকাণ্ড নিয়ে তুমি যদি কখনো প্রশ্ন তুলতে তাহলে আজ। আমি একটা বেশ্যাখানার মালিক হতাম না।
তুই এমন একটা বিশ্ৰী শব্দ আমার সামনে বললি? তুই বলতে পারলি? আমি তোর মা! তুই মার সামনে এমন নোংরা শব্দ বললি। তোর জিবে আটকাল না।
শুভ্ৰ বই-এর পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলল, জিবে আটকায়নি মা। আমরা নোংরা ব্যবসা করতে পারব, সেই ব্যবসার কথা বলতে পারব না— তা হয় না। দাঁড়িয়ে থেকে না মা। আমার জন্যে চা বানিয়ে নিয়ে এসো।
শুভ্র!
এ রকম কঠিন গলায় তুমি আমাকে ডাকবে না। এবং অবশ্যই কঠিন চোখে তাকবে না। সারাজীবন পুতুপুতু মহিলা হয়ে ছিলে। এখনো তাই থাকবে।
শুভ্ৰ আমি তোর মা।
তুমি আমার মা এটা অত্যন্ত ভাল কথা। আমার একটা অংশ সব সময় তোমাকে ঘিরে থাকে। কিন্তু অন্য অংশটা তোমাকে যে ঘৃণা করে সেটা না জানাই তোমার জন্যে ভাল।
তুই আমাকে ঘৃণা করিস।
হ্যাঁ করি। বাবাকে যতটা করি তোমাকে তার চেয়ে বেশি করি। কাঁদবে না। মিথ্যা অশ্রু আমার ভাল লাগে না!
শুভ্ৰ হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে হলুদ মার্কার নিল। বইটার কিছু কিছু অংশ দাগ দেয়া দরকার। সে মার দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলল, মা দাঁড়িয়ে থেকে না। চা নিয়ে এসো। তোমার চতুর্থ চোখ আছে কি-না সেই পরীক্ষা হয়ে যাক।
লালবাগ থানার ওসি সাহেব
লালবাগ থানার ওসি সাহেব এসেছেন। শুভ্রর সামনে চেয়ারে বসে আছেন। তার মুখ হাসি হাসি। সিভিল ড্রেসে এসেছেন বলে তাঁকে পুলিশ অফিসার বলে মনে হচ্ছে না। তাকে স্কুল টিচারদের মত দেখাচ্ছে। অংক স্যারের মত কঠিন স্যারও মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে বাংলা স্যার। তার নাকের নিচে ছোট্ট বাটার ফ্লাই গোঁফ শুধুমাত্র বাংলা স্যারদের মুখেই মানায়। তবে এই গোঁফ সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে যাবে ভদ্রলোক যখন ইউনিফর্ম পরবেন। হিটলারেরও বাটারফ্লাই গোঁফ ছিল।
ওসি সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে হালকা গলায় বললেন, শুভ্র সাহেব কেমন আছেন বলুন!
শুভ্ৰ বলল, ভাল।
আপনার ব্যবসার অবস্থা কী?
ভাল।
আমি কী জন্যে এসেছি। সেই খবর নিশ্চয়ই আগেই পেয়েছেন?
জ্বি খবর পেয়েছি।
আমি আর দেরি করব না। ব্যবস্থা করুন। আমার একটু তাড়া আছে। ছেলেকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে যেতে হবে। চিড়িয়াখানায় হাতির পিঠে চড়ার ব্যবস্থা আছে। সে হাতির পিঠে চড়বে।
চা খাবেন?
চায়ের অভ্যাস আমার তেমন নাই। যাই হোক আপনি বলছেন যখন খাই। চিনি কম দিতে বলবেন।
শুভ্ৰ বেল টিপে মঞ্জুকে চা দিতে বলল। ওসি সাহেব বিশেষ ভঙ্গিমায় সিগারেটের ছাই ফেলতে ফেলতে বললেন-– আপনাদের এখানে নতুন একটা মেয়ে এসেছে বলে খবর পেয়েছি। লাইসেন্স হয়েছে?
আমি বলতে পারছি না লাইসেন্স হয়েছে কি-না।
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এফিডেবিট করা লাগবে। আপনি নতুন মানুষ এই জন্যে বললাম।
আমি নতুন হলেও আমার অফিসের লোকজন পুরনো। এরা আইন মেনেই চলবে। তাছাড়া আপনারাতো আছেনই– আইনের রক্ষক।
কথাটা যেন কেমন কেমন করে বললেন।
শুভ্ৰ হাসতে হাসতে বলল, কথাটা কেমন কেমন করে বললেওতো আপনার গায়ে লাগা উচিত না।
ওসি সাহেব্ব থমথমে গলায় বললেন, গায়ে লাগা উচিত না কেন?
শুভ্র সহজ গলায় বলল, গায়ে লাগা উচিত না। কারণ আপনাদের আমরা টাকা দিয়ে কিনে রেখেছি। আপনারা মাসিক বেতন নিচ্ছেন। বেতনভুক্ত কেউ মালিকের কথা; গায়ে লাগবে না। গায়ে লাগানো উচিত না।
ওসি সাহেব শুভ্রর দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, শুভ্র আপনার বয়স অল্প রক্ত গরম। পুলিশের সঙ্গে রক্ত গরম করবেন না। আপনার পিতার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল তাকে শ্ৰদ্ধা করতাম। আপনাকেও স্নেহ করি।
শুভ্র সহজ গলায় বলল, আপনার স্নেহ আমার প্রয়োজন নেই ওসি সাহেব। স্নেহ অন্য কারোর জন্যে রেখে দিন। টাকা নিতে এসেছেন টাকা নিয়ে চলে যান।
মঞ্জু, চা নিয়ে ঢুকল। সেকি বাইরে থেকে কিছু শুনেছে, কেমন ভীত চোখে শুভ্ৰকে দেখছে। শুভ্র খুবই মজা পাচ্ছে। ওসি সাহেবকে আরো কঠিন কিছু কথা বলতে ইচ্ছা করছে। শুধু কঠিন কথাই না, হাস্যকর অপমানসূচক কথা। এই মুহুর্তে শুভ্ৰর মাথায় যে কথাগুলি ঘুরছে তা হল— ওসি সাহেব শুধু চা কেন খাবেন। পিরিচে করে এক পিরিচ, গু এনে দিক। চামচ দিয়ে পায়েসের মত খান। কথাগুলি মাথায় ঘুরলেও মুখ দিয়ে বেরুচ্ছে না। বের হলে শুভ্রর মনে হয় ভাল লাগত।
ওসি সাহেব চায়ে চুমুক দিলেন। শুভ্ৰ তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে এক মুহূর্তের জন্যেও চোখ সরিয়ে নিল না। এক ধরনের খেলা শুরু হয়েছে। এই খেলার काशी ইদুর-বেড়াল CT-Cat and Mouse game. এই খেলার মজাটা হচ্ছে ইদুর হঠাৎ করে বিড়াল হয়ে যায়। আর বিড়াল হয়ে যায় ইদুর। কে কখন বদলাবে কিছুই আগে থেকে বলা যায় না।
ওসি সাহেবের প্রথম সিগারেটটি শেষ হয় নি। আধা খাওয়া সিগারেট ফেলে দিয়ে তিনি আরেকটি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন- আপনি যে সব কথাবার্তা বলছেন তার ফলাফল কী হতে পারে তা কী আপনি জানেন?
শুভ্ৰ চেয়ারে হেলান দিতে দিতে বলল, ফলাফল শূন্য। আপনি আমাকে ভয় দেখাবার হাস্যকর চেষ্টা করছেন। আপনার ক্ষমতা খাকি পোশাকের আর আমার ক্ষমতা টাকার। টাকার ক্ষমতা ব্যবহার করে আমি আপনাকে আটচল্লিশ ঘণ্টার ভেতর যে লালবাগ থানা থেকে চিটাগাং হিলট্ৰেকসে বদলি করে দিতে পারি তা-কি জানেন? অফিসের পুরনো কাগজপত্র দেখে জেনেছি। আমার আগে আমার বাবাও এরকম কাজ করেছেন। হিসাধের খাতায় লেখা- ওসি এবং সেকেন্ড অফিসারকে বদলির খরচ বাবদ তিন লাখ একুশ হাজার টাকা মাত্র।
