শুভ্ৰর ইজিচেয়ারটা জানালার কাছে। সে গভীর আগ্রহে একটা বই পড়ছে। উদ্ভট বই-–নাম–The 4th Eye. লেখকের নাম R Lampa. তিনি বইটিতে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন মানুষ চারটা চোখ নিয়ে জন্মায়। দুটি চোখ দৃশ্যমান। দুটি অদৃশ্য। একটি অদৃশ্য চোখ থাকে মাথার পেছনের দিকে। আরেকটি অদৃশ্য চোখ থাকে নাভির ঠিক দুআঙ্গুল নিচে। R. Lampa সাহেবের মতে যে-কোনো লোক এই দুটি চোখের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে। তাকে ধৈর্য ধরে কয়েকদিন একটা পরীক্ষা করতে হবে। একজন কেউ ফুলস্কেপ কাগজে বড় বড় করে কোনো একটা সংখ্যা লিখে মাথার পেছন দিকে ধরবে। সেই সংখ্যাটি পড়ার চেষ্টা করতে হবে মাথার পেছনের চোখ দিয়ে। অনেকটা জেনার টেস্টের মত টেষ্ট। একই পরীক্ষা নাভির চোখ নিয়েও করা যায়। লেখক ভদ্রলোক দাবি করছেন যে, একটু চেষ্টা করলেই যে কেউ এটা পারবে। জলের মত সহজ পরীক্ষা। শুভ্রর ইচ্ছা করছে এক্ষুণি পরীক্ষাটা করে ফেলতে। তবে এক্ষুণি না করে পুরো বই শেষ করে তারপর পরীক্ষায় বসা ঠিক হবে।
জাহানারা এসে ছেলের ঘরের দরজায় দাঁড়ালেন। হাসি মুখে বললেন, কী করছিস রে?
শুভ্র বলল, ইন্টারেস্টিং একটা বই পড়ছি।
কী বই?
বই-এর নাম চতুর্থ চোখ।
বিজ্ঞানের বই?
মিথ্যা-বিজ্ঞানের বই।
মিথ্যা-বিজ্ঞানটা আবার কী?
কিছু কিছু বিষয় এমন করে লেখা হয় যে পড়লে মনে হয় বিজ্ঞান। আসলে বিজ্ঞান না। এদের বলা হয় মিথ্যা-বিজ্ঞান। সব কিছুই একটা মিথ্যা সংস্করণ আছে। মিথ্যা ভালবাসা, মিথ্যা ঘৃণা, মিথ্যা চোখের জল।
জাহানারা ছেলের খাটে বসলেন। শুভ্র বলল— মা এখন তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। আমি বইটা দ্রুত পড়ে শেষ করতে চাই। তুমি থাকলে পড়া হবে না।
পড়া হবে না কেন? তুই তোর পড়া পড়বি! আমি আমার বসা বসে থাকব।
তুমি চুপচাপ বসে থাকবে না। গুটুর গুটুর করে কথা বলবে। আমার ডিসটর্ব হবে।
জাহানার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি লক্ষ করলেন তার চোখ ভিজে উঠেছে। ছেলের সামনে কেঁদে ফেলাটা খুবই লজ্জার ব্যাপার হবে। অভিমান তাকেই দেখানো যায় যে অভিমান বুঝে। তার ছেলে অভিমান বুঝে না।
মা আগুন গরম এক কাপ চা বানিয়ে দিয়ে যেও তো।
জাহানারা বললেন, শুভ্ৰ আমি শুনলাম তুই নিজে নাকি খুব ভাল চা বানাতে পারিস।
শুভ্র বলল, নিশ্চয়ই বিনু বলেছে। আশ্চর্য মেয়েতো! তোমাকে বলছে আমি চা ভাল বানাই, আবার আমাকে বলছে আমি চা বানাতেই পারি না। ওর কোন কথাটা সত্যি? আজ থেকে আমি ওর নাম দিলাম।— মিথ্যাময়ী।
জাহানারা দেখলেন, শুভ্ৰ হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছে। একটু আগেও তো মুখ এমন হাসি হাসি ছিল না। বিনু নামটা মনে আসতেই মুখ হাসি হাসি হয়ে গেল। তিনি না এসে বিনু যদি এসে বসতো তাহলে কি সে বলতে পারত— বিনু চলে যাও আমার ডিসটার্ব হবে? মনে হচ্ছে না। এ রকম বলত। আবার একটা নামও দিয়ে ফেলেছে মিথ্যাময়ী। মায়ের সামনে মিথ্যাময়ী, আড়ালে নিশ্চয়ই সত্যময়ী।
শুভ্ৰ বলল, মা শোন এখন চা আনার দরকার নেই। আমার বইটার বাকি পাতাগুলি পড়তে এক ঘণ্টা সময় লাগবে। তুমি একটা কাজ কর— কাঁটায় কটায় এক ঘণ্টা দশ মিনিট পর এক কাপ চা নিয়ে এসো। আমি চা খেতে খেতে তোমাকে নিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করব।
কী এক্সপেরিমেন্ট?
তোমার তিন নম্বর চোখ এবং চার নম্বর চোখ আছে কি-না এই পরীক্ষা হয়ে যাবে।
জাহানারা আবারো বসে পড়লেন। ছেলে তার সঙ্গে হাসি হাসি মুখে কথা বলছে— এটা শুভ লক্ষণ। এখন নিশ্চয়ই সে বলবে না, মা তুমি চলে যাও আমার ডিসটার্ব হচ্ছে।
জাহানারা আদুরে গলায় বললেন, শুভ্ৰ তোকে খুব জরুরি একটা কথা জিজ্ঞেস করি, কথাটা আমার প্রায়ই মনে হয়, যখন মনে হয় তুই আশেপাশে থাকিস না বলে জিজ্ঞেস করা হয় না।
শুভ্র বই বন্ধ করতে করতে বলল, বল তোমার জরুরি কথা।
কবরের উপর ফলের গাছ যদি হয় তাহলে সেই ফল খাওয়া কি ঠিক?
অবশ্যই ঠিক। তুমি খাচ্ছ ফল— অন্য কিছুতো খাচ্ছ না। এটাই কি তোমার জরুরি কথা?
হুঁ। তোর নানিজানের কবরে একটা বরই গাছ আছে। খুব মিষ্টি বরই।
মিষ্টি বরই হলে অবশ্যই খাবে। নানিজানের শরীর মাটিতে মিশে গেছে। নানিজানের শরীরের ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্ৰন নষ্ট হয় নি। তার কিছু কিছু অবশ্যই বরই-তে চলে আসবে। তাতে কিছু ফায় আসে না।
কী ভয়ঙ্কর কথা।
ভয়ঙ্কর কেন?
আমার মার শরীরের অংশ যে ফলে চলে এসেছে সেই ফল আমি খাব?
শুভ্ৰ বই-এ চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, আচ্ছা তুমি খেও না। এখন যাওতো মা! শোন, বিনুকে পাঠিয়ে দাও।
জাহানারা দাঁড়িয়ে আছেন। শুভ্ৰ তাকে বিদেয় করে দিচ্ছে অথচ বিনুকে আসতে বলছে। এর মানে কী? তিনি থাকলে ছেলের ডিসটর্ব হয়। বিনু থাকলে ডিসটার্ব হয় না? বিনু নামের মেয়েটাকে এই মুহুর্তে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া দরকার। আর দেরি করা যায় না। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।
জাহানারা ঘর থেকে বের হলেন এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আবার ঢুকলেন। শুভ্র বই থেকে মাথা না তুলে বলল, কিছু বলবে মা?
জাহানারা বললেন, শুনলাম তুই ম্যানেজার সাহেবকে বিদেয় করে দিয়েছিস?
কার কাছ থেকে শুনলে?
কার কাছ থেকে শুনলাম এটা জানা কি খুব প্রয়োজন?
হ্যাঁ প্রয়োজন। অফিস থেকে তোমার কাছে খবরাখবর কীভাবে আসে এটা জানা থাকা দরকার।
জাহানারা ছেলের গলার স্বর শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন। শুভ্র সম্পূর্ণ অন্যরকম গলায় কথা বলছে। শুভ্ৰকে এমন স্বরে কথা বলতে আগে কখনো শুনেন নি। তিনি অবাক হয়ে বললেন, তুই এমন কঠিন গলায় আমার সঙ্গে কথা বলছিস কেন? আমিতো তোর অফিসের কেউ না।
