বিনু বলল, আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন?
জাহানারা বললেন, কাল রাতে যে ওর সঙ্গে গল্প করলে ও ডেকে নিয়ে গিয়েছিল?
জ্বি।
কী বলে ডাকল? তোমাকে বলল, বিনু এসো। সারারাত আমাকে গল্প শুনাও? তোমার গল্প না শুনলে আমি মারা যাব?
বিনু বুঝতে পারছে— মহিলার মাথা এখন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তিনি এখন ছেলেমানুষি কথা বলবেন। হাস্যকর প্রশ্ন করবেন।
জাহানারা বললেন, চুপ করে আছ কেন জবাব দাও।
বিনু হালকা গলায় বলল, উনি বললেন, বিনু তুমি আমার ঘরে এসে বস। আমি তোমার জন্যে চা বানিয়ে আনি। তারপর আমরা চা খেতে খেতে সারা রাত বসে গল্প করব। আমার আজ গল্পের মুডে পেয়েছে।
সে চা বানিয়ে আনল?
জ্বি।
শুভ্ৰ নিজে চা বানিয়ে আনল?
জ্বি। চা বানানোর ব্যবস্থাতো উনার ঘরেই আছে।
জাহানারা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। রাগের চেয়ে বিস্ময়বোধ তাঁর কাছে প্রবল হয়ে উঠেছে। শুভ্র চা বানিয়ে এই গ্ৰাম্য ফাজিল মেয়েটাকে খাওয়াচ্ছে, কী বিস্ময়কর ঘটনা!
শুধু যে বিস্ময়কর তা না, অস্বাভাবিক এবং অবশ্যই ভয়ঙ্কর। জাহানারা হঠাৎ লক্ষ করলেন তার হাত পা কাঁপছে। শীত বোধ হচ্ছে। বিনুর সঙ্গে কথা চালিয়ে যাবার শক্তি নিজের ভেতর খুঁজে পাচ্ছেন না। বিনুর কাছে নিজেকে ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ মনে হচ্ছে।
বিনু।
জ্বি।
জাহানারা শান্ত গলায় বললেন, তোমাদের মধ্যে কী কথা হয়?
মনে করে রাখার কিছু না। উনি গল্প করেন, আমি শুনি। কিছুদিন হল রাতে তাঁর ঘুম হয় না। একা একা জেগে থাকা খুব কষ্টের ব্যাপার বলেই তিনি আমার সঙ্গে গল্প করেন।
কাল রাতে তোমাদের কী নিয়ে গল্প হল? তোমার মনে আছে?
জ্বি মনে আছে।
বল শুনি।
মহাবিশ্ব কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, আবার সব এক জায়গায় হবে – এইসব। মহাবিশ্ব বিগ বেং থেকে শুরু। আবার সেখানেই শেষ হবে।
জাহানারা বুঝতে পারছেন না, তাঁর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা উচিত কি-না।
জ্ঞানের গল্প শুভ্র করতেই পারে; করতে পারাটাই স্বাভাবিক। কার সঙ্গে গল্প করছে সেটা জরুরি না। শুভ্র যখন এ ধরনের গল্প করে তখন সে খেয়াল করে না। কে তার সামনে আছে। বিনু বসে থাকলেও যা, এ বাড়ির দারোয়ান বসে থাকলেও তা। মুক্তার মা থাকলেও তা। জাহানারা ঠিক করে ফেললেন তিনি নিজেই এখন থেকে রাত জাগবেন। শুভ্রর জ্ঞানের কথা শুনবেন। মহাবিশ্ব ছড়িয়ে পড়ার হাবিজাবি শুনতে খারাপ লাগবে না। তাছাড়া শুভ্র যা বলে তাই তার শুনতে ভাল লাগে।
বিনু শান্ত চোখে জাহানারার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে যুদ্ধ শেষ হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। জাহানারা আহত হয়েছেন। রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যে রক্ত চোখে দেখা যায় না। তাঁর দিকে তাকাতেই মায়া লাগছে। বিনু বলল, চাচি আসুন আপনার মাথায় তেল দিয়ে শেষ করি। জাহানার আপত্তি করলেন না, ঘুরে বসলেন।
জাহানারা ক্ষীণ গলায় বললেন, তোমার বিয়ে ভেঙে যাবার ঘটনাটা বল। কিছুই গোপন করবে না।
বলার মত কোনো ঘটনা না চাচি। গায়ে হলুদের আগের দিন হঠাৎ উড়ো খবর পাওয়া গেল। ভদ্ৰলোক আগে একবার বিয়ে করেছেন। তার একটা মেয়েও আছে। আমার এক মামা খোঁজ নিতে গেলেন। বরপক্ষের তারাতো কিছু বললই না, উল্টা খুব রাগারগি করল। আমরা না-কি ইচ্ছা করে তাদের অপমান করার জন্যে এইসব কথা নিয়ে দরবার করতে গেছি। আমরা ছোটলোক। আমরা ইতর। এইসব।
জাহানারা আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, এ রকম কিন্তু হয়। বিয়েশাদিতে নানান কথা ছড়িয়ে বিয়ে ভেঙে দেয়া হয়। একদল মানুষ থাকে তারা বিয়ে দিয়ে আরাম পায় আবার আরেক দল থাকে বিয়ে ভাঙিয়ে আরাম পায়। তোমরা উড়ো কথা যা শুনেছি তাকে গুরুত্ত্ব দেয়া ঠিক হয় নি।
বিনু বলল, আমরা গুরুত্ব দেই নি। বিয়ে হয়েই যেত। কিন্তু ঐ মহিলা তার মেয়েকে নিয়ে উপস্থিত হলেন।
বল কী!
ছেলেপক্ষের ওরা জোর গলায় বলতে লাগল— এই মেয়েকে তারা চিনে না। তাদের অনেক শত্ৰু আছে। শত্রুরা বিয়ে ভাঙার জন্যে এই মেয়েকে লাগিয়েছে। মেয়েটা নাকি বাজারে ঘর নিয়ে থাকে। আজেবাজে মেয়ে।
ও।
কাজেই আমি রাগারগি করে চলে এসেছি। বাবা যদিও চাচ্ছিলেন বিয়েটা হোক।
জাহানারা চুপ করে রইলেন। বিনু ভেবেছিল জাহানারা বলবেন যা করেছি ভালই করেছ। জাহানারা কিছুই বললেন না।
চুলে তেল দেয়া শেষ হয়েছে। বিনু বলল, চাচি আমি যাই। জাহানারা সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিলেন না; এখন বাজছে তিনটা। ভদ্রমাসের ঝিম ধরা দুপুর। এই সময়ে চুপচাপ শুয়ে থাকতে ভাল লাগে। কিন্তু তিনি জানেন আজ তার কোনো কিছুই ভাল লাগবে না। তাঁর কেন জানি হঠাৎ করে তোকমার সরবত খেতে ইচ্ছা করছে। আজকাল প্রায়ই অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস খেতে ইচ্ছা করে। এসব হচ্ছে মৃত্যুর লক্ষণ। মৃত্যু যখন এগিয়ে আসে তখনই বিচিত্র সব ইচ্ছা মনে জাগে। তাঁর মার যেমন জ্যৈষ্ঠ মাসে বরই খাবার ইচ্ছা হল। যাকে পান তাকেই জিজ্ঞেস করেন— বিরই কি পাওয়া যাবে? বরই খেতে ইচ্ছা করছে। আচারের বরই না, গাছপাকা দেশি বরই। জ্যৈষ্ঠ মাস আম কঁঠালের সময়। এই সময়ে কি বরই পাওয়া যায়? বরই বরই করতে করতে এই মহিলা জ্যৈষ্ঠ মাসে মারা গেলেন। অনেক দিন পর মার কথা ভেবে জাহানারার মন কেমন করতে লাগল। বরই বরই করে এই মহিলার জীবনের ইতি হয়েছে বলেই কি-না কে জানে তাঁর কবরে কিছুদিনের মধ্যেই একটা বরই গাছ দেখা গেল। সেই গাছ এখন বিশাল হয়েছে। দুবছর আগে গিয়ে দেখেছেন গাছ ভৰ্তি করে বরই এসেছে। খুব না-কি মিষ্টি। ভয়ে কেউ সেই বরই খায় না। কবরের উপর উঠা ফলের গাছের ফল খেতে নেই। পশুপাখি খেতে পারে। মানুষ পারে না। কেন পারে না এটা নিয়ে কি শুভ্রের সঙ্গে কথা বলা যায় না? শুভ্ৰ কি রাগ করবে? জাহানারা মনস্থির করতে পারলেন না- শুভ্ৰর কাছে যাবেন, না যাবেন না।
