ওসি সাহেবের হাতের সিগারেট নিভে গেছে। তিনি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি বড় রকমের ধাক্কার মত খেয়েছেন। ধাক্কা সামলাবার চেষ্টা করছেন।
শুভ্ৰ বলল, আপনি সিভিল ড্রেসে আমার অফিসে এসেছেন। আমি কী করতে পারি জানেন? আপনাকে এখান থেকে ধরে নিয়ে আমার বেশ্যাখানায় কোনো এক বেশ্যার ঘরে ঢুকিয়ে দিতে পারি। পত্রিকায় আপনার ছবিসহ নিউজ করতে পারি। তারপর অন্য পুলিশ দিয়ে আপনাকে গ্রেফতার করাতে পারি। কাকের মাংস কাক খায় না। পুলিশের মাংস পুলিশ খায়। বলুন এই কাজটা করতে পারি বললাম, সেটা পারি কি-না?
ওসি সাহেব ক্ষীণ স্বরে বললেন, পারেন।
শুভ্র বলল, আমাকে ভবিষ্যতে কখনো ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না। নিন এখন চা খান।
ওসি সাহেব ঠাণ্ডা চায়ে চুমুক দিলেন। শুভ্র বলল, চাটা মনে হয় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আরেক কাপ দিক।
ওসি সাহেব মাথা কাত করতে করতে বললেন, জ্বি আচ্ছা দিতে বলেন। আর শুনুন ভাই সাহেব আমার উপর কোনো রাগ রাখবেন না। আপনি হয়ত শুনে বিশ্বাস করবেন না। আপনার পিতা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। আমার প্রথম ছেলের জন্মদিনে উনাকে দাওয়াত করেছিলাম। উনি গিয়েছিলেন। আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে তিনি ছবিও তুলেছেন। সেই ছবি আমাদের এলবামে আছে! একদিন যদি গরিবখানায় যান। ছবিটা দেখাব। আপনাকে যেতেই হবে। কবে যাবেন বলেন। আমার স্ত্রী অত্যন্ত খুশি হবে।
যাব কোনো একদিন। বাবা যখন গিয়েছেন। আমিও যাব। যথা পিতা তথা পুত্র।
আজই চলুন। আজ আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি। বলেছিলাম না, ছেলেকে চিড়িয়াখানায় নিতে হবে। ছুটিই পাই না— এমন এক চাকরি করি। ভাই আমার রিকোয়েষ্ট। আজ চলুন।
আজ যেতে পারব না। আজ আমি আমার ব্যবসা দেখতে যাব। মেয়েগুলির সঙ্গে কিছু সময় কাটাব। আপনি যেমন চিড়িয়াখানায় যাচ্ছেন আমিও সে রকম চিড়িয়াখানাতেই যাচ্ছি।
কোনোরকম সমস্যা হলে বলবেন। কোনো সংকোচ করবেন না। স্কু টাইট দিয়ে দিব। Consider me as your brother, আপনার অফিসের চা খুব ভাল হয়। আপনি রাগ করেন আর যাই করেন মাঝে মাঝে এসে চা খেয়ে যাব।
কার্পেটে পা ছড়িয়ে আসমানী বসে আছে। মেয়েটার শরীর মনে হয় ভাল নেই। চোখ লাল। মাথার চুল এলোমেলো। শুভ্ৰ নিজের মনে হাসল। শরীর ভাল না থাকার সঙ্গে চুল এলোমেলোর কোনো সম্পর্ক নেই। সুস্থ মানুষের চুলও এলোমেলো থাকতে পারে। তার নিজের চুলই এখন এলোমেলো। তবু কেন জানি মেয়েটার চুল এলোমেলো দেখেই মনে হল তার শরীর ভাল নেই। সে নিশ্চয়ই খুব অসুস্থ কাউকে দেখেছিল যার চুল ছিল এলোমেলো। মস্তিষ্ক সেই স্মৃতি যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
আসমানীর গায়ের শাড়িটার রঙ সবুজ। প্রথমবার যখন তার সঙ্গে দেখা সেদিনও তার গায়ে সবুজ রঙের শাড়ি ছিল। এই মেয়েটির মনে হয় সবুজ রঙ পছন্দ। মেয়েটিকে আজ অনেক বেশি সুন্দর লাগছে। যে সুন্দর তাকে যে সব সময় সুন্দর লাগবে এমন কোনো কথা নেই। সুন্দর মানুষকেও মাঝে মাঝে অসুন্দর লাগে। আবার অসুন্দর মানুষকেও হঠাৎ হঠাৎ খুব সুন্দর লাগে। শুভ্র বলল, আপনি কেমন আছেনে?
প্রশ্নের উত্তরে আসমানী মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল। প্রশ্নের উত্তর দিল শরীরের ভাষায়। এই ভাষা শুভ্রর ভাল জানা নেই বলে সে প্রশ্নের উত্তরটা ধরতে পারল না। প্রশ্নের উত্তর হয়ত বা— আমি ভাল নেই। তাতে কী হয়েছে? আপনি যে ভাল আছেন এতেই আমি খুশি।
শুভ্র বলল, আমার অফিসের কেউ কি আপনাদের বলে নি আজ আমি আসব? আমিতো খবর পাঠিয়েছিলাম।
আসমানী আবারো ঠিক আগের ভঙ্গিতে মাথা ঝাকিয়ে বলল, আপনের দোকান। আপনে যখন ইচ্ছা আসবেন। সওদাপাতি দেখবেন, বলাবলির কী আছে?
শুভ্র বলল, আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দেন নি। আমি জানতে চেয়েছি— কেউ কি আপনাদের বলেছে যে আমি আসব?
জ্বি বলেছে।
আমার পছন্দ।
জ্বি আচ্ছা। এখন থেকে সোজা জবাব দিব।
আপনার কি শরীর খারাপ?
জ্বি, আমার মাসিক চলতেছে। আজ দ্বিতীয় দিন।
শুভ্ৰ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। কী বলছে এই মেয়ে। মেয়েটাকে কি প্ৰচণ্ড ধমক দেয়া উচিত না? রাগে শুভ্রর শরীর কাপতে শুরু করেছে। এই রাগকে কিছুতেই প্রশ্ৰয় দেয়া যায় না। তার বাবা দিতেন না। সে কেন দেবে?
শুভ্র কিছু বলার আগেই আসমানী বলল, প্রশ্ন করলে ঠিকঠাক জবাব দিতে বলছেন বলে দিয়েছি। রাগ করবেন না।
শুভ্র বলল, আমার ধারণা। আপনি আমাকে বিব্ৰুত করার জন্যে এই কথাটা বললেন। আপনি আমাকে অপদস্ত করতে চাচ্ছেন। চাচ্ছেন না?
আসমানী তাকিয়ে আছে। শুভ্ৰ মুগ্ধ হয়ে গেল। কী সুন্দর বড় বড় চোখ! তার মনে হল মানুষের সব সৌন্দৰ্য আসলে চোখে। যার চোখ সুন্দর তার সবই সুন্দর। মেয়েটা চোখ নামিয়ে নিচ্ছে না। তাকিয়েই আছে। শুভ্ৰ বলল, আপনারা ম্যানেজার সাহেবের কথা শুনছেন না কেন?
কী কথা?
উনার সঙ্গে আপনাদের কথা হয় নি?
উনার সঙ্গে কত কথাইতো হয়েছে। কোনটার কথা জিজ্ঞেস করেন? আপনে নিজেও সোজা প্রশ্ন করতে পারেন না। যে নিজে সোজা প্রশ্ন করে না সে অন্যের সোজা উত্তর ক্যামনে চায়?
শুভ্ৰ অবাক হয়ে লক্ষ করল— মেয়েটা হাসছে। হাসাহসি করার মত কথাবার্তাতো হচ্ছে না। শুভ্র তার নতুন ম্যানেজারকে বলে দিয়েছিল- সব কটা মেয়েকে যেন তাদের বাড়ি ঘরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সবাই নগদ পনেরো হাজার করে টাকা পাঝে। একটা করে সেলাই মেশিন পাবে; কেউ যদি সেলাই মেশিন নিতে না চায়— সম পরিমাণ টাকা পাবে। মেয়েটার ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটা এ জাতীয় কথা শুনে নি। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার— মেয়েটার আচার আচরণ হাসার ভঙ্গি সব কিছুর মধ্যে এক ধরনের তাচ্ছিল্য আছে। এই মেয়ে কি সবার সঙ্গেই এ রকম করে না-কি তার সঙ্গেই করছে?
