বিনু জাহানারার সামনে বসে আছে। সে মোটামুটি প্রস্তুত হয়েই আছে। জাহানার প্রশ্ন করে তাকে আটকাতে পারবেন না। জাহানারা নামের মহিলাকে বিনু একটা খোলা বই-এর মত পড়তে পারে। মহিলা তাকে পড়তে পারেন না। কোনোদিন পারবেনও না। প্রশ্নোত্তর পর্ব কীভাবে এগুবে তাও বিনু জানে। জাহানার প্রথমে খুব স্বাভাবিক থাকবেন— অতিরিক্ত স্বাভাবিক, যা মোটেই স্বাভাবিক না। এক পর্যায়ে তিনি রেগে যাবেন। চেষ্টা করবেন। রাগটা লুকিয়ে রাখতে। কিছুক্ষণ পারবেন, তারপর আর পারবেন না। থলের বিড়াল বের হয়ে পড়বে। এই ঘটনাগুলি কখন ঘটবে বিনু তা জানে— কিন্তু এই মহিলা জানেন না। বিনু এ বাড়িতে এসেছে গতকাল। গতকাল তেমন কোনো কথা হয় নি। জাহানারা শুধু তাঁর ছেলের লেখা চিঠি পড়তে চেয়েছেন। গতকাল তিনি শুধু ভেবেছেন। কীভাবে বিনুকে আটকাবেন সব ঠিক ঠাক করেছেন। আজ শুরু হবে বাঘবন্দি খেলা।
জাহানারা বললেন, বিনু বোস। তোমার সঙ্গে গল্প করি। আজকের গরমটা কেমন পড়েছে বল দেখি।
বিনু বলল, ভাল গরম পড়েছে।
এক পত্রিকায় পড়েছি, এসির বাতাস খেলে বুকে ক্ৰনিক ব্রংকাইটিস হয়। ব্ৰংকাইটিস খুব খারাপ অসুখ। একবার ধরলে আর যেতেই চায় না।
বিনু কিছু বলল না। এই মহিলা এখন কী করবেন। সে আন্দাজ করার চেষ্টা করছে। সম্ভাবনা একশ ভাগ যে বলবেন— মাথায় একটু তেল ঘষে দাও তো। অনেক দিন মাথায় তেল দেয়া হয় না। সে মাথায় তেল ঘষতে থাকবে, তিনি প্রশ্ন করতে থাকবেন। সে যেহেতু জাহানারার পেছনে বসবে কেউ কারো মুখ দেখতে পারবে না। কঠিন কঠিন কথা বলার জন্যে এই কায়দাটা ভাল।
বিনু।
জ্বি।
মাথায় একটু তেল দিয়ে দাওতো।
জ্বি আচ্ছা।
বিনু তেলের বাটি নিয়ে বসল। জাহানারা বললেন, মাথায় চুলের জন্যে সবচে ভাল তেল হল অলিভ ওয়েল। এর পর থেকে তুমি আমার মাথায় অলিভ ওয়েল দিয়ে দিবে।
জ্বি আচ্ছা।
মাথার যন্ত্রণার জন্যে সবচে ভাল তেল কী জান?
জ্বি না।
মাথার যন্ত্রণার জন্যে সবচে ভাল তেল হল সরিষার তেল। দুই চামচ পানি, দুই চামচ সরিষার তেল একসঙ্গে মিশিয়ে মাথার তালুতে ঘষলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে মাথাব্যথা কমবে। এটা আমি শিখেছি আমার এক খালার কাছ থেকে।
বিনু হালকা গলায় বলল, এরপর যদি আপনার মাথা ধরে তাহলে বলবেন— আমি সরিষার তেল দিয়ে দেব।
সরিষার তেলের বাঝ বেশি এই জন্যে সবাই মনে করে এই তেল মাথায় দেয়া যায় না। এতে চুল পড়ে যায়। এটা ঠিক না।
মূল কথায় আসতে জাহানারা এত দেরি করছে কেন- বিনু তা বোঝার চেষ্টা করছে। কথাবার্তা তেলের আশেপাশে ঘুরছে। মূল প্রসঙ্গে আসতে মহিলা সময় নিচ্ছেন, কাজেই এটা মোটামুটি নিশ্চিত তিনি আজ বিনুকে শক্ত করে ধরবেন। কঠিন বাঘবন্দি খেলা হবে।
বিনু।
জ্বি।
তোমার বিয়ে ভেঙে গেলা— মানে কী? বরপক্ষের লোকরা বিয়ে ভাঙল না। তোমাদের পক্ষের লোকরা বিয়ে ভাঙাল?
আমরাই ভাঙলাম।
জাহানারা হালকা গলায় বললেন, আমার ধারণা তুমিই বিয়েটা ভেঙেছ। হঠাৎ কোন কারণে বেঁকে বসেছ।
আপনার এরকম ধারণা হল কেন?
প্রশ্নটা করেই বিনুর মনে হল সে ভুল করেছে। জাহানারা এখন রেগে যাবেন।
এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবেন। আজে-বাজে কথা শুরু করবেন।
শোন বিনু। তোমার নিজের ধারণা তুমি খুব চালাক। যতটা চালাক তুমি নিজেকে ভাব, ততটা চালাক কিন্তু তুমি না।
মানুষ মাত্রই নিজেকে চালাক ভাবে চাচি। আমি যেমন নিজেকে চালাক ভাবি। আপনিও নিজেকে চালাক ভাবেন। এটা দোষের কিছু না।
জাহানারা থমথমে গলায় বললেন, তুমি আমাকে দোষ-জ্ঞান দিচ্ছ? তোমার কাছ থেকে আমাকে শিখতে হবে কোনটা দোষ, কোনটা দোষ না?
বিনু হাসল। জাহানারা সেই হাসি দেখলেন না। চুলে তেল দিতে দিতে কথা বলার এই এক উপকারিতা। কারো মুখের ভাবই কেউ দেখছে না।
বিনু তুমি আজ আমাকে কয়েকটা সত্যি কথা বলবে? আমি সবসময়ই সত্যি কথা বলি চাচি।
না, তুমি সত্যি কথা বল না, তুমি হাড় বজ্জাত এবং মিথ্যুক। তোমার ধারণা তোমার মিথ্যা কথাগুলি কেউ ধরতে পারে না। এটা ঠিক না। শুভ্র ধরতে পারে না। ও মহাবোকা। কিন্তু আমি ধরতে পারি। দশটা মিষ্টি কথা দিয়ে তুমি শুভ্রকে ভুলাতে পারবে- আমাকে পারবে না।
আমি কাউকেই ভুলাতে চাই না চাচি।
জাহানারা ঘুরে বসলেন। কাজেই চুলে তেল দেয়া পর্বের এখানেই সমাপ্তি। এখন সম্মুখ যুদ্ধ। বিনু মনে মনে নিজেকে তৈরি করে নিল। সে আজ যুদ্ধ করবে। এই মহিলাকে ধরাশায়ী করে দেবে। যাতে ভবিষ্যতে এই মহিলা তার পেছনে না লাগেন। বিনুর ধারণা আজকের যুদ্ধটা এই মহিলার জন্যেও ভাল হবে। তিনি এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছেন। অনিশ্চয়তা কমবে, অনেক কিছু স্পষ্ট হবে।
তুমি কী বললে বিনু? তুমি কাউকে ভুলাতে চাও না?
জ্বি না।
এত বড় একটা মিথ্যা কথা বলতে তোমার বিবেকে বাধল না! তোমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যইতো শুভ্রকে ভুলানো। শুভ্ৰকে ভুলানোর জন্যে কি তুমি রাতে বিরাতে ওর ঘরে যাও না?
হ্যাঁ, আমি যাই। আমাকে যখন ডাকা হয় তখনই যাই। না ডাকলে কখনো যাই না।
তুমি বলতে চাচ্ছ শুভ্ৰ তোমাকে রাতে ডেকে নিয়ে যায়?
জ্বি।
আমি কি ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করব?
জিজ্ঞেস করলে জিজ্ঞেস করতে পারেন। উনি কখনো মিথ্যা বলেন না। কাজেই আপনি সত্যি উত্তরই পাবেন।
মহিলার দিকে তাকিয়ে বিনুর এখন মায়া লাগছে। কী অসহায়ই না তাঁকে দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে তার পায়ের নিচে মাটি নেই।
